পুলিশটা একটু অবাক হয়ে মায়ার দিকে তাকাল, তারপর নরম গলায় বলল, “ধুর বোকা মেয়ে! এই একটুখানি কাটবে তারপর আবার সেলাই করে দিবে। দেখে বোঝাই যাবে না।”
মায়া কী বুঝল কে জানে, ভেউ ভেউ করে কাঁদতে লাগল। জেবা তখন মায়াকে ধরে সরিয়ে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। মায়া একটু শান্ত হওয়ার পর ওরা সবাই মিলে বিল্ডিংটার পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে চুপ করে বসে থাকে। কেন বসে আছে কেউ জানে না।
কুক্কু বেশ উত্তেজিত হয়ে আশেপাশে ঘুরতে থাকে। তাকে দেখে বোঝা যায় কোনো একটা কারণে সে এই জায়গাটাকে মোটেই পছন্দ করতে পারছে না। সারাক্ষণ এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে একটু পরপর চাপা গলায় গরগর করছে, হঠাৎ হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে রাগি চোখে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছে। জালাল কুক্কুকে ধরেও থামিয়ে রাখতে পারে না, কী হয়েছে কে জানে।
বেশ খানিকক্ষণ পর লাশকাটা ঘরের কলাপসিবল গেট খুলে একজন মানুষ বের হয়ে পুলিশটাকে কী যেন বলল, পুলিশটা তখন পকেট থেকে কিছু কাগজ বের করে হাতে নিয়ে লাশকাটা ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। একটু পর সে বের হয়ে মোবাইলে কথা বলতে বলতে হেঁটে জানি কোথায় চলে গেল।
বাচ্চাগুলো কী করবে বুঝতে পারল না। তারা খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে, ঘরটার ভেতরে ঢুকবে কী না বুঝতে পারছিল না। একটু এগিয়ে গিয়ে তারা কলাপসিবল গেটের সামনে দাঁড়ায়।
ঠিক তখন একটা মোটর সাইকেল বিকট শব্দ করে লাশকাটা ঘরের সামনে এসে থামে। ঠিক কী কারণ জানা নেই মানুষ দুইজনকে দেখেই জালালের বুকটা ধক করে ওঠে। মানুষ দুইজনের বয়স বেশি না, একজন শ্যামলা অন্যজন অসম্ভব ফরসা। শ্যামলা মানুষটা মোটর সাইকেল চালাচ্ছিল, সে বসেই রইল। ফরসা মানুষটা মোটরসাইকেল থেকে নেমে এদিক-সেদিক তাকায়, বাচ্চাদের দিকে চোখ পড়তেই সে লম্বা পায়ে তাদের দিকে আসতে থাকে। জালাল দেখল ফরসা মানুষটার লালচে রংয়ের চুল, চুল ছোট করে ছাটা। চোখে কালো চশমা। হাতে একটা চাবির রিং সেটা ঘুরাতে ঘুরাতে ফর্সা মানুষটা ওদের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “তোরা কি স্টেশনের লাফাংরা?”
লাফাংরা শব্দটার মানে কী কেউ জানে না কিন্তু তারা ধরেই নিল শব্দটা দিয়ে তাদেরকেই বোঝানো হচ্ছে। তাই তারা সবাই ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ল।
“হারামির বাচ্চা সবুজরে তোরা চিনিস?”
জালাল চমকে ওঠে। গতরাতে যাকে মেরে ফেলা হয়েছে তাকে আজকে বিকেলে হারামির বাচ্চা ডাকার মাঝে এক ধরনের ভয়ের ব্যাপার আছে। সেটা সবাই টের পেয়ে গেল, তাই কেউ কোনো কথা বলল না। মানুষটা ধমকে উঠল, “কথা বলিস না কেন?”
জালাল বলল, “জে চিনি।”
“তোদের কারো কাছে সবুজ কিছু দিয়ে গেছে?”
