“হ্যাঁ। হ্যাঁ। ঐ মানুষটা কী সত্যি সত্যি বলছিল?”
মামা হা হা করে জোরে জোরে হাসল, বলল, “হতে পারে সত্যি বলেছিল, কেন? তোর ভয় লাগছে?”
“না না ভয় লাগবে কেন?”
“তোর ভয়ের কিছু নাই, আমরা যাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছি সে পুলিশের একজন এস পি! এখন গিয়ে দেখ, হাসপাতালে পুলিশ গিজ গিজ করছে।”
মামা পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে আমার হাতে দিল, বলল, “এই যে আমাকে তার কার্ড দিয়েছে। তোর কাছে রাখ, হারিয়ে ফেলিস না। ফোন করে খোঁজ নিতে হবে।”
আমি কার্ডটা হাতে নিলাম, মামা আসলেই দরকারি কাজে আমাকে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। কার্ডটা আমার ডাইরিতে লাগিয়ে রাখতে হবে। আমার একটা ডাইরি আছে, সব সময় ভাবি প্রত্যেক রাতে ডাইরিতে সারাদিন কী হয়েছে সেটা লিখে রাখব। লেখা হয় না। আজ রাতে অবশ্যই সবকিছু লিখতে হবে, বাড়িয়ে চাড়িয়েই লিখব! অনেক কিছু লেখার আছে।
আমার ডাইরি পড়লে যে কেউ ভয় পেয়ে যাবে, কিন্তু কেউ পড়ার সাহস পাবে না। কারণ ডাইরির প্রথম পৃষ্ঠায় বড় বড় করে লেখা আছে :
“নিম্ন স্বাক্ষরকারীর অনুমতি ছাড়া এই ডাইরি পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদি কেউ পড়িবার চেষ্টা করে তাহলে তাহার উপর অভিশাপ বর্ষিত হইবে। সেই অভিশাপ অত্যন্ত জ্বালাময়ী এবং তাহার কারণে যে পড়িবে তাহার হাত পা ভাঙ্গিয়া লুলা হইয়া যাইবে এবং শরীরের মাংস পচিয়া পচিয়া খসিয়া পড়িবে এবং পোকা কৃমি কিলবিল কিলবিল করিয়ে এবং চিরদিনের জন্য নরকবাসী হইবে।”
আমি অনেক চেষ্টা করে এটাকে সাধু ভাষায় লিখেছি, সাধু ভাষায় লিখলে পুরো জিনিসটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
০৪. সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে
০৪.
পরের দিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে রওনা দিয়ে দুপুর বেলা আমরা আমাদের জায়গায় পৌঁছে গেলাম। প্রথমে পাকা রাস্তা, তারপর ইটের রাস্তা তারপর কাঁচা রাস্তা, তারপর কোনো রাস্তাই নাই। সেই খানাখন্দ জঙ্গলের মাঝে মামা ঘটর ঘটর করে তার গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত একটা জংলা জায়গায় মামা তার মাইক্রোবাস থামিয়ে বলল, “আগামী কয়েকদিন এইটা আমাদের আস্তানা।”
মামা মাইক্রোবাস থেকে নেমে এদিক সেদিক তাকিয়ে বলল, “জায়গাটা কী সুন্দর দেখেছিস?”
এটা হচ্ছে বড় মানুষদের সমস্যা। দুই চারটা গাছপালা কিংবা একটা নদী কিংবা কয়েকটা গরু ছাগল দেখলেই তারা আহা উঁহু করতে থাকে, বলতে থাকে, কী সুন্দর! কী সুন্দর!
মামাকে খুশি করার জন্য আমিও বললাম, “হ্যাঁ মামা, খুব সুন্দর জায়গা।”
“এখানে নদী আছে, হাওড় আছে, জঙ্গল আছে এবং পাহাড় আছে। একসাথে কখনো এতোগুলো জিনিস পাওয়া যায় না।”
আমি মনে মনে বললাম, “নিশ্চয়ই মশাও আছে এবং জোকও আছে। জোরে জোরে বললাম, “এখন আমরা কী করব মামা?”
