“পাঁচশ টাকা?”
“হ।”
হঠাৎ করে কিছু বোঝার আগে ফর্সা মানুষটা খপ করে জালালের বুকের কাছে শার্টটা খামচে ধরে তার গালে প্রচণ্ড জোরে একটা থাবা দিয়ে তাকে হ্যাঁচকা টানে উপরে তুলে বলল, “তুই আমার সাথে রংবাজি করিস?”
মানুষটা কথা শেষ করতে পারল না তার আগেই একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেল। কুক্কু এতোক্ষণ তীব্র দৃষ্টিতে পুরো ঘটনাটি দেখছিল, জালাল সারাক্ষণ তার চাপা গরগর শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। ফর্সা মানুষটা জালালের মুখে মেরে বসার সাথে সাথে কুক্কু গর্জন করে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কুক্কু মানুষটার গলার কাছে কোথাও কামড়ে ধরার চেষ্টা করে–মানুষটা আতঙ্কে চিৎকার করে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে উল্টে পড়ে যায়। কুক্কু তার বুকের উপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে মানুষটাকে কামড়ে ধরার চেষ্টা করে। মানুষটা দুই হাতে কুকুর মুখটাকে ধরে সরানোর চেষ্টা করে। অন্য যে মানুষটা মোটর সাইকেলে বসেছিল সেও মোটর সাইকেল থেকে নেমে ছুটে আসার চেষ্টা করে।
মজিদ, জেবা, মায়া আর অন্যরা ভয় পেয়ে চিৎকার করে ছুটে পালিয়ে গেল। জালালেরও পালানোর এই হচ্ছে সুযোগ সেও এখন ছুটে পালিয়ে যেতে পারে–কিন্তু জালাল বুঝতে পারে এখান থেকে ছুটে পালালেও সে এই মানুষগুলো থেকে ছুটে পালাতে পারবে না। তাই সে পালাল না, চিৎকার করে বলল, “কুক্কু! সরে যা।” তারপর কুকুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে টেনে সরিয়ে আনে।
কুক্কু ফর্সা মানুষটাকে ছেড়ে দিল কিন্তু হিংস্র চোখে তার দিকে তাকিয়ে গরগর শব্দ করতে থাকল। ফর্সা মানুষটার মুখে মাটি, গলায় আঁচড়ের দাগ, জামা-কাপড়ে ময়লা–সে এখনো বুঝতে পারছে না কী হয়েছে। কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে জালাল আর কুকুর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে শরীর থেকে ময়লা ঝেড়ে পরিষ্কার করতে থাকে। কুকুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে বলে জালালের দিকে খানিকটা কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকাল। বলল, “এইটা তোর কুকুর?”
“জে। কুত্তার বুদ্ধি তো বেশি হয় না–মনে করছে আমার বিপদ।”
মানুষটা কোমরে হাত দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জালালের দিকে তাকাল, “সবুজ তোকে আর কিছু বলে নাই? তুই সত্যি কথা বলছিস!”
“জে। একেবারে সত্যি কথা। আমি দুইশো পর্যন্ত দিতে রাজি হইছিলাম, হে রাজি হয় নাই।”
“রাজি হয় নাই?”
“না।” জালাল নিশ্বাস ফেলে বলল, “মনে অয় ভালাই হইছে আমারে কিছু কয় নাই। কামটা নিশ্চয়ই অনেক বিপদের। আমারও মনে হয় বিপদ হইতো।”
ফর্সা মানুষটা তার গলায় হাত বুলাতে বুলাতে মোটর সাইকেলে ওঠে। মোটর সাইকেলটা গর্জন করে উঠল, ফর্সা মানুষটা বলল, “তোর কুকুরটা আমার কাছে বেচবি?”
