সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। মৌটুসি হাত তুলে জিজ্ঞেস করল, কেন স্যার?
স্যার ভুরু কুঁচকে নোটিশটা আরেকবার পড়ে বললেন, কী জানি! গণিত অলিম্পিয়াড না কী যেন হচ্ছে।
সেটা কী স্যার?
স্যার আবার নোটিশটা পড়লেন, পড়ে বললেন, মনে হয় গণিতের একটা কম্পিটিশান হবে সেখানে তোরা যাবি।
মৌটুসি চোখ বড় বড় করে বলল, গণিতের কম্পিটিশান? তারপর হি হি করে হেসে ফেলল। চিন্তা করলে ব্যাপারটা আসলেই হাস্যকর কয়েকজন কাগজে কলমে হাঁসফাঁস করে অঙ্ক করছে, কার আগে কে করতে পারে সেটা নিয়ে প্রতিযোগিতা!
প্রিয়াংকা হাত তুলে বলল, স্যার, এই গণিতের কম্পিটিশনে সবচেয়ে ভাল যে গণিত পারে তাদেরকে পাঠানো উচিত না?
স্যার বললেন, তাই তো উচিত।
তাহলে স্যার আলাদা করে ক্লাসে একটা গণিতের কম্পিটিশন করা উচিত না? কে ভাল গণিত পারে সেটা বের করা উচিত না?
স্যার চোখ পিটপিট করে প্রিয়াংকার দিকে তাকালেন, কেন? তোর কী খুব যাবার শখ নাকী?
না স্যার। প্রিয়াংকা মাথা নাড়ল, বলল, আমার শখ নেই স্যার। আমি গণিতে খুব দুর্বল! কিন্তু অন্য কেউ তো থাকতে পারে যারা গণিতে খুব ভাল!
তা নিশ্চয়ই পারে। বলে স্যার হাত নেড়ে পুরো ব্যাপারটা উড়িয়ে দিলেন। প্রিয়াংকা মন খারাপ করে বসে পড়ল, সে নিশ্চয়ই আমার জন্যে চেষ্টা করছিল! আমার অবশ্যি গণিতের কম্পিটিশনে যাবার এক বিন্দু ইচ্ছে নেই! এইসব কম্পিটিশন আমার জন্যে নয়!
প্রিয়াংকা অবশ্যি চেষ্টা করা ছাড়ল না, শিরীন ম্যাডামের কাছে গিয়ে চেষ্টা করল, শিরীন ম্যাডাম নতুন করে ঝামেলা করতে রাজি হলেন না, স্কুলের ফার্স্ট সেকেন্ড আর থার্ড ছাত্রছাত্রী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকলেন। প্রিয়াংকা তখন সাহস করে। একেবারে প্রিন্সিপাল ম্যাডামের কাছে হাজির হলো, প্রিন্সিপাল ম্যাডাম মন দিয়ে তার কথা শুনে বললেন, এবার হাতে একেবারে সময় নেই। পরেরবার চেষ্টা করা যাবে। তা ছাড়া গণিতের কম্পিটিশন একটা বিচিত্র বিষয়–আগে কখনো এরকম কিছু হয় নি। যারা আয়োজন করছে কয়দিনের ভিতরেই তাদের উৎসাহ ফুরিয়ে যাবে। কাজেই বিষয়টা নিয়ে বেশি হৈচৈ করার কোন প্রয়োজন নেই।
গণিত প্রতিযোগিতায় আমাকে ঢোকাতে না পেরে প্রিয়াংকা খুব মন খারাপ করল, তার ধারণা আমি যদি কোনভাবে সেখানে যেতে পারি তাহলেই একটা ফাটাফাটি কিছু করে ফেলতে পারব। আমার অবশ্য এমন কিছু মন খারাপ হলো না–অনেক দিন থেকেই এসব জিনিস থেকে আমি অনেক দূরে চলে গেছি। আগে আমি খুব ভাল ডিবেট করতাম এখন শুদ্ধভাবে কথাই বলতে পারি না।
তবে প্রিয়াংকা আমাকে নিয়ে হাল ছাড়লো না। স্কুল ছুটির পর প্রতিদিন প্রিয়াংকা আমার সাথে হেঁটে যেতে শুরু করলো। হেঁটে হেঁটে সে আমাকে নানারকম উপদেশ দিতো–তার উপদেশ যে খুব কাজের উপদেশ তা নয়, কিন্তু একজন মানুষ আমার জন্যে চিন্তাভাবনা করছে, আমাকে নিয়ে ভাবছে সেটাই আমার জন্যে অনেক কিছু। বিকালবেলা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার সাথে আমার এ ধরনের কথাবার্তা হলো :
বুঝলি তপু কখনো হাল ছেড়ে দিবি না। সব সময় বুকের মাঝে আশা ধরে রাখবি।
আমি বলতাম রাখব।
বড় কিছু করতে হলে বড় কিছু স্বপ্ন দেখতে হয়।
ও।
তোকেও বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। বুঝেছিস?
