আমি শুয়ে শুয়ে অপেক্ষা করছিলাম কখন সবাই বের হয়ে যায়, তখন হঠাৎ ভাইয়ার গলার স্বর শুনতে পেলাম, তপু, এই তপু।
আমি একটু চমকে উঠলাম, এই বাসাতেও থাকলেও সবাই এমন ভাব করতো যে আমি আসলে এখানে নেই। আজকে ভাইয়া আমাকে ডাকছে, স্বীকার করে নিচ্ছে যে আমি আসলে এই বাসায় আছি। ব্যাপারটা কী? আমি লাফিয়ে বিছানা থেকে উঠে স্টোররুম থেকে বের হয়ে এলাম। ভাইয়া তার ঘর থেকে আমাকে ডাকছে, আমি সাবধানে ঘরে ঢুকলাম। ভাইয়া বলল, তপু, দ্যাখ জুতো দুটি কী ময়লা হয়েছে। একটু পরিষ্কার করে দে দেখি।
ভাইয়া খুব স্বাভাবিক গলায় কথাটা বলল, যেন আমি সবসময় তার জুতো পরিষ্কার করে দিই। এই বাসায় আমার একটা নতুন জীবন শুরু হতে যাচ্ছেকাল রাতে আম্মু বলেছেন পরীক্ষায় পাস করতে না পারলে আমার পড়াশোনা বন্ধ, আজ সকালে ভাইয়া বলছে তার জুতো পরিষ্কার করে দিতে! আমি জুতো জোড়া তুলে নিলাম, একটা ন্যাকড়া দিয়ে মুছে মুছে জুতোগুলো পরিষ্কার করে ব্রাশ দিয়ে খুব সুন্দর করে কালি করে দিলাম। আগে কখনো জুতো কালি করি নাই কিন্তু ভবিষ্যতে করতে হবে না সেটা কে বলেছে? একটু প্র্যাকটিস থাকা মন্দ নয়!
ভাইয়া জুতোগুলো পরে বলল, বাহ্! একেবারে আয়নার মতো চকচকে বানিয়ে ফেলেছিস। ভেরি গুড।
আমি কিছু বললাম না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। আম্মু ভাইয়া আর আপু সেজেগুজে বের হয়ে গেলো দশটার সময়, আমি বের হলাম এগারোটার সময়।
আমি দুলি খালাকে কিছু বলিনি কিন্তু দুলি খালা বুঝে গেলো। বুঝে গিয়েও দুলি খালা আমাকে থামানোর চেষ্টা করল না। আমি যখন আমার ব্যাগের ভিতরে আমার ময়লা কাপড়গুলো আর বীজ গণিতের বইটা ঢুকালাম তখন দরজার চৌকাঠ ধরে দুলি খালা দাড়িয়ে রইল। আমি যখন বের হয়ে যাচ্ছিলাম তখন দুলি খালা তার শাড়ির খুট থকে কয়েকটা দুমড়ানো-মোচড়ানো নোট বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিল, বলল, নেও। তোমার কাছে রাখো।
আমি মাথা নেড়ে বললাম, না, দুলি খালা লাগবে না।
না লাগলেও রাখো।
আমি কোন কথা না বলে টাকাগুলো পকেটে রাখলাম। দুলি খালা বলল, সাবধানে থাকবা। তোমার কিন্তু খুব বড় বিপদ।
আমি কোন কথা বললাম না। দুলি খালা বলল, মানুযরে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে বাবা-মায়ের দোয়া। তোমার বাবা নাই। তোমার মা তোমার জন্যে দোয়া করে না। তোমার খুব বিপদ।
আমি বললাম, তুমি দোয়া করো।
আমি দোয়া করি। আমি সব সময় দোয়া করি। কিন্তু আমার দোয়া কুনো কাজে আসে না বাবা।
আমি আর কোন কথা না বলে বাসা থেকে বের হয়ে এলাম। ব্যাগটা হাতে নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে একবার পিছন ফিরে বাসাটাকে দেখে রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলাম।
ছুটির দিন বলে রাস্তাঘাটে ভিড় একটু কম। আমি বড় রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা নিরিবিলি জায়গায় দেওয়ালের ওপর পা ঝুলিয়ে বসলাম। বাসা থেকে কোন কিছু চিন্তা না করে বের হয়ে এসেছি, এখন কী করব, কোথায় যাব বিষয়টা নিয়ে একটু ভাবতে হবে।
