ভালো।
রফিক কপালে হাত দিয়ে বলল, জ্বর এখন সামান্যই আছে। নাশতা খাবেন? ক্ষিধা পেয়েছে?
না।
একগ্লাস লেবুর শরবত বানিয়ে নিয়ে আসি। জ্বরের রেমিশন হলে শরীরে হাই ডোজের ভিটামিন সি পড়লে শরীর ঝন করে ঠিক হয়ে যায়।
শরবত খাব না।
তাহলে মসলা চা খান। আদা-লং আর এলাচ দিয়ে খাঁটি নেপালি মসলা চা। রাহেলা ঘরে নেই। চা আমাকেই বানাতে হবে।
রাহেলা কোথায়?
রফিক বিরক্ত মুখ করে বলল, জানি না কোথায়। রাতে মাইল্ড একটা ঝগড়া হয়েছে। সকালে ঘুম ভেঙে দেখি সে নাই। কাজের মেয়েটাও নাই। দুজন নাকি এক সঙ্গে বের হয়েছে।
কোথায় গেছে কাউকে বলে যায় নি?
পৃথুকে বলে গেছে। আমি পৃথুকে জিজ্ঞেস করলাম, কী বলে গেছে? সে বলল, তার মনে নাই। গাধা টাইপ ছেলে হলে যা হয়। যাই হোক ভাইজান আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। সে তার কোনো বান্ধবীর বাসায় ঘাপটি মেরে পড়ে আছে। যাবে আর কোথায়? যাবার কি জায়গা আছে নাকি।
শামসুদ্দিন বিছানায় উঠে বসতে বসতে বললেন, শরীরের এই অবস্থায় রাগারাগি করে ঘর থেকে বের হওয়া ঠিক না।
রফিক সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, ঠিক না তো অবশ্যই। তাকে কে বোঝাবে? কাল রাতে সে ডিসিসান নিয়েছে কাজের মেয়ে ছাড়িয়ে দেবে। ভালো একটা কাজের মেয়ে পাওয়া আর সোনার খনি পাওয়া সেম জিনিস। ক্রিকেট খেলায় কিছু কিছু ব্যাটসম্যান যেমন সেট হয়ে যায়, কাজের মেয়েও সেট হয়ে যায়। সামান্য দোষত্রুটি থাকলেও সেট হওয়া কাজের মেয়ে বিদায় করতে নেই।
শামসুদ্দিন কিছু বললেন না।
রফিক বলল, ভাইজান সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ কি খারাপ লাগছে? যদি খারাপ না লাগে তাহলে বুঝবেন অসুখ সেরে গেছে। অসুখটা সেরেছে কি-না
এটা জানার জন্যেই আপনার মুখের কাছে ধোয়া ছাড়ছি।
গন্ধটা তেমন খারাপ লাগছে না।
তাহলে উঠে হাতমুখ ধোন। আমি হোটেল থেকে ডালপুরি নিয়ে আসি। কিংবা পৃথুর সঙ্গে টিভি দেখতে পারেন।
টিভি কিনেছ না-কি?
টিভি কিনব কী জন্যে? নষ্ট টিভি সারাতে দিয়েছিলাম। সারিয়ে দিয়ে গেছে।
রাহেলা বলেছিল টিভি বিক্রি করে দিয়েছ।
রফিক বিস্মিত হয়ে বলল, টিভি বিক্রি করে দেব কী জন্যে? ভাইজান শুনুন, আপনার বোনের বেশিরভাগ কথাই বিশ্বাস করবেন না। বিশ্বাস করলে ধরা খাবেন। সে এমনভাবে মিথ্যা কথা বলে যে শুনলে মনে হবে সুতোর বাবা। অবশ্যই এটা একটা অসুখ। এই অসুখের চিকিৎসা আছে কি-না জানি না। জ্বর হলে ডাক্তারকে গিয়ে বলতে পারি- জ্বর হয়েছে। ট্যাবলেট দেন। এখন ডাক্তারকে গিয়ে কী বলব, আমার স্ত্রী শুধু মিথ্যা কথা বলে, ট্যাবলেট দেন?