জিনিসটা কী হতে পারে জালাল সাথে সাথে অনুমান করে ফেলে। অন্যরা কিছু বুঝল না। জেবা জিজ্ঞেস করল, “কী দিয়া যাইব?”
“একটা প্যাকেট। পাস্টিকের প্যাকেট। ভেতরে সাদা গুড়া। সাবানের গুড়ার মতো।”
একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করল, জালাল ছাড়া আর কেউ কিছু বুঝতে পারল না। তাই জালাল মাথা নেড়ে বলল, “না।”
মানুষটা এবারে ছোট একটা গর্জন করে উঠে বলল, “ঠিক করে বল।” এবারে জেবা বলল, “ঠিক কইরাই কইতাছি। আমাগো কেউ কিছু দেয় নাই।”
“তা হলে সবুজের সাথে তোদের এতো খাতির কেন?”
“আমরা হগলে একসাথে থাকতাম হেই জন্যে খাতির।”
“সবুজ তোদের সাথে কী নিয়ে কথা বলত?”
এবারে সবাই চুপ করে রইল, সবুজ কী নিয়ে কথা বলত সেটা আলাদা করে কেউ মনে করতে পারল না। এটা কী রকম প্রশ্ন সেটা নিয়েই সবাই একটু চিন্তার মাঝে পড়ে যায়। শুধু জালাল আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারে আর বুক ধক ধক করতে থাকে।
“তোদের মাঝে জালাল কার নাম?”
জালাল ভীষণভাবে চমকে উঠল, শুকনো মুখে বলল, “আমি।”
একেবারে কাগজের মতো ফর্সা মানুষটা এইবারে জালালের মুখের কাছাকাছি নিজের মুখটা নামিয়ে আনে, তারপর হিস হিস করে বলে, “আমি খবর পেয়েছি
সবুজ তোর সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছে। কী নিয়ে কথা বলেছে?”
জালাল একটা জিনিস বুঝে গেল, তাকে কিছুতেই সত্যি কথাটি বলা যাবে না আর সে যে কথাটি বলবে সেই কথাটি এই মানুষগুলো বিশ্বাস করে কী না তার উপর নির্ভর করবে সে কী বেঁচে থাকবে না কী তাকেও সবুজের মতো মেরে ফেলবে। পথে-ঘাটে বেঁচে থাকার জন্যে তারা হাজার রকম মিথ্যা কথা বলে কিন্তু আজকের মিথ্যা কথাটা হতে হবে একেবারে অন্যরকম।
মানুষটা হুংকার দিল, “বল, কী নিয়ে কথা বলে?”
“টেহা-পয়সা নিয়া। তার কতো টেহা-পয়সা হে কতো আরামে থাকে হেই সকল কথা কইতো।”
ফর্সা মানুষটা চোখ থেকে কালো চশমাটা খুলে তার মুখটা জালালের মুখের আরো কাছাকাছি নিয়ে আসে। মুখটা এতো কাছ এনেছে যে জালাল তার চোখের সাদা জায়গায় চোখের শিরাগুলো পর্যন্ত দেখতে পায়। সেগুলো লাল হয়ে ফুলে আছে মনে হয় এক্ষুনি ফেটে রক্ত বের হয়ে আসবে। মানুষটা হিংস্র গলায় বলল, “সবুজ কেমন করে টাকা কামাই করতো?”
জালাল একটা নিশ্বাস ফেলে প্রথম সত্যিকারের মিথ্যা কথাটা বলল, “আমি তারে অনেকবার জিগাইছি হে কইতে রাজি হয় নাই।”
“রাজি হয় নাই?”
“না।”
“কী বলেছে?”
জালাল প্রথম মিথ্যাটাকে বিশ্বাস করানোর জন্যে দ্বিতীয় মিথ্যা কথাটা বলল, “হে কইছে তারে পাঁচশ টেহা দিলে কইব।”
