আমি মাথা নাড়লাম। কোঁকাতে কোঁকাতে বললাম, ঠ্যাং-এর হাড়ি মনে হয় ভেঙ্গে গেছে।
প্রিয়াংকা চেঁচাতে লাগলো, সর্বনাশ! হায় আল্লা! এখন কী হবে?
আমি প্রিয়াংকাকে ধরে দুই পা হেঁটে বললাম, নাহ! মনে হয় ভাঙ্গে নাই শুধু মচকেছে।
প্রিয়াংকার মনে হয় জানে পানি ফিরে এলো। আমার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। আমি অবাক হয়ে বললাম, কী হলো? কাঁদছিস। কেন?
আমি এর আগে কখনো কাউকে তুই করে বলি নি, এই প্রথম সেটা করলাম এবং সেটা করেছি নিজের অজান্তেই।
প্রিয়াংকা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি জানি! আমি সব জানি তপু।
আমি ভুরু কুচকে প্রিয়াংকার দিকে তাকালাম, জিজ্ঞেস করলাম, তুই সব কী জানিস?
তোর কথা! প্রিয়াংকা আমার হাত ধরে রেখে কান্না সামলাতে সামলাতে বলল, আজকে আমি তোদের বাসায় গিয়েছিলাম।
হঠাৎ করে মনে হলো আমার হৃৎপিণ্ড বুঝি থেমে গেছে। প্রিয়াংকা সব কিছু জেনে গেছে? আমার নিঃশ্বাস মনে হয় বন্ধ হয়ে গেলো, কোনমতে বললাম, আমার বাসায় গিয়েছিলি?
হ্যাঁ।
আমি কঠিন গলায় বললাম, কেন?
প্লিজ তপু তুই রাগ করিস না। প্লিজ।
কেন গিয়েছিলি আমার বাসায়?
তুই অঙ্ক করতে এতো ভালবাসিস। তাই তোর জন্যে একটা গণিতের বই নিয়ে গিয়েছিলাম। ভাবছিলাম তোকে খুশি করে দেব।
আমি প্রিয়াংকার দিকে তাকিয়ে বললাম, তুই আমার বাসা কেমন করে চিনেছিস?
লুকিয়ে তোর পিছু পিছু গিয়ে একদিন তোর বাসা চিনে এসেছি।
আমি বিস্ফারিত চোখে প্রিয়াংকার দিকে তাকিয়ে রইলাম, এই মেয়েটার কী মাথা খারাপ? প্রিয়াংকা আবার কাঁদতে লাগলো।
আমি বললাম, কাঁদছিস কেন? প্রিয়াংকা আমার হাত ধরে বলল, তোর এতো কষ্ট তপু। কেউ জানে না! আমি যদি আজকে তোর বাসায় না যেতাম, যদি দুলি খালার সাথে দেখা না হতো তাহলে আমিও জানতাম না।
আমি কোন কথা না বলে প্রিয়াংকার দিকে তাকিয়ে রইলাম। প্রিয়াংকা বলল, দুলি খালা বলল তুই আর সহ্য করতে না পেরে বাসা থেকে চলে গেছিস! এটা হতে পারে না।
কী হতে পারে না?
আমরা সবাই আছি, আর কেউ তোকে সাহায্য করতে পারবে না? তুই একা একা সহ্য করতে না পেরে বাসা ছেড়ে চলে যাবি? জীবনটা শেষ করে দিবি?
আমি আস্তে আস্তে বললাম, আমার আসলে কোন জীবন নাই। আমি আসলে ভাল ছেলে না। আমি চোর। আমি পড়াশোনা করি না–আমি-
প্রিয়াংকা ফিসফিস করে বলল, তুই যে এখনো বেঁচে আছিস, তুই যে পাগল হয়ে যাস নাই সেটাই সাংঘাতিক ব্যাপার? প্লিজ তপু তুই এটা করিস না?
কী করব না?
তুই চলে যাস না।
আমি চলে যাব না? না।
আমি কিছুক্ষণ প্রিয়াংকার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কয়েকবার চেষ্টা করে বললাম, কেন?
তুই বড় হয়ে বিখ্যাত একজন ম্যাথমেটিশিয়ান হবি–এখন যদি তুই তোর জীবনটা শেষ করে ফেলিস, কেমন করে হবে?