শামসুদ্দিন হেসে ফেললেন। রফিকের কথা শুনে এত ভালো লাগছে। রাহেলা তার স্বামী সম্পর্কে যা বলেছে সবই যে বানিয়ে বলেছে তা বোঝা যাচ্ছে। এটা আনন্দ এবং স্বস্তির বিষয়। তার মনে হলো শরীরে যতটুকু অবসাদ আছে সবটাই কেটে গেছে।
ভাইজান, কাল বৃষ্টিতে ভিজে এত রাতে কোথেকে ফিরেছেন? রাতে আপনার যে অবস্থা ছিল কিছু জিজ্ঞেস করি নি।
জয়নালের বাসায় গিয়েছিলাম।
জয়নালটা কে?
সেও আমার সঙ্গে ভিসা পেয়েছে। দুজন এক সঙ্গে আমেরিকা যাব। অত্যন্ত ভালো ছেলে। আমাকে তার বাসায় রেখে আধঘন্টার জন্যে কোথায় যেন গিয়েছিল। তারপর আর ফিরে না। অপেক্ষা করতে করতে দেরি হয়ে গেল। বাসায় আর কেউ নেই, আমি একা।
শেষে ফিরেছে তো?
না। তার টেবিলের উপর তালাচাবি ছিল। ঘরে তালা দিয়ে আমি চাবি নিয়ে চলে এসেছি। চিঠি লিখে এসেছি আমার কাছ থেকে যেন চাবি নিয়ে যায়।
রফিক বিরক্ত গলায় বলল, ভাইজান আপনি ঐ ছেলের কাছ থেকে দশ হাত দূরে থাকবেন। বোঝাই যাচ্ছে ধান্দাবাজ ছেলে। আপনার সঙ্গে ব খাতির জমাবে। এক সময় টাকা ধার করবে। এই টাইপ ছেলে আমি লি।
ছেলেটা সে-রকম না। কোনো বিপদে নিশ্চয়ই পড়েছে।
কোনো বিপদে পড়ে নি। কোনো একটা চাল চেলেছে। চাল না চললে খালি বাসায় আপনাকে বসিয়ে রেখে আধঘণ্টার কথা বলে বাইরে যায়? অপু সোজা-সরল মানুষ। যে যা বলে তাই বিশ্বাস করেন। ধান্দাবাজ লোক আপনার মতো মানুষ খোঁজে। তারপর সুযোগ বুঝে ঘাড়ে চেপে বসে। একেবারে সিন্দাবাদের ভুত। ঘাড় থেকে নামানোই যাবে না।
রফিক হোটেলে নাস্তা কিনতে গেল। শামসুদ্দিন পৃথুর পাশে এসে বসলেন। তার মাথা ঝিমঝিম করছে। মাথা সোজা করে বেশিক্ষণ বসে থাকা যাবে বলে মনে হয় না। কষ্ট করে হলেও কিছুক্ষণ পৃথুর সঙ্গে থাকা। মামাকে পাশে বসতে দেখে পৃথু আনন্দে অভিভূত গলায় বলল, মামা দেখ, বাবা টিভি এনেছে। রাতে এনেছে।
শামসুদ্দিন বললেন, খুব খুশি?
পৃথু মামার গায়ে এলিয়ে পড়ে বলল, হুঁ। তুমি খুশি মামা?
হুঁ। আমিও খুশি।
দুজনের মধ্যে কে বেশি খুশি মামা? তুমি না আমি?
মনে হচ্ছে আমি বেশি খুশি।
পৃথু চোখ মুছতে মুছতে বলল, হয় নি। আমি খুশি। শামসুদ্দিন অবাক হয়ে বললেন, তুই কি খুশিতেই কাঁদছিস না-কি?
পৃথু বলল, জানি না।
শামসুদ্দিন বাঁ হাতে পৃথুকে জড়িয়ে ধরলেন। পৃথু গাঢ় গলায় বলল, বাবা বলেছে মা না আসা পর্যন্ত আমি টিভি দেখতে পারব। আজ আমাকে স্কুলেও যেতে হবে না।
তাহলে তো তোর আজ ঈদ!
হুঁ।
তোর মা যদি সারাদিন না ফেরে তাহলে কী করবি? সারাদিন টিভি দেখবি?
হুঁ।
আমেরিকা থেকে তোর জন্যে কী আনব?
বন্দুক।
শুধু বন্দুক, আর কিছু না?
না।
বড় হয়ে তুই কী হবি রে পৃথু?
কিছু হবে না মামা।
ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার সায়েন্টি কিছুই হবি না?