“প্রথমে লাঞ্চ করব তারপর কাজ শুরু করে দেব।”
ঠিক কী কারণ জানা নাই মামার সাথে রওনা দেওয়ার পর থেকে আমার খিদে বেড়ে গেছে। কী খাওয়া হবে সেটা নিয়ে এখন আমার অনেক আগ্রহ। জিজ্ঞেস করলাম, “কী লাঞ্চ করব মামা?”
“তোর মা কিছু রান্না করে দিয়েছিল। সেগুলো নিশ্চয়ই পচে গিয়েছে।”
“তাহলে?”
“পাউরুটি আছে।”
আমি শুকনো মুখে বললাম, “আর?”
“আর আরো পাউরুটি।” আমার মুখ দেখে মনে হলো মামার একটু মায়া হলো, বলল, “সাথে একটা ডিম সিদ্ধ করে নিতে পারিস।”
“ডিম?”
“হ্যাঁ।”
“কীভাবে সিদ্ধ করব?”
“মাইক্রোওয়েভ ওভেনে।”
মামা কোথা থেকে একটা পাউরুটির প্যাকেট বের করে সেখান থেকে এক স্লাইস রুটি নিয়ে মহানন্দে চাবাতে চাবাতে তার যন্ত্রপাতি টানাটানি করতে লাগল। আমিও এক স্লাইস রুটি চাবানোর চেষ্টা করলাম, চিবিয়ে নরম করার পরও সেটা গলা দিয়ে নামতে চায় না। কারণটা কী কে জানে?
মামা কাজ করতে করতে কোথা থেকে জানি একটা ডিম বের করে দিল। আমি সেটা মাইক্রোওয়েভ ওভেনে ঢুকিয়ে ওভেনটা চালু করে দিলাম। মামা কেমন জানি মুচকি হাসি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে এক দুই তিন করে গুণতে শুরু করল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী গুণছ মামা?”
“দেখি কতোক্ষণ গুণতে হয়।”
“কতোক্ষণ কী গুণতে হয়?”
“তুই নিজেই দেখবি।”
পঁয়তাল্লিশ পর্যন্ত গুণার পর মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ভিতর বোমা ফাটার মতো একটা প্রচণ্ড শব্দ হলো। মামা গোণা বন্ধ করে মাইক্রোওয়েভ ওভেনের দরজা খুলে বলল, “এই যে তোর সিদ্ধ ডিম। পুরা মাইক্রোওয়েভে লেপটে গেছে। খিমচে খিমচে খেয়ে নে।” তারপর আনন্দে হা হা করে হাসতে লাগল।
আমি বললাম, “তুমি জানতে ডিমটা বাস্ট করবে?”
“না জানার কী আছে? সবাই জানে।”
“তাহলে আমাকে না করলে না কেন?”
“না করলে কী এই মজাটা হতো?” মামা আমাকে এক টুকরা কাপড় দিয়ে বলল, “নে ওভেনটা পরিষ্কার কর। তা না হলে পচা গন্ধ বের হবে।”
আমাকে ঘষে ঘষে পুরো ওভেনটা পরিষ্কার করতে হলো। মামা তখন আরেকটা ডিম দিয়ে বলল, “নে, এইটা ঠিক করে সিদ্ধ কর।”
“ঠিক করে কীভাবে সিদ্ধ করব?”
“ভেঙে একটা পিরিচে রাখ, কুসুমটা গেলে দে। ইচ্ছা হলে একটা কাপের পানিতে ডিমটা ভেঙে কুসুমটা গেলে দিতে পারিস। যেভাবে ইচ্ছা।”
আমি একটা কাপে পানি রেখে ডিমটা ভেঙে সেখানে দিলাম, তারপর ভয়ে ভয়ে মাইক্রোওয়েভ ওভেন চালু করলাম।
এবারে ওভেনের ভেতর বিকট কোনো শব্দ হলো না। এক মিনিট পরে ওভেন খুলে দেখলাম কাপের ভিতর একটা এবড়োথেবড়ো সিদ্ধ ডিম। দেখে মনে হয় অক্টোপাসের বাচ্চা। দেখতে বিদঘুঁটে হলেও ডিমটা খেতে ঠিক সিদ্ধ ডিমের মতো!
