প্রিয়াংকা বলল, তুই একটা জিনিস জানিস?
কী?
নিজেকে খুশি করা থেকে অন্যকে খুশি করার মাঝে অনেক বেশি আনন্দ!
আমি বললাম, ও!
প্রিয়াংকা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তোর সাথে কথা বলে কোন মজা নেই। তুই শুধু একটা শব্দ জানিস–সেটা হচ্ছে ও!
আমি বোকার মতো আবার বলে ফেললাম, ও!
আর সেটা শুনে প্রিয়াংকা হি হি করে হাসতে শুরু করল।
রাত্রিবেলা হঠাৎ খুব একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটলো, আমাকে আম্মু ডেকে পাঠালেন। আমার বুকটা আতংকে ধ্বক করে উঠল, একবার মনে হলো দরজা খুলে পালিয়ে যাই। অনেক কষ্ট করে নিজেকে শান্ত করে স্টোররুম থেকে বের হয়ে ডাইনিং রুমে এলাম। আম্মু ভাইয়া আর আপুকে নিয়ে খাচ্ছেন, টেবিলে দুলি খালা খাবার সাজিয়ে দিয়েছে। ইলিশ মাছের বড় বড় পেটি লাল করে ভাজা হয়েছে। একসময় আমার খুব প্রিয় খাবার ছিল ইলিশ মাছ, শেষবার কবে ইলিশ মাছ খেয়েছি মনে করতে পারলাম না। ভাতগুলো কী সুন্দর, চিকন এবং ধবধবে সাদা। ডাইনিং টেবিলে প্লেট-গ্লাসগুলো সুন্দর করে সাজানো, পাশে ন্যাপকিন ভাজ করে রাখা।
আম্মু প্লেটে ভাত নিতে নিতে চোখের কোণা দিয়ে আমাকে দেখে মুখ কুঁচকালেন, বললেন, ছিঃ, তোর গায়ে দেখি বোটকা গন্ধ।
আমি লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম। আপু আর ভাইয়া কী সুন্দর কাপড় পরে খেতে বসেছে, আর আমি ময়লা খাটো একটা পায়জামার ওপরে একটা ময়লা শার্ট পরে আছি। শরীরে গন্ধ থাকতেই পারে। আম্মু বললেন, তোর পড়াশোনার কী খবর?।
আমি কোন কথা না বলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার পড়াশোনার অবস্থা একেবারেই ভাল না, অঙ্ক ছাড়া আর কিছু পড়তে ইচ্ছে করে না। সেই অঙ্কেও পরীক্ষায় কোন নম্বর পাই না। স্যাররা যে নিয়মে করতে বলেন সেই নিয়মে না করলে নম্বর দেন না আর যদিও তাদের নিয়মে করি স্যাররা মনে করেন আমি নকল করেছি। প্রথম যখন আম্মু আমাকে ঘেন্না করতে শুরু করেছিলেন তখন আমার পুরো জগৎটা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল, এখন বেশ অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। মেনেই নিয়েছি যে এটাই হবে। তবে পড়াশোনা করাটা অন্য একটা ব্যাপার কারো মন ভেঙ্গে গেলে পড়াশোনা করতে পারে না। আম্মু স্কুলের বেতনই দিতে চান না, অনেক কষ্ট করে ভাইয়াআপুকে বলে সেটা জোগাড় করতে হয়। স্কুলের বইও আমার নেই, কিছু পুরানো বইয়ের দোকান থেকে কিনেছি, কিছু ক্লাসের অন্য ছেলেমেয়ের কাছে থেকে চুরি করেছি। বইপত্র খাতা কলম না থাকলে মানুষ কেমন করে পড়ে? কাজেই আমি আম্মুর প্রশ্নের কোন উত্তর দিলাম না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম।
আম্মু ইলিশ মাছের পেটিগুলো ভাইয়া আর আপুর প্লেটে তুলে দিতে দিতে বললেন, কী হলো? কথার উত্তর দিস না কেন?
আমি এবারেও কিছু বললাম না, মাথাটা আরো নিচু করে ফেললাম।
আম্মু বললেন, পড়াশোনা করবি না কিছু না, চুরি-চামারি করে বেড়াবি আর আমি তোর পিছনে টাকা ঢালব সেটা হবে না। বুঝেছিস?
