আমি শুকনা রুটি আর বিদঘুঁটে সিদ্ধ ডিম খেয়ে কোনোমতে পেট ভরিয়ে মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, “মামা, আমি এখন কিছু করব?”
“না। তোর এখন কিছু করতে হবে না। যখন করতে হয় বলব।”
“তাহলে কী করব?”
“জায়গাটা ঘুরে দেখতে পারিস। হারিয়ে যাবি না তো?”
“না মামা। এই জঙ্গলে বাঘ ভালুক আছে?”
“থাকার কথা না। থাকলেও তোকে খাবে না। তোর ভয় নাই।”
“আমাকে খাবে না কেন মামা?”
“তুই এতো রোগা পটকা। তোকে খেয়ে পোষাবে না।”
আমি তখন আমার পিঠে ব্যাকপেকটা ঝুলিয়ে ঘুরতে বের হলাম। ব্যাকপেকের ভিতর রাখলাম কিছু জামা কাপড়, একটা গল্প বই, কাগজ কলম আর অস্ত্র হিসেবে একটা পেন্সিল কাটার চাকু।
একটু হাঁটতেই আমি জংলা জায়গাটা থেকে বের হয়ে এলাম। সামনে উঁচু নিচু মাঠ, অনেক দূরে পানি চিক চিক করছে। সূর্যটা বেশ মাথার উপর, রোদটা ভালোই লাগছে। আমি আশপাশে দেখতে দেখতে পানির দিকে এগুতে লাগলাম। চারপাশে নির্জন। এর আগে আমি এরকম নির্জন জায়গা খুব বেশি দেখি নাই। নির্জন জায়গার মনে হয় এক ধরনের ভাব আছে, এখানে অন্য রকম লাগে। আমাকে কেউ দেখছে না তাই আমি যা খুশি তাই করতে পারি। ইচ্ছা করলে খালি গা হয়ে শার্টটা খুলে মাথায় বাঁধতে পারি। তাহলে রোদটাও কম লাগবে। আমি অবশ্য উল্টাপাল্টা কিছু না করে সামনের দিকে হাঁটতে থাকি। মাঝে মাঝে ঝোঁপ ঝাড় আছে। একটা ঝোঁপ থেকে মনে হলো একটা শেয়াল বের হয়ে খুব সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আরেকটা ঝোপে অদৃশ্য হয়ে গেল। একটা ছোট মতো জলা জায়গাও আছে সেখানে পৌঁছাতেই চারিদিক থেকে অনেকগুলো ব্যাঙ এক সাথে পানিতে লাফ দিল! আমি রীতিমতো চমকে উঠলাম। ব্যাঙরা যে এক সাথে লাফ দেয় আমি সেটাও জানতাম না। নানারকম পাখি দেখতে পেলাম, আমি অবশ্য কোনো পাখিকেই চিনি না। কিছু পাখি একেবারে লতাপাতার সাথে মিশে থাকে, দূর থেকে বোঝাই যায় না একেবারে কাছে গেলে ডানা ঝাঁপটিয়ে উড়ে যায়।
হেঁটে হেঁটে পানির কাছে পৌঁছানোর পর বুঝতে পারলাম জায়গাটা যেরকম পুরোপুরি নির্জন ভেবেছিলাম এটা সেরকম না। একটা ছোট নদী, পানিটা বেশ নিচুতে সেখানে বেশ কিছু নৌকা, একটা নৌকাতে একজন ছোটখাটো মানুষও আছে।
আমি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে নৌকাটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। নৌকার মাঝি নৌকা থেকে নেমে পানিতে অদৃশ্য হয়ে গেল, একটু পরে ভুস করে ভেসে উঠল, তার হাতে একটা খাঁচার মতো কী যেন। সে খাঁচাটাকে নৌকার উপর রেখে তার ভেতর থেকে চকচকে মাছ বের করে একটা ঝুপড়ির মাঝে রাখে, তারপর আবার খাঁচাটা নিয়ে পানির নিচে অদৃশ্য হয়ে যায়। বেশ অনেকক্ষণ পর সে পানি থেকে ভেসে উঠে। একজন মানুষ যে নিঃশ্বাস না নিয়ে এতক্ষণ পানির নিচে থাকতে পারে আমি সেটাও জানতাম না।