বুঝেছি।
শরীরটাকে ঠিক রাখতে হবে। তোকে নিয়মিত খেলাধুলাও করতে হবে।
ও।
শুধু অংকে ভাল করলে হবে না। সব সাবজেক্টে ভাল করতে হবে।
ও।
সব সাবজেক্ট মন দিয়ে পড়তে হবে।
আচ্ছা।
দেরি করে ঘুমাবি না। ভাল শরীরের জন্যে ঘুম খুব দরকার।
ও।
আর তোর একা একা থাকার অভ্যাস ছাড়তে হবে।
তাই নাকি?
অবশ্যই। ক্লাসের ছেলেমেয়েরা এতো সুইট অথচ তোর কোন বন্ধু নেই।
আমি বললাম, কে বলেছে বন্ধু নাই! তুই আছিস।
আর কে আছে?
আমার আরেকজন বন্ধুর নাম মিচকি।
মিচকি? প্রিয়াংকা ভুরু কুঁচকে বলল, ফাজলামি করবি না।
খোদার কসম। আমি হাসতে হাসতে বললাম, তোর সাথে একদিন। পরিচয় করিয়ে দেবো। ভয় পাবি না তো?
ভয় পাব কেন?
অনেকে ইঁদুরকে ভয় পায় তো!
ইঁদুর? প্রিয়াংকা মুখ বিকৃত করে বলল, ছিঃ! মাগো ঘেন্না!
মিচকি মোটেও সেরকম ইঁদুর না। খুব লক্ষ্মী। প্রত্যেকদিন রাত দশটার সময় আমার কাছে বেড়াতে আসে।
আমি প্রিয়াংকাকে মিচকি সম্পর্কে অনেক ভাল ভাল কথা বলি কিন্তু তাতেও কোন লাভ হয় না, প্রিয়াংকা মুখ বিকৃত করে বলে, ছিঃ! মাগো ঘেন্না!
আমি টের পেলাম খুব ধীরে ধীরে আমার একটা পরিবর্তন হলো। আমি নিজেকে খুব খারাপ ভাবতে শুরু করেছিলাম সেটা আস্তে আস্তে পরিবর্তন হতে শুরু করল। আমি পড়াশোনা শেষ করে একজন বড় ম্যাথমেটিশিয়ান হতে পারব সেটাও আজকাল খুব অসম্ভব মনে হয় না। প্রিয়াংকা বড় মানুষের মতো অনেক উপদেশ দেয়, বেশিরভাগ উপদেশই হাস্যকর তবে একটা উপদেশ মনে হয় সত্যি। নিজের ওপরে বিশ্বাস রাখা খুব জরুরি, খুব আস্তে আস্তে মনে হয় আমার নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে আসছে।
যেমন সেদিন সকালে আমি প্রিয়াংকার গণিত বইটাতে একটা সিরিজ খুঁজে পেলাম যেটার যোগফল দুটো ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা হতে পারে। একভাবে যোগ করলে এক রকম অন্যভাবে যোগ করলে অন্য রকম, আমি ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছি তখন হঠাৎ ভাইয়া আমাকে ডাকতে শুরু করল। আমি উঠে ভাইয়ার ঘরে গেলাম। ভাইয়া কলেজে যাবার জন্যে কাপড় পরছে, আমাকে একটা প্যান্ট ছুড়ে দিয়ে বলল, তপু এই প্যান্টটা আমাকে ইস্ত্রি করে দে দেখি।
