ভালো করেছ।
খুবই কষ্টের জীবন গিয়েছে। এখন আল্লাহপাকের দয়া হয়েছে। তিনি মুখ তুলে তাকিয়েছেন, হাতে কেঁচি সাপ্লাই করেছেন। আর অসুবিধা নাই।
কেঁচি সাপ্লাই করেছেন–মানে বুঝলাম না।
আল্লাহপাক তার পছন্দের মানুষদের হাতে একটা করে ধারালো কেঁচি সাপ্লাই করেন। তাঁর পছন্দের মানুষরা সেই কেঁচি দিয়ে তার সামনের সমগ্র বাধা বিপত্তি কচকচ করে কাটতে কাটতে এগোতে থাকে। আমার হাতে এতদিন কোনো কেঁচি ছিল না, এখন আছে। আমেরিকান ভিসাটা হলো সেই কেঁচি।
শামসুদ্দিন হেসে ফেললেন। জয়নাল বলল, আপনি ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে টাইট হয়ে ঘুম দেন। আমি কাজ সেরে এসে আপনাকে ডেকে তুলব।
আচ্ছা যাও।
কোথায় যাচ্ছি আপনাকে বলেই যাই। শেষ পর্যন্ত তো আপনাকে বলতেই হবে। আমার আত্মীয়স্বজন কেউ নেই আপনাকে আমার উকিল বাপ হতে হবে।
বিয়ের কোনো ব্যাপার?
ঠিক ধরেছেন। মেয়ের নাম ইতি। খুবই সুন্দরী মেয়ে। ফার্স্ট ইয়ার ইন্টারে পড়ে। আমার এক বন্ধু আছে সালাম নাম। তার খালাতো বোন। সালামের মাধ্যমে পরিচয়।
ইতিকে বিয়ে করবে বলে ঠিক করেছ?
আমার দিক থেকে খুবই ইচ্ছা আছে। ইতির ইচ্ছা আছে কিনা জানি না। চ্যাং ব্যাং টাইপ মেয়ে তো, এদের অসিল ভাব বোঝা যায় না।
চ্যাং ব্যাঙ টাইপ মেয়ে মানে?
এরা সব ছেলের সঙ্গে ভাব করে। যে ছেলের সঙ্গে পরিচয় হয় তার সঙ্গেই এমন ভাব করে যেন গলে যাচ্ছে। কিন্তু বিয়ে করার সময় বাবা মা যাকে নিয়ে আসে তাকে বিয়ে করে। এখন অবশ্যি আমার আশা আছে আমেরিকান ভিসা হয়ে গেছে। গেট পাস পেয়ে গেছি। ওরা রাজি হলে তুমি কি ইতিকে বিয়ে করে যাবে?
হুঁ। চাচাজি আমার ধারণা বিয়ে হয়েও যাৰে। দুর্ভাগ্য যখন আসে একের পর এক আসতে থাকে। সৌভাগ্যের বেলাতেও তাই, সৌভাগ্য আসতে শুরু করলে একের পর এক আসতেই থাকে। নেন, আরেকটা সিগারেট নেন। টান দিয়ে শুয়ে পড়ন।
জয়নাল মশারি খাঁটিয়ে দিল। শামসুদ্দিন দিনের বেলাতে মশারির ভেতর ঢুকে গেলেন। ঘুমের জন্যে দিনটা ভালো। আকাশে মেঘ ছিল, দেখতে দেখতে আঁধার করে বৃষ্টি নামল। টিনের চালে ঝুম ঝুম শব্দ। বাতাসের ঝাপ্টায় জানালা দিয়ে সজনে গাছের ডাল ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। শীত শীত লাগছে। চাদর গায়ে জড়িয়ে শামসুদ্দিন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন। ঘুম ভাঙল বিকাল পাঁচটায়, তখনো জয়নাল ফিরে নি। আধ ঘণ্টার জন্যে গিয়ে এতক্ষণ দেরি করার কোনো কারণ নেই।
শামসুদ্দিন বিছানা থেকে নামলেন। কেরোসিনের চুলা জ্বালিয়ে নিজেই চা বানিয়ে খেলেন। পুরনো ম্যাগাজিন পড়লেন। রাত আটটা বেজে গেল, জয়নাল ফিরল না। তিনি কী করবেন বুঝতে পারছেন না। ঘরে তালা লাগিয়ে চলে যেতে পারেন। তালার সঙ্গে চিঠি লিখে যাবেন—
জয়নাল,
তোমার দেরি দেখে চলে গেলাম।
তোমার ঘরের চাবি আমার কাছে।
ইতি শামসুদ্দিন
কিংবা চাবিটা বাড়িওয়ালার কাছেও রেখে যেতে পারেন।
বৃষ্টি কমে গিয়েছিল। রাত আটটার পর আবার বাড়ল। রীতিমতো ঝড়। ঘর-বাড়ি কাপছে। কোনো একটা ফুটো দিয়ে ঘরে পানি ঢুকছে। মেঝেতে চার আঙুল পানি জমে গেছে। রাত সাড়ে নটার দিকে ইলেকট্রিসিটিও চলে গেল। চারদিকে ঘন অন্ধকার। দেয়াশলাইও জ্বালানো যাচ্ছে না। ম্যাচ বাক্স বৃষ্টির পানিতে ভিজে গেছে।
রাত এগারোটার দিকে জয়নালের ঘরে তালা লাগিয়ে শামসুদ্দিন নিতে বাসার দিকে রওনা হলেন। চিঠি লিখে আসা হলো না। কীভাবে লিখবেন? কলম কাগজ অন্ধকারে কোথায় খুঁজবেন। শামসুদ্দিনের দুশ্চিন্তার কোনো সীমা রইল না। জয়নাল ছেলেটা কোনো বিপদে পড়ে নি তো? কোনো এক্সিডেন্ট? বিপদে তো সে অবশ্যই পড়েছে। বিপদটা কী রকম?
