বলুন, শুনছি।
ফখরুদিন সাহেবের বাড়িতে একবার যাবেন।
কেন?
ওনার মেয়ে টেলিফোনে আপনাকে চাচ্ছিল।
বলেন কী! কী-রকম গলায় চাইল?
কী-রকম গলায় মানে! প্রেম-প্ৰেম গলা, না। রাগ-রাগ গলা?
বি. করিম সাহেব তার উত্তর দিলেন না। টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন। রাগে তাঁর গা জ্বলে যাচ্ছে। ফিরোজ হৃষ্টচিত্তে খেতে বসল। প্রচুর আয়োজন। টেবিলের দিকে তাকাতেই মন ভরে যায়।
সিরিয়াস এক বড়লোকের মেয়ের সঙ্গে প্রেম হয়ে গেছে, বুঝলে আপা। একেবারে লদকালদকি প্ৰেম।
তাজিন কিছু বলল না। একটা বিশাল আকৃতির সরপুঁটি ভাজা ফিরোজের পাতে তুলে দিল।
ঐ মেয়ে আমার খোঁজ দিনে চার বার পাঁচ বার করে অফিসে টেলিফোন করছে। বি. করিম সাহেবের কান ঝালাপালা।
সত্যি-সত্যি বলছিস?
এই যে মাছ হাতে নিয়ে বলছি। বাঙালির ছেলে মাছ হাতে মিথ্যা কথা বলে না।
মেয়েটার নাম কি?
অপালা। বিয়ের পর অপা করে ডাকব। অপালা শব্দটার মানে কী, জানিস নাকি?
জানি না। মেয়েটাকে ছবিতে যে-রকম দেখাচ্ছে আসলেও কি সে-রকম সুন্দর?
ফিরোজ ভাত মাখতে-মাখতে বলল, তুই একটা মিসটেক করে ফেললি রে আপা। ছবির মেয়ে আর ঐ মেয়ে দুই ভিন্ন ব্যক্তিত্ব। তুই গুবলেট করে ফেলেছিস।
তাজিন রাগ করতে গিয়েও বলতে পারল না। তাদের পাঁচ বোনের পর এই এক ভাই। আদরে-আদরেই ওর মাথা নষ্ট হয়েছে। জীবনে কিছুই করল না। কোনো দিন যে করতে পারবে তাও মনে হচ্ছে না।
ফিরোজ।
বল।
সবটাই কি তোর কাছে একটা খেলা।
খেলা হবে কেন?
তাজিন আর কিছু বলল না। ফিরোজের খাওয়া দেখতে লাগল। কেমন মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে
খাচ্ছে। গালভর্তি দাড়ি। হঠাৎ দাড়ি রাখার সখ হল কি জন্যে কে বলবে? তার হাসি আসে না, রাগ
ধরে যায়। চড় মারতে ইচ্ছে করে।
দাড়িতে আমাকে কেমন লাগছে রে আপা?
ভাল।
রবীন্দ্রনাথ-রবীন্দ্রনাথ ভাব চলে এসেছে না?
তাজিন কিছু বলল না। রবীন্দ্রনাথের মুখের গঠনের সাথে আমার মুখের গঠনের অদ্ভুত মিল আছে। চুল-দাড়িগুলি আরেকটু লম্বা হোক, দেখবি।
তখন কী করবি? একটা আলখাল্লা কিনবি?
এটা মন্দ বলিসনি আপা। একটা আলখাল্লা কিনলে হয়। রেডিমেড বোধহয় পাওয়া যায় না।
অর্ডার দিয়ে বানাতে হবে। তারপর সেই আলখাল্লা পরে বাংলা একাডেমির কোনো অনুষ্ঠানে গিয়ে সবাইকে ভড়কে দেব। চারদিকে ফিসফাস শুরু হবে গুরুদেব এসে গেছেন।
চুপ করা দেখি!