আমি যখন কমলাপুর রেল স্টেশনে পৌঁছেছি তখন বিকাল হয়ে গেছে। ট্রেন স্টেশন মনে হয় কখনোই ফাঁকা হয় না, সব সময়েই হয় কোন ট্রেন যাচ্ছে না হয় কোন ট্রেন আসছে, মানুষজনের ভিড়। যারা যাচ্ছে এবং যারা আসছে তাদের চেহারায় এক ধরনের ব্যস্ততা থাকে। এদের ছাড়াও স্টেশনে অন্য এক ধরনের মানুষ থাকে, তারা কোথাও যায় না, তারা রেল স্টেশনেই থাকে, এটাই তাদের বাড়িঘর। তাদের চেহারায় কোন ব্যস্ততা নেই। আমার চেহারা নিশ্চয়ই এখন এদের মতো হয়ে গেছে, আমারও কোন ব্যস্ততা নেই। আমি হেঁটে হেঁটে ট্রেনগুলো দেখলাম। কোনটা কোথায় যাচ্ছে ট্রেনের গায়ে লেখা আছে কিন্তু সেটা নিয়ে আমার কোন কৌতূহল নেই। এর মাঝে কোন একটাতে উঠে পড়ব। ইচ্ছে করলে ছাদেও বসতে পারি, সেটা মনে হয় বেশি মজার হবে।
খুঁজে খুঁজে একটা ভাঙ্গাচোরা ট্রেন ঠিক করে আমি তার ছাদে উঠে পড়লাম। এটা নিশ্চয়ই আস্তে আস্তে যাবে, থামতে থামতে যাবে! সেটাই ভাল, আমার কোন তাড়াহুড়ো নেই। ট্রেনের ছাদে আমার মতো আরো অনেকে আছে। পা দুলিয়ে উদাস মুখে বসে আছে। ট্রেনের ছাদে উঠে বসলে হঠাৎ ভিন্ন একটা অনুভূতি মনে হয়। যারা প্লাটফরমে হাঁটাহাঁটি করতে থাকে তাদেরকে অন্য একটা জগতের মানুষ বলে মনে হয়, মনে হয় আকাশের কাছাকাছি বসে আমি পৃথিবীর মানুষকে দেখছি।
ট্রেনের ইঞ্জিন যখন হুইসিল দিয়ে নড়তে শুরু করল তখন হঠাৎ মনে হলো মেয়ের গলায় কেউ যেন আমাকে ডাকছে! আমি অবাক হয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকালাম এবং তখন আমার জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দৃশ্যটা দেখতে পেলাম। আমি দেখলাম প্রিয়াংকা ট্রেনটার পাশ দিয়ে ছুটতে ছুটতে চিৎকার করছে, তপু–তপু—তপু–
আমি কয়েক মুহূর্ত বুঝতে পারলাম না কী করব! এই স্টেশনে প্রিয়াংকা কোথা থেকে এলো, যদি এসেই থাকে তাহলে আমাকে ডাকছে কেন? আর সত্যিই যদি আমাকেই ডাকছে তাহলে কেমন করে জানল আমি এখানে? ট্রেনটা তখন নড়তে শুরু করেছে, কী করব বুঝতে না পেরে আমি উঠে দাঁড়িয়েছি, তখন প্রিয়াংকা আমাকে দেখে ফেলেছে, সে চিলের মতো চিৎকার করতে লাগলো, তপু, এই তপু নাম–নাম তাড়াতাড়ি–
চলন্ত ট্রেনের ছাদ থেকে কীভাবে নামতে হয় আমার জানা নেই। দেখতে দেখতে ট্রেনটার গতি বেড়ে যাচ্ছে, এই মুহূর্তে আমি যদি না নামি তাহলে আর নামতেও পারব না! আমি তাই আগেপিছে কিছু চিন্তা না করে একটা লাফ দিলাম, ট্রেনের ছাদ অনেকটা উঁচু, সেখান থেকে শক্ত প্লাটফর্মে লাফিয়ে পড়া সোজা ব্যাপার না। প্রথমে মনে হলো আমি বুঝি আঁতলে গেছি, হাড়গোড় সব ভেঙ্গে গেছে, আর কোন দিন বুঝি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারব না। প্রিয়াংকা ছুটে এসে আমাকে ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করছে, চিৎকার করে বলছে, সর্বনাশ অপু! সর্বনাশ! ব্যথা পেয়েছিস? ব্যথা পেয়েছিস তুই?