রাত এমন কিছু না। মাত্র এগারোটা। অথচ পুরো শহর ফাকা। রাস্তায় নদীর মতো চলমান পানি। ম্যানহোলে পানি পড়ছে–শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে বান ডাকছে। খালি রিকশা অনেক আছে, কোনোটাই যেতে রাজি না। একজুন পঁচিশ টাকা ভাড়ায় যেতে রাজি হলো। শামসুদ্দিন রাস্তার ময়লা পানিতে মাখামাখি হয়ে যখন রিকশাওয়ালার কাছাকাছি পৌছলেন তখন সে বলল না যাব না। শামসুদ্দিন শীতে কাঁপতে কাঁপতে হেঁটে বাড়ি ফিরলেন।
ঘরে কি টেলিভিশন চলছে
ঘরে কি টেলিভিশন চলছে?
টেলিভিশনের শব্দই তো আসছে। কার্টুন চ্যানেল। ঝা ঝুমঝুম ঋ মিউজিক। পৃথুর হাসি শোনা যাচ্ছে। এই ছেলেটার হাসি খুব অদ্ভুত। খিলখিল করে হাসতে হাসতে হঠাৎ থেমে একেবারে চুপচাপ। একশ কিলোমিটারের গাড়ি হঠাৎ ব্রেক কষে থেমে গেল।
শামসুদ্দিনের মনে হলো তিনি স্বপ্ন দেখছেন। ঘরে টিভি থাকার কথা না। রফিক টিভি বিক্রি করে দিয়েছে। টিভি থাকলেও রাহেলা পৃথুকে সকালবেলা টিভি দেখতে দেবে না। রাহেলার নিয়ম কানুন খুব কড়া।
তিনি পাশ ফিরলেন। আসলেই স্বপ্ন দেখছেন কি-না এটা জানার জন্যে পাশি ফেরা। স্বপ্নে মানুষ অনেক কিছুই করতে পারে, পাশ ফিরতে পারে না। সহজেই তিনি পাশ ফিরলেন। তিনি জেগে আছেন এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেল। তার কি শরীর খারাপ করেছে? মাথায় ভেঁতা যন্ত্রণা। চোখ মেলতে পারছেন না। কেউ যেন সুপার গ্লু দিয়ে চোখের পাতা আটকে দিয়েছে। মুখের ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে অথচ পানির তৃষ্ণা নেই। অসুস্থ মানুষের শরীর পানির জন্যে খাঁ খাঁ করে অথচ তার তৃষ্ণা হয় না।
ভাইজান, শরীরের অবস্থা এখন কী?
শামসুদ্দিন চোখ মেললেন। ধ্বক করে কিছু হলুদ আলো চিড়বিড়িয়ে চোখের ভেতর দিয়ে মগজে ঢুকে গেল। রফিক বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে খাটে বসতে বসতে বলল–কাল রাতে আপনাকে দেখে ভয়ই পেয়েছিলাম। চোখ টকটকে লাল। জরে গা পুড়ে যাচ্ছে। ক্রমাগত ঘঁচি দিয়ে যাচ্ছেন। হাঁচির চোটে নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। আপনার অবস্থা দেখে রাহেলা শুরু করল কান্না। এখন আছেন কেমন?