সরি, আমার আবার মনেই থাকে না তুই বাংলার ছাত্রী। দে, একটা পান দে; চমনবাহার থাকলে চমনবাহার দিয়ে দেয়।
অপালা যে-বার ক্লাস এইটে বৃত্তি পেল, সে-বার তার বাবা তাকে চমৎকার একটা উপহার দিয়েছিল। লিসবন থেকে কেনা মরক্কো চামড়ায় বাধাই-করা পাঁচশ পাতার বিশাল একটা খাতা। মলাটে একটি স্প্যানিস নর্তকীর ছবি। চামড়ায় এত সুন্দর ছবি কী করে আঁকা হল কে জানে! দেখলে মনে হয় মেয়েটি চামড়া ফাঁড়ে বের হয়ে এসে নাচা শুরু করবে।
ভেতরের পাতাগুলির রঙ মাখনের মতো। কী মসৃণ! প্রতিটি পাতায় অপূর্ব সব জলছাপ। গাছপালা, নদী আকাশের মেঘ।
ফখরুদ্দিন সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, উপহারটি মনে হয়। খুব পছন্দ হয়েছে?
আনন্দে অপালার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। সে নিজেকে সামলে গাঢ় গলায় বলল, হ্যাঁ।
এখন থেকে এই খাতায় গল্প, কবিতা, নাটক–এইসব লিখবে।
এইসব তো আমি লিখতে পারি না বাবা।
লিখতে-লিখতেই লেখা হয়। চেষ্টা করবে। ঐ সব না পার, জীবনের বিশেষ বিশেষ ঘটনা লিখে রাখবে। এই যে তুমি বৃত্তি পেলে, এটা তো বেশ একটা বড় ঘটনা। সুন্দর করে এটা লিখবে। তারপর তোমার যখন অনেক বয়স হয়ে যাবে, চুল হবে সাদা, চোখে ছানি পড়বে তখন ঐ খাতাটা বের করে পড়বে, দেখবে কত ভাল লাগে।
আমি কোনোদিন বুড়ো হব না বাবা।
তাই বুঝি?
ফখরুদিন সাহেব ঘর কাঁপিয়ে অনেক্ষণ ধরে হাসলেন। চমৎকার সেই খাতায় প্রথম এক বছর অপালা কিছুই লিখল না। তার অনেক বার লিখতে ইচ্ছে করল, কলম দিয়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুন্দর পাতাগুলি নষ্ট করতে ইচ্ছে করল না। সে খাতা খুলে রেখে মনে মনে পাতার পর পাতা লিখে যেতে লাগল। অনেক লেখা পছন্দ হল না, সেগুলি মনে-মনেই কেটে নতুন করে লিখল।
ক্লাস নাইনে হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষার শেষ দিনে সে প্রথম বারের মত লিখল। সাধু ভাষায় লেখা সেই অংশটিই এই–
আজ আমার পরীক্ষা শেষ হইয়াছে। আমার মনে কোনো আনন্দ হইতেছে না। পরীক্ষা বেশ ভাল হইয়াছে। তবে কেন আমার আনন্দ হইতেছে না? আমি সঠিক জানি না। মাঝে-মাঝে খুব আনন্দের সময় আমার দুঃখ লাগে। আমি কাদিয়া ফেলি। গত বছর আমরা নেপালের পোখরা নামক একটি স্থানে গিয়েছিলাম। চারিদিকে বিশাল পাহাড়। কত সুন্দর দৃশ্য! বাবা এবং মার মনে কত আনন্দ হইল। বাবা ক্যামেরা দিয়া একের পর এক ছবি তুলিতে লাগলেন। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই আমার মনে খুব দুঃখ হইল। গলা ভার-ভার হইল। চোখ দিয়া পানি আসিতে লাগল। ভাগ্যিস কেহ দেখিতে পায় নাই।
অপালার খাতাটি ক্রমে ভরে উঠতে লাগল। ক্লাস টেনে উঠে প্রথম গল্প লিখল। বয়সের সঙ্গে তার গল্পটি মিশ খায় না। গল্পের নাম রাজ-নর্তকী। গল্পের বিষয়বস্তু পনের বছরের মেয়ের কলমে ঠিক আসার কথা নয়। শুরুটা এ-রকম :
রাজ-নর্তকী
মহিমগড়ের রাজপ্রসাদে থাকে এক নর্তকী। রাজসভাতে গান করে, নাচে। তার নাচ যে-ই দেখে সে-ই মুগ্ধ হয়। সেই রাজসভায় এক’দিন এলেন ভিনদেশী এক কবি। তিনি নর্তকীর নাচ দেখে মুগ্ধ হলেন। তার হাত জোড় করে বললেন, দেবী, আমি কি আপনার নাম জানতে পারি?