আমি মাথা নাড়লাম। আম্মু বললেন, শুনে রাখ, তুই যদি পাস করতে না পারিস তোর পড়াশোনা বন্ধ।
আমি আবার মাথা নাড়লাম, সত্যি কথা বলতে কী মনে মনে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। পড়াশোনা যে আমার জন্যে নয় সেটা বেশ কিছুদিন হলো আমি বুঝে গেছি, শুধু সেটার জন্যে কষ্ট করার কোন মানে হয় না। যখন আব্বু বেঁচেছিলেন, যখন সবাই আমাকে আদর করতো তখন আমার কতো রকম স্বপ্ন ছিল। এখন আমার কোন স্বপ্ন নেই, সবচেয়ে বড় কথা সেটা নিয়ে কোন দুঃখও নেই।
আম্মু বললেন, যা সামনে থেকে।
আমি সুড়ুৎ করে আমার স্টোররুমে চলে এলাম।
রাত ঠিক দশটার সময় আমার অতিথি চলে এলো, আমি আজকাল নেংটি ইঁদুরটার জন্যে অপেক্ষা করে থাকি। ছোট ছোট লাফ দিয়ে বেশ নির্ভয়ে সে আমার হাতে উঠে কুটুর কুটুর করে তার রুটিটা খেতে শুরু করলো। আমি ফিসফিস করে বললাম, কী খবর মিচকি মিয়া?
নেংটি ইঁদুর আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। আমি বললাম, মিচকি মিয়া। আজকে আমার জন্যে গুড নিউজ। আমার আর পড়াশোনা করতে হবে না! কী মজা, তাই না?
মিচকি মাথা নাড়লো, পড়াশোনা না করা যে অনেক আনন্দ সেটা সেও স্বীকার করে নিল। আমি বললাম, তার মানে বুঝেছিস? আমার বাসা থেকে পালানোর সময়টা এসে গেছে। একা একা থাকতে তোর মন খারাপ হবে। নাকী?
মিচকি আবার মাথা নাড়লো, আমি ধরে নিলাম তার মানে হচ্ছে হ্যাঁ। আমি বললাম, মন খারাপ করিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।
মিচকি রুটির প্রথম টুকরোটা শেষ করে দ্বিতীয় টুকরোর জন্যে এদিক সেদিক তাকাতে থাকে। আমি পকেট থেকে ছোট আরেকটা টুকরো বের করে তাকে ধরিয়ে দিলাম, সে সাথে সাথে গভীর মনোযোগ দিয়ে সেটা খেতে শুরু করলো। এইটুকু একটা প্রাণী কিন্তু তার পেটের সাইজটা মনে হয় খারাপ না!
আমি বললাম, তুই ইচ্ছে করলে আমার সাথে যেতে পারিস। আমার পকেটে থাকবি। ঘুমাবি। ঘুরে বেড়াবি আমার সাথে। যাবি?
মিচকি তার খাওয়া নিয়ে এতো ব্যস্ত ছিল যে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে বেশি আগ্রহ দেখালো না।
আমি পরের দিন সকাল এগারোটার সময় বাসা থেকে পালিয়ে গেলাম। সেদিনই যে বাসা থেকে পালাব সেটা আমি আগে থেকে ঠিক করি নাই। দিনটি ছুটির দিন, স্কুল কলেজ অফিস সবকিছু বন্ধ কাজেই সবাই বাসায়। ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়েছে, বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি শুনতে পাচ্ছি অন্য সবাই উঠে গেছে, ব্যস্ত গলায় কথা বলতে বলতে ঘরের ভেতরে হাঁটাহাঁটি করছে। ভাইয়া আপু আর আম্মুর কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছিল তারা কোথাও যাবে তাই তাড়াহুড়ো করে রেডি হচ্ছে। সবাই যদি সারাদিনের জন্যে চলে যায় তাহলে খারাপ হয় না, পুরো বাসাটা তাহলে আমি পেয়ে যাব, এই ছোট স্টোররুমের বাইরেও আমি একটু নাড়াচাড়া করতে পারব।
