আমি বললাম, ও। প্রিয়াংকা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি ঠিক করে বলতে পারলাম না তাই তুই বলছিস ও! যদি ম্যাডামের কথা শুনতি তাহলে তোর চোখ ভিজে আসত।
আমি আবার বললাম, ও।
প্রিয়াংকা এবারে তার মুখটা আমার কাছাকাছি এসে ষড়যন্ত্রীর মতো করে বলল, প্রিন্সিপাল ম্যাডাম কেন হিন্দু-মুসলমান নিয়ে কথা বলছেন, বল দেখি?
আমি বললাম, কেন?
তোর জন্যে! তুই যে রাজাকার স্যারের কথা বলে দিয়েছিলি মনে আছে? ক্লাসে হিন্দু ছেলেমেয়েদের পেটাতেন–
আমি বললাম, ও।
প্রিয়াংকা বিরক্ত হয়ে বলল, তোর হয়েছেটা কী? তোকে যেটাই বলি তুই। বলিস, ও!
আমি একটু লজ্জা পেলাম, বললাম, না মানে ইয়ে—
তুই কী অন্য কিছু ভাবছিস?
আমি আসলে অন্য কিছু ভাবছিলাম না, প্রিয়াংকা কী বলছে সেটাই খুব মন দিয়ে শুনছিলাম, কিন্তু আমার সমস্যা হলো মানুষের সাথে কতা না বলতে বলতে আমি আজকাল আর ঠিক করে কারো সাথে কথা বলতে পারি না। কেউ কিছু বললে তার উত্তরে ও তাই নাকী আচ্ছা এই রকম কথাবার্তা ছাড়া আর কিছু বলতে পারি না। কিন্তু প্রিয়াংকাকে সেটা বলতে আমার লজ্জা করল, তাই বললাম, হ্যাঁ আসলে একটা জিনিস ভাবছিলাম তো–
কী জিনিস?
মানে–ইয়ে একটা অঙ্ক।
অঙ্ক? প্রিয়াংকা চোখ কপালে তুলে বলল, কী রকম অঙ্ক?
ইয়ে একটা সমবাহু ত্রিভুজের তিন বাহুর মাঝখানে যদি আরো তিনটা ছোট সমবাহু ত্রিভুজ আঁকা যায়–আমি প্রিয়াংকাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম সে ঠিক বুঝতে পারল বলে মনে হলো না। তখন খাতা বের করে পুরোটা এঁকে বললাম, এই যে ক্ষেত্রটা দেখছ এটা খুব বিচিত্র খুব একটা ক্ষেত্র।
কেন?
আমি যদি তোমাকে বলি একটা কলম দিয়ে এর পরিসীমাটা আঁকো তুমি পারবে না। পৃথিবীর সমস্ত কলম দিয়ে আঁকার চেষ্টা করলেও পারবে না, কারণ এর পরিসীমা হচ্ছে অসীম! ইনফিনিটি?
প্রিয়াংকা বলল, তাই নাকী?
হ্যাঁ।
কিন্তু তোমাকে যদি বলি এর ভেতরের ক্ষেত্রফলটা রং করে দাও তাহলে তুমি একটা কলম দিয়ে ঘষে ঘষে রং করে ফেলতে পারবে! ক্ষেত্রফল হচ্ছে সসীম কিন্তু পরিধি হচ্ছে অসীম–কী অদ্ভুত দেখেছ?
বিষয়টা যে খুব অদ্ভুত সেটা প্রিয়াংকা প্রথমে ঠিক বুঝতে পারে নি। খানিকক্ষণ চেষ্টা করে তাকে বোঝাতে হলো। যখন সত্যি সত্যি বুঝতে পারল তখন সে এতো অবাক হলো বলার মতো নয়। একটু পরে পরে বলতে লাগলো, এটা কেমন করে সম্ভব? এটা কেমন করে সম্ভব?
আমি বললাম, খুব সম্ভব। তুমি নিজেই দেখছ।
প্রিয়াংকা খানিকক্ষণ আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল, তোর অঙ্ক করতে খুব ভাল লাগে?
আমি ইতস্তত করে বললাম, তা তো জানি না।
তুই বড় হয়ে গণিতবিদ হবি?
আমি হেসে ফেললাম, বললাম, ধুর!