আমি অবাক হয়ে প্রিয়াংকার দিকে তাকালাম, আমি বড় হয়ে বিখ্যাত ম্যাথমেটিশিয়ান হব?
হবি না? নিশ্চয়ই হবি। সবাই বলেছে তুই অসম্ভব ভাল ছাত্র ছিলি হঠাৎ করে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিস। আসলে তুই পড়াশোনা ছেড়ে দিস নি–তুই আর পড়াশোনা করতে পারছিস না।
আমি কিছু বললাম না, চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। প্রিয়াংকা আবার বলল, সবাই আমাকে বলেছে তুই রাস্তাঘাটে মারামারি করে আসিস বলে তোর হাতে পায়ে শরীরে কেটেফুটে থাকে। আসলে, আসলে-
প্রিয়াংকা কথাটা শেষ না করে আবার ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেললো। আমি চোখ বড় বড় করে প্রিয়াংকার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার জন্যে কাঁদতে পারে পৃথিবীতে এরকম মানুষ আছে? প্রিয়াংকা কোনমতে চোখ মুছে বলল, তোর আব্বু মারা গেছে। তোর আম্মু এখন তোকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়, তোর ভাই-বোন থেকেও নেই, ক্লাসে তোর বন্ধুবান্ধব নেই, তুই একাকত কষ্টের একটা জীবন! তুই আমাকে একটা সুযোগ দে, আমি তোর আম্মু হব, তোর ভাই হব, বোন হব, তোর বন্ধুবান্ধব হব–দেখিস তুই, খোদার কসম!
প্রিয়াংকার কথা শুনে আমি হঠাৎ হেসে ফেললাম। আমাকে হাসতে দেখে প্রিয়াংকা একটু উৎসাহ পেলো, বলল, তুই আমার কথা বিশ্বাস করলি না? আমি ছোট হতে পারি কিন্তু আমি অনেক কিছু করতে পারি। তুই আমাকে সুযোগ দে। প্লিজ।
কীসের সুযোগ দেব?
বড় হয়ে একজন বিখ্যাত ম্যাথমেটিশিয়ান হবার।
ধুর! তোর নিশ্চয়ই মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
প্রিয়াংকা মাথা নাড়ল, বলল, উঁহুঁ তপু। তুই আমার কথা অবিশ্বাস করিস। তা না হলে তুই বল, আমি কেমন করে ঢাকা শহরের এক কোটি লোকের মাঝে তোকে খুঁজে বের করলাম? খোদা যদি আমাকে সাহায্য না করতো। তাহলে আমি কী তোকে খুঁজে বের করতে পারতাম?
আমাকে স্বীকার করতেই হলো ঢাকা শহরের এক কোটি লোকের মাঝে একজনকে খুঁজে বের করে ফেলা খুব সহজ কথা নয়। খোদা নিশ্চয়ই সাহায্য করেছে। প্রিয়াংকা চোখ বড় বড় করে বলল, তার মানে কী বুঝেছিস? তার মানে এটা খোদার ইচ্ছা!
কোনটা খোদার ইচ্ছা?
যে তুই একজন বিখ্যাত ম্যাথমেটিশিয়ান হবি।
আমি আবার হাসলাম। এবারে শব্দ করে আর জোরে। অনেক দিন পর আমি সত্যি সত্যি হাসলাম–হাসলে যে এতো ভাল লাগে সেটা আমি কোন দিন জানতাম না। প্রিয়াংকা তার ব্যাগের ভেতর থেকে লাল কাগজ দিয়ে মোড়ানো। একটা বই আমার দিকে এগিয়ে দিল, বলল, এই নে। এই বইটা দেবার জন্যে তোর বাসায় গিয়েছিলাম।
আমি প্যাকেটটা খুলে দেখি একটা ইংরেজি গণিতের বই। বইটা খুলতেই ভেতরে নানা ধরনের সমীকরণ বের হয়ে এলো আর সেটা দেখে হঠাৎ আমার জিবে প্রায় পানি এসে গেলো। আমি নিজেও জানতাম গর্ণিত আমার এতো প্রিয় একটা বিষয়। আমি বইটা ব্যাগে ঢুকিয়ে বললাম, চল যাই।
