শিউলি এমন ভাবে চমকে উঠল যে সেটা বলার মতো না! সবগুলি মেয়ে তখন নিজেরা হাত ধরাধরি করে শিউলিকে ঘিরে নাচতে লাগলো আর হ্যাপি বার্থডে গান গাইতে লাগলো! শিউলি চোখ বড় বড় করে সবার দিকে তাকিয়ে থাকে, লজ্জায় মনে হয় সে মরে যাচ্ছে, তার মুখের রঙ লাল নীল বেগুনি হতে থাকে! সবকিছু মিলে পুরো ব্যাপারটা ন্যাকামির চূড়ান্ত, কিন্তু ঠিক কী কারণ জানি না দেখে আমার ভালই লাগলো। শিউলি ক্লাসের সবচেয়ে লাজুক আর চুপচাপ মেয়ে, তার মনে হয় অনেকটা আমার মতো অবস্থা, বন্ধু বান্ধব বেশি নাই। তাকে নিয়ে এত হৈচৈ সে নিজেও বিশ্বাস করতে পারছে না।
গান গাওয়া শেষ হলে প্রিয়াংকা তার ব্যাগ খুলে শিউলির জন্যে একটা গিফটের প্যাকেট বের করলো। তার দেখা দেখি অন্যেরাও। কোনটাতে বই, কোনটাতে মাথার ক্লিপ, কোনটাতে কলম। কয়েকটা ছেলেও দেখি গিফট এনেছে, ছেলেরা মনে হয় গিফট কেনার ব্যাপারে বেশি সুবিধের না, চানাচুর না হয় চিপসের প্যাকেট কিনে এনেছে! শিউলি খুলে বের করা মাত্রই নিজেরাই কেড়ে নিয়ে খুলে সবাই মিলে খাওয়া শুরু করে দিল। আমি এসব হৈচৈ আনন্দ থেকে দূরে থাকি, আজকেও দূরে থেকে দেখলাম। দেখে ভালই লাগলো, মনে হলো সবাই মিলে খুব মজা করছে। প্রিয়াংকা মেয়েটা আসার আগে ছেলেরা আর মেয়েরা মিলে এক সাথে হৈচৈ করছে ব্যাপারটা চিন্তাই করা যেতো না।
বিকাল বেলা স্কুল থেকে বের হয়ে আসি হাঁটছি তখন হঠাৎ কোথা থেকে জানি প্রিয়াংকা ছুটে এসে আমার পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো। আমাকে জিজ্ঞেস করলো, তোর বাসা কী এদিকে?
আমি হ্যাঁ না কিছু না বলে অস্পষ্ট একটা শব্দ করলাম। আমার বাসা কোথায় আমি সেটা কাউকে বলতে চাই না। স্কুল ছুটির পর আমি কোন দিনও বাসায় যাই না। রাস্তায় বের হয়ে ইতস্তত হাঁটাহাঁটি করে যখন অন্ধকার হয়ে যায় তখন চোরের মতো বাসায় ফিরে যাই। প্রিয়াংকা কী বুঝলো কে জানে নিজের মনে বকবক করতে লাগলো। আমি কোন কথা না বলে তার কথা শুনতে লাগলাম। মেয়েটা নিঃসন্দেহে একটা মজার মেয়ে, এমন সুন্দর করে কথা বলতে পারে যে শুনতে খুব মজা লাগে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে দাঁড়িয়ে গেলো। আমি বললাম, কী হয়েছে?
প্রিয়াংকা ফিসফিস করে বলল, ঐ দেখ।
আমি প্রিয়াংকার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকিয়ে এমন কিছু অস্বাভাবিক জিনিস। দেখতে পেলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, কী দেখব?
প্রিয়াংকা চাপা স্বরে বলল, বাচ্চা মেয়েটাকে দেখছিস না?
আমি তখন ধুলায় ধূসর চার-পাঁচ বছরের একটা বাচ্চা মেয়েকে দেখতে পেলাম। রাস্তার ধুলোয় পা ছড়িয়ে বসে আপন মনে খেলছে। রুক্ষ লাল জটা বাধা চুল, ময়লা একটা ফ্রক পরে আছে। প্রিয়াংকা আবার গলা নামিয়ে বলল, এই মেয়েটাকে খুঁজছি কয়দিন থেকে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কেন? এই মেয়ে কী করেছে?
