“তাই নাকি?”
মাতবর টাইপের মানুষটা বলল, “আর রোগী যদি মরে তাইলে আপনি মার্ডার কেইসের আসামী। হয় ফাঁসি নাহলে চৌদ্দ বছর জেল।”
মামা মাথা নাড়ল, বলল, “দোয়া করি আপনি একদিন একসিডেন্টে রাস্তার সাইডে হাত পা ভেঙে পড়ে থাকেন। মাথা ফেটে একটু ঘিলু বের হয়ে থাকে। তখন একজন যখন আপনারে হাসপাতালে নিতে আসবে তখন যেন অন্য মানুষেরা আপনারে হাসপাতালে নিতে না দেয়। আপনি রাস্তার সাইডে যেন পড়ে থাকেন। কেউ যেন আপনাকে সাহায্য করতে না আসে।”
মাতবর টাইপের মানুষটা কেমন যেন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। বলল, “এইটা আপনি কী বলেন?”
“সত্যি কথা বলি।”
মামা আর কোনো কথা না বলে ড্রাইভিং সিটে বসে মাইক্রোবাসটা ঘুরিয়ে উল্টো দিকে যেতে শুরু করল।
আমি হাঁটু গেড়ে বসে থাকি। মানুষটার মাথার রক্ত বন্ধ হচ্ছে না। হাতের ফাঁক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে বের হচ্ছে। আমি আমার ব্যাকপেক থেকে আমার একটা টিশার্ট বের করে সেটা দিয়ে মানুষটার মাথায় চেপে ধরলাম। মানুষটা আমার দিকে তাকিয়ে দুর্বলভাবে হাসার চেষ্টা করল, তারপর শোনা যায় না এরকম গলায় বলল, “থ্যাংক ইউ।”
আমিও একটু হাসার চেষ্টা করলাম, বললাম, “আপনি চিন্তা করবেন না। মামা আপনাকে এক্ষুণি হাসপাতালে নিয়ে যাবে।”
মানুষটা বলল, “আমি আর চিন্তা করছি না। মানুষের যেরকম বিপদ আসে সেরকম বিপদের সময় সাহায্যও আসে। তোমরা যেরকম এসেছ।”
এরকম একটা জ্ঞানের কথা শোনার পর ঠিক কী বলতে হবে বুঝতে পারলাম না। তাই মুখটা একটু হাসি হাসি করে রাখার চেষ্টা করে বসে রইলাম।
কিছুক্ষণের মাঝেই আমরা হাসপাতালে পৌঁছে গেলাম। মামা দরজা খুলে নেমে প্রায় দৌড়ে হাসপাতালের ভিতরে ঢুকে গেল। কয়েক মিনিট পরে কয়েকজন মানুষ একটা ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে চলে এলো, সাথে একটা হুইল চেয়ার মাইক্রোবাসের দরজা খুলে আহত মানুষটাকে ধরাধরি করে ট্রলিতে শোয়ানো হলো। মহিলা হুইল চেয়ারে বসলেন, বাচ্চাটা তার কোলে বসে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বসে রইল। এতোক্ষণ চুপচাপ ছিল এখন আবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেছে।
একজন আমাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি যাবা না?”
আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, “আমার কিছু হয় নাই।”
“তোমার কাপড়ে এত রক্ত?”
“আমার রক্ত না।”
আরেকজন জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছিল?”
“আমি জানি না। এরা রাস্তার পাশে পড়েছিল আমরা তুলে হাসপাতালে এনেছি।”
মানুষটা শুনে মাথা বাঁকা করে মুখটাতে কেমন একটা ভঙ্গী করল। সেই ভঙ্গী থেকে কাজটা ভালো হয়েছে না খারাপ হয়েছে বুঝতে পারলাম না।
কিছুক্ষণ পর মামা ছোট বাচ্চাটার হাত ধরে বের হয়ে এলো। আমার কাছে এসে বাচ্চাটাকে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “টোপন তুই লিটনকে দেখে রাখ কিছুক্ষণ। আমি ইমার্জেন্সিতে আছি।”
“কী অবস্থা মামা?”