মানুষটা যখন আবার তার নৌকায় উঠে একটা লগি দিয়ে ঠেলে নৌকাটা সামনে আনতে থাকে তখন আমি বুঝতে পারলাম যে মানুষটা আসলে আমার বয়সী একটা ছেলে! খালি গা, একটা লুঙ্গী মালকোচা মেরে পড়েছে। মাথায় একটা লাল গামছা, প্রত্যেকবার পানি থেকে উঠে গামছা দিয়ে শরীর মুছে নিচ্ছে।
নির্জন জায়গায় নদীর তীরে এসে মানুষের মনে নানারকম ভাব আসে। আমার ভিতরেও একটা গভীর ভাব এসে গেল। মনে হলো আহা, এই ছেলেটা আমার বয়সী কিন্তু আমি ভালো জামা কাপড় পরে স্কুলে লেখাপড়া করি কিন্তু এই ছেলেটাকে জীবন বাঁচানোর জন্য মাছ ধরতে হয়, পানিতে ডুবতে হয়। নিশ্চয়ই স্কুলে পড়ে না– আমার মতো সুযোগ পায় না। গভীর ভাবের কারণে আমি বড় মানুষের মতো একটা বিশাল দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
ছেলেটা আমার কাছাকাছি এসে তার নৌকাটা থামাল, লগিটা পুতে নৌকাটাকে বেঁধে আবার পানিতে ডুবে গেল। আমি যখন প্রায় নিঃসন্দেহ হয়ে গেছি যে ছেলেটা আর ভেসে উঠবে না তখন সে আবার একটা মাছ ধরার খাঁচা নিয়ে ভুল করে ভেসে উঠল। ভেতরে অনেক মাছ কিলবিল করছে। ভালো করে দেখার জন্য আমি আরেকটু এগিয়ে গেলাম। ছেলেটা পিছন দিকটা খুলে হাত ঢুকিয়ে যখন মাছ বের করছে তখন আমি হঠাৎ করে দেখলাম ভিতরে একটা সাপ কিলবিল করছে। আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম, “সাপ! সাপ!”
ছেলেটা একটুও ভয় পেল না, আমার দিকে তাকিয়ে হাসল তারপর সাপটাকে খপ করে ধরে বের করে এনে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এইটা সাপ না! এটা বাইম মাছ।”
“মাছ? এইটা মাছ?” আমি একটু অপ্রস্তুত হলাম, বললাম, “দেখতে একেবারে সাপের মতো।”
মাছটাকে ঝুড়ির ভেতর রাখতে রাখতে বলল, “সাপ আরো লম্বা হয়।”
ছেলেটা কিছু মাছ ঝুড়িতে রাখল, কিছু ছেড়ে দিল তারপর আবার পানিতে ডুবে গেল। এবারে আমি ভয় পেলাম না, আমি বুঝে গেছি এই ছেলে পানিতে অনেক সময় ডুবতে পারে। পানি থেকে বের হয়ে গামছা দিয়ে শরীর মুছতে মুছতে ছেলেটা আমার দিকে তাকালো, বলল, “তুমি কোথায় থাকো?”
আমি কোথায় থাকি বললে কী ছেলেটা সেটা চিনবে? তাই সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলল, “ঐ তো। অনেক দূর।”
ছেলেটা গামছাটা মাথায় বাঁধতে বাঁধতে বলল, “বলতে চাও না?” অনেক দূর মানে কত দূর? কোপেনহেগেন নাকি নিউইয়র্ক?”
আমি খাবি খেলাম। ছেলেটা আমাকে নিয়ে কী সহজে ঠাট্টা করল। দিল্লি নাকি দুবাই না বলে কোপেনহেগেন আর নিউইয়র্ক বলেছে। কোপেন হেগেনের নাম শুনেছি কিন্তু শহরটা কোথায় আমি নিজেও জানি না। আমি আমতা আমতা করে বললাম, “আমি এতদূর বলি নাই। মিরপুর। ঢাকা।”