কিছু করে নাই। মেয়েটার খুব শখ একটা লাল জামার।
তুমি কেমন করে জানো?
সেইদিন তার মায়ের সাথে বসেছিল তখন দেখেছে একটা ছোট মেয়ে লাল জামা পরে তার আম্মু-আব্বুর সাথে যাচ্ছে। তখন সে তার মাকে বলেছে, মা আমারে একটা লাল জামা কিনে দিবা? তার মা তখন কী করেছে জানিস?
কী করেছে?
ঠাস করে গালে একটা চড়। চড় দিয়ে বলে পেটের ক্ষিদায় জান বাঁচে না, লাল জামার শখ! মেয়ের শখ দেখো!
আমি বললাম, ও।
প্রিয়াংকা বলল, এত শক্ত একটা চড় খেয়েও কিন্তু মেয়েটা চোখের পানি ফেলে নাই। মায়ের দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইল।
আমি আবার বললাম, ও!
প্রিয়াংকা তার ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করে বলল, এই মেয়েটার জন্যে একটা লাল জামা কিনেছি। কয়দিন থেকে মেয়েটাকে খুঁজছি, আজকে পেয়ে গেলাম!
আমি অবাক হয়ে প্রিয়াংকার দিকে তাকিয়ে রইলাম। প্রিয়াংকা মুখ টিপে হেসে বলল, প্যাকেটটা খুলে মেয়েটা যখন দেখবে ভিতরে একটা লাল জামা কী খুশি হবে চিন্তা করতে পারিস?
মেয়েটা লাল জামাটা পেয়ে কতটুকু খুশি হবে জানি না, কিন্তু লাল জামার প্যাকেটটা দেয়ার জন্যে এই ছোট নোংরা বাচ্চাটাকে দেখে প্রিয়াংকা যে অসম্ভব। খুশি হয়ে উঠেছে, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। প্রিয়াংকা প্যাকেটটা হাতে। নিয়ে বাচ্চাটার কাছে এগিয়ে গিয়ে ডাকলো, এই যে, শুনো।
বাচ্চা মেয়েটা চোখ তুলে তাকালো, মনে হলো একটু ভয়ে ভয়ে।
প্রিয়াংকা বলল, এই যে নাও। এইটা তোমার জন্যে।
মেয়েটা একটু ভয়ে ভয়ে প্যাকেটটা হাতে নিয়ে হঠাৎ বুকে চেপে ধরল, দেখে মনে হলো সে ভয় পাচ্ছে যে কেউ বুঝি তার কাছ থেকে এটা কেড়ে নেবে। প্রিয়াংকা তাকে অভয় দেবার জন্যে একটু হাসলো কিন্তু বাচ্চা মেয়েটা তারপরেও খুব অভয় পেলো বলে মনে হলো না। প্যাকেটটা বুকে চেপে ধরে রেখে বড় বড় চোখে প্রিয়াংকার দিকে তাকিয়ে রইল।
প্রিয়াংকা তখন সোজা হয়ে দাড়িয়ে আমার হাত ধরে টেনে বলল, আয়। যাই।
আমি নিচু গলায় বললাম, প্যাকেটটা খুলে কী করে দেখবে না?
নাহ।
কেন?
আমি সেটা কল্পনা করে দেখে নেব। কল্পনা করে দেখতে আরো বেশি মজা!
আমি প্রিয়াংকার সাথে হাঁটতে হাঁটতে বললাম, তুমি মাঝে মাঝেই এরকম করো?
প্রিয়াংকা মাথা নাড়ল, বলল, হ্যাঁ। আমি এটাকে বলি বিক্ষিপ্ত ভাবে আনন্দ বিতরণ। চিনি না জানি না সেরকম মানুষকে হঠাৎ করে কোনভাবে খুশি করে দেওয়া।
ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে অসাধারণ, আমার সুন্দর করে কিছু বলা উচিত ছিল, কিন্তু আমি বললাম, ও।