প্রিয়াংকা ভাবল আমি বিনয় করছি, কিন্তু আমি যে দুই একদিনের মাঝে বাসা থেকে সারা জীবনের মতো পালিয়ে যাব কেউ আর আমার খোঁজ পাবে না সেটা আর বললাম না। বড় জোর একটা বেদে হয়ে পথেঘাটে সাপের খেলা দেখাব। আমার জীবনে এর থেকে বেশি আর কী হতে পারে? আমি জানি আমার কপালে এটা সিল মেরে লিখে দেওয়া আছে।
০৬. পলাতক
বাসা থেকে পালিয়ে যাবার জন্যে অনেক কষ্টে একটু একটু করে টাকাগুলো জমিয়েছিলাম, আমার তোষকের তলায় সেগুলো পেয়ে আম্মু নিয়ে গেছেন। আম্মু ধরে নিয়েছেন সেগুলো আমি চুরি করে এনেছি আর সেদিন রাত্রে ভাইয়ার রুমেও গিয়েছিলাম চুরি করতে। আম্মুর সন্দেহ পুরোপুরি মিথ্যা না আর সেটা চিন্তা করে আমি নিজের ভিতরে নিজে কেমন যেন ছোট হয়ে গেছি। আমার মনটা আসলে ভেঙ্গে গেছে, সত্যি সত্যি আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে। আমি আসলে খারাপ ছেলে, আমি চোর। শুধু যে নিজেকে চোর মনে হয় তা না আমি কেমন যেন ভীতু হয়ে গেছি। আম্মুর হাতে সেদিন ওরকম মার খেয়ে আমার ভিতরে কেমন যেন পরিবর্তন হয়ে গেছে। যতক্ষণ বাসায় থাকি স্টোররুমে গুটিশুটি মেরে বসে থাকি, বাসার ভিতরে কোথাও আম্মুর গলার স্বর শুনলেই কেমন জানি চমকে উঠি। বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হয়ে যায়।
বাসা থেকে বের হলে আমি খানিকটা সাহস পাই। স্কুলে এলে খুব খারাপ লাগে না। প্রিয়াংকা মেয়েটা অনেকটা ম্যাজিকের মতো আমার মতো খারাপ ছেলের সাথেই সে কথাবার্তা বলে তাহলে অন্যদের সাথে তার কেমন বন্ধুত্ব হয়েছে সেটা আন্দাজ করা যায়। প্রিয়াংকার দেখাদেখি অনেক মেয়েই এখন সাহস করে ক্লাসের যেখানে ইচ্ছে সেখানে বসে যায়। মেয়েদেরকে সামনে বসতেই হবে সেই নিয়মটা আর নেই। রাজাকার স্যারের সেইটা নিয়ে মেজাজ খারাপ, কিন্তু কিছু বলতে পারেন না। আমাকে টি.সি. দিয়ে বিদায় করতে পারেন নাই সে জন্যে স্যার ভিতরে ভিতরে জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে গেলেও কিছু করতে পরছেন না। স্যার বুঝে গেছেন প্রিন্সিপাল ম্যাডাম আমাদের পক্ষে।
প্রিয়াংকা মেয়েটা বেশ মজার, তার মাথার মাঝে একটা পাগলামোর ভাব আছে। সেদিন ক্লাসে এসে দেখি সে সবাইকে নিয়ে কী একটা ষড়যন্ত্র করছে। ষড়যন্ত্রটা খুব মজার। আজকে নাকী শিউলির জন্মদিন, তাই যখন শিউলী ক্লাসে আসবে তখন হঠাৎ করে সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠবে, হ্যাপি বার্থডে! শুধু তাই না প্রিয়াংকা আর কয়েকজন মিলে মনে হয় শিউলির জন্যে গিফটও নিয়ে এসেছে। প্রিয়াংকা নিজে গিয়ে বাইরে দাড়িয়ে রইল, যখন দেখলো শিউলি আসছে তখন সে ভিতরে ছুটে এসে সবাইকে সাবধান করে দিলো। ক্লাসের সবাই যে যেখানে ছিল সেখানে দাড়িয়েই খুব স্বাভাবিক ভান করতে লাগলো। শিউলি কিছু জানে না, সে এসে তার ব্যাগ রেখে তার নিজের জায়গায় বসেছে। তখন কথা নাই বার্তা নেই হঠাৎ করে পুরো ক্লাসের সবাই মিলে বিকট সুরে চিৎকার করে উঠল, হ্যা-পি-বার্থ-ডে-শি-উ-লি!