“ভালো। মনে হচ্ছে সিরিয়াস কিছু না। এক্সরে করছে।”
“ঠিক আছে।”
মামা পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “নে, তোরা কিছু খেয়ে নে।”
আমি বললাম, “আমার কাছে টাকা আছে।”
“থাকুক। রাখ তোর কাছে।”
আমি টাকাগুলো নিয়ে পকেটে রাখলাম। মামা যেভাবে এসেছিল আবার সেভাবে হাসপাতালের ভিতর ঢুকে গেল।
আমি এবারে ছেলেটার দিকে তাকালাম, একটু আগে যেরকম ভয় পেয়েছিল এখন তার আর সেরকম লাগছে না। একটু সামলে নিয়েছে। ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার নাম লিটন?”
ছেলেটা মাথা নাড়ল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কী অনেক ভয় পেয়েছিলে?”
ছেলেটা আবার মাথা নাড়ল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ব্যথা পেয়েছিলে?”
ছেলেটা মাথা নাড়ল। তারপর হঠাৎ মাথা তুলে জিজ্ঞেস করল, “আমার আব্বু কী এখন মরে যাবে?”
আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, “না, মোটেও না।”
“তাহলে আম্মু?”
“না, তোমার আম্মুর তো কিছুই হয়নি। কেন শুধু শুধু মরে যাবে?”
ছেলেটা গম্ভীর মুখে বলল, “মানুষ যখন মরে যায় তখন তাকে হাসপাতালে নেয়। আমার নানুকে নিয়েছিল। আমি জানি।”
আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, “না। মানুষের যখন অসুখ হয় নাহলে একসিডেন্ট হয় তখন তাকে হাসপাতালে নেয়। আমার যখন ডেঙ্গু হয়েছিল তখন আমাকে হাসপাতালে নিয়েছিল। আমি কী মরে গেছি? আমি মরি নাই। বিশ্বাস না হলে আমাকে ছুঁয়ে দেখ।”
লিটনের কী মনে হলো কে জানে। সে সত্যি আমাকে ছুঁয়ে দেখল। তারপর মাথা নাড়ল। আমি বললাম, “তোমার খিদে পেয়েছে? কী খাবে বল।”
“আমি কিছু খাব না।”
“কিন্তু আমি তো খাব। তুমিও খাবে আমার সাথে।”
“তুমি কী খাবে?”
“দেখি কী পাওয়া যায়। আস আমার সাথে।”
আমি লিটনের হাত ধরে নিয়ে গেলাম, একটা দোকান থেকে একটা বিস্কুটের প্যাকেট, দুইটা চিপসের প্যাকেট আর দুইটা কোল্ড ড্রিংকের বোতল কিনে আমরা আবার হাসপাতালের সামনে ফিরে এলাম। তারপর হাসপাতালের বারান্দায় বসে খেতে লাগলাম।
খেতে খেতে লিটন হঠাৎ করে বলল, “ভুম করে শব্দ হয়েছিল।”
“কখন ভুম করে শব্দ হয়েছিল?”
“যখন একসিডেন্ট হয়েছিল।”
“তখন তুমি কী করেছিলে?”
“আমি ভেবেছি আমরা সবাই মরে গেছি।”
“মরে গেছ?”
“হ্যাঁ। সবাই মরে গেছি।”
“তারপর?”
“তারপর ভেবেছি শুধু আব্বু আর আম্মু মরে গেছে।”
“আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, “আসলে কেউ মরে নাই।”
লিটন কিছু বলল না। চুক চুক করে কোল্ড ড্রিংক খেতে থাকল। একটু পর জিজ্ঞেস করল, “এখন আব্বু আর আম্মুকে কী করবে?”
