আগে কথা দে, তুই বাসা থেকে পালিয়ে যাবি না।
কথা দিলাম।
আমাকে ছুঁয়ে কথা দেয়।
ছুঁয়ে কথা দিলে কী হয়?
প্রিয়াংকা গম্ভীর গলায় বলল, কথা ভেঙ্গে ফেললে যাকে ছুঁয়ে কথা দিয়েছিস সে মরে যায়।
আমি বললাম, আমি এসব বিশ্বাস করি না।
আমিও করি না। তবু ছুঁয়ে কথা দে। প্লিজ।
আমি প্রিয়াংকাকে ছুঁয়ে বললাম, ঠিক আছে কথা দিলাম।
গুড। প্রিয়াংকা আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। তার চোখ এখনো ভেজাএকজন মানুষের চোখে পানি কিন্তু মুখে হাসি–এটা ভারি বিচিত্র একটা ব্যাপার।
আমরা দুজন তখন হাঁটতে শুরু করলাম। বিকেল পড়ে এসেছে, বাসায় যেতে যেতে অন্ধকার হয়ে যাবে। প্রিয়াংকা বলল, আগে আমাকে বাসায়। পৌঁছে দিতে হবে।
ঠিক আছে পৌঁছে দেব।
প্রিয়াংকাকে বাসায় পৌঁছে আমি যখন বাসায় রওনা দিয়েছি তখন হঠাৎ আমার মনে হলো আমি আর আগের তপু নই। আমি এখন অন্য রকম একজন তপু। প্রিয়াংকা আমার ভেতরে খুব বড় একটা পরিবর্তন করে ফেলেছে।
০৭. নতুন আমি
দুলি খালা আমাকে দেখে অসম্ভব খুশি হয়ে উঠল, বলল, পাগলী মেয়েটা তোমারে খুঁইজা পাইছে?
আমি মাথা নাড়লাম। দুলি খালা বলল, এই রকম মাইয়া আমি জীবনে দেখি নাই। কইলজাটা এক দিকে মাখনের মতো নরম অন্যদিকে পাথরের মতোন শক্ত।
আমি বললাম, সেইটা কেমন করে হয়?
দুলি খালা জ্ঞানী মানুষের মতো বলল, হয়। প্রথম যখন আসছে আমি তারে কিছু বলি নাই। সে বলছে তোমার পড়ার টেবিলে একটা বই রেখে যাবে। আমি বলছি তোমার নিজের পড়ার টেবিল নাই। তখন বলছে তোমার বিছানার উপর রাখবে। আমি বলছি নিজের বিছানা নাই। তখন বলছে তুমি যেখানে ঘুমাও সেইখানে রাখবে। আমি আর কী করি? এই স্টোররুমে নিয়া আসছি।
আমি বললাম, ও!
দুলি খালা বলল, এক নজর দেইখাই বুইঝা গেছে। তখন ভেউ ভেউ করে কান্দা শুরু করছে। এই জন্যে বলি কইলজাটা মাখনের মতো নরম।
আমি বললাম, ও।
দুলি খালা বলল, যখন শুনলো তুমি চইলা গেছ তখন পাগলের মতো হয়া গেল। বলল, আমি খুঁইজা বার করব। আমি বললাম ঢাকা শহরে লাখ লাখ মানুষ! তুমি খুঁজবা কেমনে? সে বলল জানি না। কিন্তু আমি চেষ্টা করমু। খোদা যদি সায্য করে তাহলে বার করমু। দুলি খালা হেসে বলল, খোদা তারে সাহায্য করছে।
আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, হ্যাঁ। তারপর পকেট থেকে দুমড়ানো মোচড়ানো নোটগুলো বের করে দুলি খালার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম, নাও দুলি খালা, তোমার টাকা।
দুলি খালা বলল, রাখো তোমার কাছে।
আমি বললাম, না দুলি খালা। আমার কাছে রাখলে অনেক বিপদ হতে পারে। আম্মু যদি খুঁজে পায় তাহলে আমাকে খুন করে ফেলবে।
দুলি খালা মাথা নাড়ল, বলল, সেইটা সত্যি কথা। আমার কাছ থেকে টাকাগুলো নিয়ে তার শাড়ির খুটে বেঁধে রেখে বলল, ঠিক আছে। আমি আমার কাছে রাখলাম, তোমার যখন লাগবে তখন আমার কাছ থেকে নিয়ো।
আমি মাথা নেড়ে স্টোররুমে ঢুকে গেলাম। প্রিয়াংকা আমাকে যে বইটা দিয়েছে সেটা পড়ার জন্যে আমি আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করতে পারছিলাম না।
মানুষ যেভাবে ডিটেকটিভ বই পড়ে আমি সেভাবে গণিতের বইটা পড়ে শেষ করলাম। আমি আর দুলি খালা রান্নাঘরে বসে বসে খাই, আজকে খাবার সময়েও বইটা পড়েছি। শুধু দশটার সময় আমার বই পড়া বন্ধ করতে হলো, তখন মিচকি বেড়াতে এলো। আজকাল তার সাহস বেড়েছে, আমার শরীরের উপর দিয়ে ছুটোছুটি করে। ভাল খেয়ে-দেয়ে তার স্বাস্থ্যটাও একটু ভাল হয়েছে। মনে হলো। পেটটা নাদুসনুদুস। আমি তার সাথে একটু গল্প গুজব করলাম, ভাব দেখে মনে হয় সে আমার সব কথা বুঝে!
