মামা হঠাৎ করে তার মাইক্রোবাসে ব্রেক করল তারপর গাড়ি পিছিয়ে আনতে লাগল। যেখানে গাড়িটা কাত হয়ে পড়ে আছে সেখানে মাইক্রোবাসটা থামালো। মামা তার স্টার্ট বন্ধ করে নেমে আসে, আমিও মামার পিছু পিছু নেমে এলাম। মামা ভীড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে গেল, আমিও ঢুকে গেলাম। একজন মানুষ গাছে হেলান দিয়ে বসে আছে, তার মাথার কোথায় জানি কেটে গেছে, হাত দিয়ে সেখানে ধরে রক্ত থামানোর চেষ্টা করছে। মানুষটার পাশে একজন মহিলা, মহিলার চোখে মুখে আতংক, রক্ত বন্ধ করার জন্য কিছু একটা করার চেষ্টা করছে। মিঠুনের বয়সী একটা বাচ্চা তার মাকে ধরে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে। মাঝবয়সী একজন মানুষ মনে হয় গাড়ির ড্রাইভার, ছোটাছুটি করছে, কী করবে বুঝতে পারছে না। তাদের সামনে বেশ কিছু মানুষ, কয়েকজন ছোট বাচ্চাও আছে। সবাই মিলে পুরো দৃশ্যটা দেখছে কিন্তু কেউ কাছে যাচ্ছে না।
মামা কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে গাছে হেলান দেওয়া মানুষটা এবং তার পাশের মহিলার কাছে এগিয়ে গেল, হাটু গেড়ে বসে জিজ্ঞেস করল, “কী অবস্থা?” কতক্ষণ আগে হয়েছে?”
মানুষটা কোনো কথা বলল না, কেমন যেন শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মহিলাটা হাহাকারের মতো শব্দ করে বলল, “পাঁচ দশ মিনিট হয়েছে, ট্রাকটা থামে নাই, পালিয়ে গেছে।”
আমরা বুঝতে পারলাম একটা ট্রাক ধাক্কা মেয়ে পালিয়ে গেছে। পত্রিকায় এরকম ভয়ংকর খবর পড়ি, আজকে নিজের চোখে দেখছি।
মহিলাটা থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “হাসপাতালে নিতে হবে। হাসপাতালে
“মামা বলল, জ্বি, বুঝতে পারছি। নার্ভাস হবেন না। আমি ব্যবস্থা করছি।”
এতক্ষণ সবাই দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল, কেউ কিছু করছিল না। মামা প্রথম তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে। মহিলাটা এতোক্ষণ কাঁদেনি এবারে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। মাকে কাঁদতে দেখে বাচ্চাটা আরো জোরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। ব্যথায় না ভয়ে বুঝতে পারলাম না।
মামা বলল, “নার্ভাস হবেন না ম্যাডাম। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। আপনার কী অবস্থা? হাঁটতে পারবেন?”
মহিলা কান্না থামানোর চেষ্টা করে বলল, “পারব। তারপর উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে পড়ে যাচ্ছিল আমি দৌড়ে ধরে ফেললাম। মহিলা আমাকে ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে, আমি টের পেলাম মহিলার হাতে চটচটে রক্ত, আমার কাপড়ে লেগে যাচ্ছে। লাগুক।
মামা পকেট থেকে চাবিটা বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, “টোপন। মাইক্রোবাসটার পিছনটা খুলে মেঝেতে তোর বিছানাটা বিছিয়ে ফেল। কুইক।”
আমি বললাম, “ঠিক আছে।”
মামা মহিলাকে ধরলেন, আমি চাবিটা নিয়ে মাইক্রোবাসের দিকে ছুটে গেলাম। আমার পিছু পিছু বেশ কিছু মানুষ মজা দেখার জন্য ছুটে এলো। মাইক্রোবাসের দরজা খুলতেই ভেতরে বিচিত্র সব যন্ত্রপাতি দেখে সবাই বিস্ময়ের শব্দ করে। তারা আরো কাছে গিয়ে দেখতে চায়, যাদের উৎসাহ বেশি তারা হাত ঢুকিয়ে ছুঁয়ে দেখতে চেষ্টা করল।
আমি হুংকার দিয়ে শক্ত গলায় বললাম, “খবরদার। কেউ ভিতরে হাত দিবে না। খবরদার।”
আমার হুংকারে কাজ হলো। সবাই দুই পা সরে গেল। আমি আমার বিছানা খুলে মাইক্রোবাসের নিচে বিছিয়ে দিলাম। মাথার কাছে বালিশ রেখে চাদর দিয়ে ঢেকে আমি অপেক্ষা করতে থাকি।
একটু পরে দেখতে পেলাম মামা আর ড্রাইভার মিলে আহত মানুষটাকে ধরে ধরে নিয়ে আসছে। মাইক্রোবাসের ভিতরে তাকে শুইয়ে দিয়ে মামা আমাকে বলল, “টোপন। তুই এখানে থাক।”
একজন আহত মানুষ, মাথা থেকে দরদর করে রক্ত পড়ছে। তার সাথে থাকতে আমার ভয় করছিল কিন্তু সেটা তো আর বলতে পারি না তাই মাথা নেড়ে বললাম, “ঠিক আছে মামা।”
মহিলা নিজেই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে এসেছে, মামা তাকে বলল, “আপনি আপনার ছেলেকে নিয়ে সামনে বসেন।”
“আর জাহিদ? জাহিদ?” বুঝতে পারলাম আহত মানুষটার নাম জাহিদ।
“টোপন দেখবে। টোপন অনেক রেসপন্সিবল। চিন্তা করবেন না।”
মামা আমাকে ‘রেসপন্সিবল’ বলছে কাজেই আমাকে এখন দায়িত্ব নিতেই হবে। আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, “আপনি চিন্তা করবেন না, আমি দেখে রাখব।”
মহিলা কাঁপা গলায় বলল, “অনেক ব্লিডিং হচ্ছে।”
“এক্ষুণি হাসপাতালে নিব। আমি একটা হাসপাতাল দেখে এসেছি। বেশ বড় মনে হলো। তবু একবার জিজ্ঞেস করে নিব। আপনি ওঠেন।”
ভদ্রমহিলা ছেলেকে নিয়ে সামনের সিটে বসলেন। বাচ্চাটা এখন কান্না বন্ধ করেছে। মাঝে মাঝে একটু পরে পরে শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছে। মামা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে জিজ্ঞেস করল, “এখানে কাছাকাছি হাসপাতাল কোথায়?”
কোন হাসপাতাল কাছে, কোনটা দূরে, কোনটা ভালো কোনটা খারাপ কোথায় টাকা বেশি লাগে কোথায় কম লাগে সেটা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেল। তখন একজন মাতবর টাইপের মানুষ মামাকে বলল, “আপনি কাজটা ঠিক করলেন না।”
মামা অবাক হয়ে বলল, “কোন কাজটা ঠিক করলাম না?”
“এই যে এসকিডেন্টের রোগী টানাটানি করতেছেন।” মানুষটা এক্সিডেন্ট বলতে পারে না, বলেছে এসকিডেন্ট!
“কী হয় এসকিডেন্টের রোগী টানাটানি করলে?” মামাও এক্সিডেন্ট না বলে বলছে এসকিডেন্ট, মাতবর অবশ্য এই ঠাট্টাটা বুঝতে পারল না।
“পুলিশের ঝামেলায় পড়বেন। পুলিশ আপনারে নিয়া টানাটানি করবে। আপনার জান শ্যাষ হইয়া যাইব।”