জালাল মাথা নাড়ল, বলল, “জে না।”
মানুষ দুইজন মোটর সাইকেলে চলে যাওয়ার সাথে সাথে নানা কোনা থেকে জেবা, মজিদ, মায়া আর অন্যেরা বের হয়ে আসে, তাদের চোখে-মুখে একসাথে বিস্ময় আর আনন্দ। তারা সবাই ছুটে এসে জালালকে জাপটে ধরল, জেবা বলল, “এরা সবুজরে মাইরা ফালাইছে?”
“মনে অয়।”
“তোরেও মাইরা ফালাব?”
“ধুর। আমারে ক্যান মাইরা ফালাবে? আমি কী করছি?”
“তা অইলে তর কাছে কেন আইছে?”
“আমি কী জানি?” মায়া বলল, “পুলিশে এগো ধরে না ক্যান?”
কেউ মায়ার প্রশ্নের উত্তর দিল না, ছোট বলে এখনো কিছুই জানে না কয়দিনের মাঝে জেনে যাবে পুলিশ কাকে ধরে আর কাকে ধরে না।
.
লাশকাটা ঘরের কোলাপসিবল গেটের কাছে গাট্টাগোট্টা কালো মতোন একজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোরা এখানে ভিড় জমাইছিস ক্যান।”
জেবা বলল, “আমরা সবুজ ভাইরে দেখতে আইছিলাম।”
মানুষটা কয়েক সেকেন্ড কী একটা ভাবল, তারপর বলল, “ডরাইবি না তো?”
জালালের বুকটা ধক করে উঠল, তারপরেও মুখে সাহস এনে বলল, “না।”
“তা হলে আয়। কোনো গোলমাল করবি না, শব্দ করবি না।”
ওরা লাশকাটা ঘরে ঢোকে, ভিতরে ওষুধের ঝাঁঝালো গন্ধ, ছোট একটা ঘর পার হয়ে তারা বড় একটা ঘরে গেল, সেখানে কংক্রিটের টেবিলে একটা লাশ লাল চাদর দিয়ে ঢাকা। চাঁদরে ছোপ ছোপ রক্ত। মানুষটা চাদর তুলে লাশটার মুখটা বের করে দিল।
কংক্রিটের টেবিলে সবুজ শুয়ে আছে। মাথার উপর সেলাই-গলা দিয়ে বুক পর্যন্ত সেলাই। কী ভয়ংকর একটা দৃশ্য! মায়া একটা চিৎকার করে জেবাকে জাপটে ধরল। জেবা সাথে সাথে তার মুখ চেপে ধরে তাকে বাইরে নিয়ে যায়। অন্যেরা আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, জালাল একটু কাছে গিয়ে সবুজকে স্পর্শ করল, কী আশ্চর্য, শরীরটা বরফের মতো ঠাণ্ডা। ঠিক কী কারণ কে জানে জালালের মনে হয় সবুজকে এভাবে মেরে ফেলার জন্যে সে কোনো না কোনোভাবে দায়ী! সে যদি ঠিক করে চেষ্টা করত তা হলে সবুজকে হয়তো এভাবে মরতে হত না। জালাল সবুজের বরফের মতো ঠাণ্ডা শরীরটা ছুঁয়ে ফিস ফিস করে বলল, “আমারে মাপ কইরা দিও সবুজ ভাই।”
.
সেদিন রাত্রে তারা অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। কেউ কোনো কথা বলছে না। তবু সবারই মনে হচ্ছে প্রাটফর্মের বেঞ্চে সবুজ পা দুলিয়ে বসে তাদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
০৪-৬. গোডাউনের পিছনে আবছা অন্ধকার
জালাল গোডাউনের পিছনে আবছা অন্ধকার জায়গাটায় নিঃশব্দে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, সে এখানে সবুজকে দেখেছিল। সবুজ এখানে এসেছিল কিছু একটা লুকিয়ে রাখতে-জালালকে দেখে তাই সবুজ এরকম চমকে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত এখানে লুকিয়ে রেখেছে কী না কে জানে কিন্তু জালাল তবুও একটু খুঁজে দেখতে চাইল।