রাত্রে ঘুমাতে ঘুমাতে অনেক দেরি হলো, শোওয়ার পরও চট করে চোখে ঘুম এলো না, মাথার মাঝে জিটা ফাংশন আর অয়লার ইকুয়েশন ঘোরাঘুরি করতে লাগলো! শেষ পর্যন্ত যখন ঘুমিয়েছি তখন নিশ্চয়ই অনেক রাত।
সকালে ঘুম ভাঙল ভাইয়ার ডাকাডাকিতে। আমি চোখ কচলে ভাইয়ার ঘরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে ভাইয়া?
তুই কাপড় ইস্ত্রি করতে পারিস?
আমি ইতস্তত করে বললাম, আগে কখনও করি নি।
আগে না করলে কী হয়েছে? এখন করবি। আমার এই প্যান্টটা একটু ইস্ত্রি করে দে দেখি। সাবধান পুড়িয়ে ফেলিস না যেন।
আমি তাই ভাইয়ার প্যান্টটা ইস্ত্রি করে দিলাম, খুব সাবধানে করেছি যেন পোড়ে। ভাইয়া দেখে খুব খুশি হয়ে গেল, বলল, বাহ! তুই দেখি ভাল ইস্ত্রি করতে পারিস।
আমি কিছু বললাম না। ভাইয়া তার চেয়ারের উপর রাখা কয়েকটা শার্ট প্যান্ট দেখিয়ে বলল, এগুলোও ইস্ত্রি করে রাখিস। ঠিক আছে?
আমি কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম।
স্কুলে গিয়ে আমার প্রিয়াংকার সাথে দেখা হলো, প্রিয়াংকা এমন ভাব করল যেন কিছুই হয় নি। এমন কী বসলও অন্য জায়গায়, আমার কাছে নয়। আমি একেবারে লিখে দিতে পারি অন্য যে কোন ছেলে-মেয়ে যদি আমার ব্যাপারটা জানতো তাহলে এতক্ষণে পুরো স্কুলে সেটা জানাজানি হয়ে যেতো। অনেক দিন পর আজকে আমি ক্লাসে কী পড়াচ্ছে সেটা একটু মনোযোগ দিয়ে শোনারও চেষ্টা করলাম। দীর্ঘদিন পড়াশোনা না করে করে আমার অভ্যাসও চলে গেছে, স্যারদের কথাবার্তায় মনোযোগও ধরে রাখতে পারি না। ফোর্থ পিরিয়ডে ক্লাসে একটা নোটিশ এলো, স্যার নোটিশটা পড়ে ভুরু কুঁচকে বললেন, জয়ন্ত, মামুন আর মৌটুসি তোরা তিনজন ক্লাস ছুটির পর শিরীন ম্যাডামের সাথে দেখা করবি।
জয়ন্ত মামুন আর মৌটুসি হচ্ছে ক্লাসের প্রথম দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ছাত্রছাত্রী। কাজেই তাদের কোন ঝামেলার মাঝে পড়ে শাস্তির জন্যে যেতে হচ্ছে।
