ফিরোজ হাঁটছে ফুর্তির ভঙ্গিতে। কোনো কাজকর্ম নেই, চিন্তা করতেই ভাল লাগছে। যদিও উল্টোটাই হওয়া উচিত ছিল। তার ফুর্তির মূল কারণ হচ্ছে পকেট একেবারে ফাঁকা নয়। আটশ ত্রিশ টাকা আছে। এতগুলো টাকা পকেটে নিয়ে শুধু-শুধু দুশ্চিন্তা করার কোনো মানে হয় না। দুশ্চিন্তা মানেই পেপটিক আলসার, ক্ষুধামন্দা, অনিদ্রা। তারচেয়ে হাসিমুখে ঢাকার রাস্তায় হাঁটা অনেক ভাল।
ঢাকার রাস্তাগুলি এখন বেশ সুন্দর। হেঁটে বেড়ানোর জন্যে এবং ভিক্ষা করবার জন্যে আদর্শ। ফুটপাতে ভিক্ষুকরা কী সুন্দর ঘর-সংসার সাজিয়ে ভিক্ষা করছে!
ফিরোজ এই মুহূর্তে কৌতূহলী হয়ে একটি ভিক্ষুক-পরিবারকে দেখছে। এক বুড়ো তার দুপাশে দু’টি ছোট-ছোট বাচ্চাকে নিয়ে ভিক্ষা করছে। তাদের একটু পেছনেই ইটের চুলায় রান্না হচ্ছে। ঘোমটা-দেয়া গৃহস্থ প্যাটার্নের একটি মেয়ে মাটির হাঁড়িতে চাল দিচ্ছে। এই পরিবারটির চোখেমুখে দুঃখ-বেদনার কোনো ছাপ নেই। বরং বুড়োর মুখে একটা প্রশান্তির ভাব আছে। বাচ্চা দু’টি একটু পর-পর দাঁত বের তরে হাসছে। ফিরোজ কী মনে করে একটা চকচকে পাঁচ টাকার নোট বুড়োর থালায় ফেলে দিল। ভিখিরিরা এই জাতীয় ঘটনায় আবেগে উদ্বেলিত হয়। এই বুড়ো নিস্পৃহ ভঙ্গিতে নোটটা নিজের বুক-পকেটে রেখে দিল। খুবই বুদ্ধিমানের কাজ। থালায় একটি নোট থাকলে পয়সাকড়ি পড়বে না। ফিরোজের আফসোসের সীমা রইল না। টাকাটা জলে গেল। দাতা সাজাবার কোনো প্রয়োজন ছিল না। অদূর ভবিষ্যতে তাকে যদি এরকম টিনের থালা নিয়ে বসতে হয় এবং কেউ যদি একটা পাঁচ টাকার নোট ফেলে দেয়, তাহলে সে আনন্দের এমন প্রকাশ দেখাবে যে চারদিকে লোক জমে যাবে। দর্শকদের আনন্দের জন্যে সে বাদার-লাফ দিতেও রাজি আছে।
বাচ্চা দু’টির মধ্যে কী-কারণে যেন মারামারি লেগে গেছে। দু’জনই এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারছে। একজন মনে হচ্ছে খামচিবিশারদ। একেক বার খামচি দিয়ে ছাল চামড়া নিয়ে আসছে। জমাট দৃশ্য। কিন্তু বুড়োর এই দৃশ্যেও কোনো ভাবান্তর হচ্ছে না। সন্ন্যাসীর নির্লিপ্ততা নিয়ে সে বসে আছে, রন্ধনরতা ঘোমটা-দেয়া মেয়েটিও কিছু বলছে না।
ফিরোজের ইচ্ছে করছে একটু দূরে দাঁড়িয়ে এই পরিবারটিকে দেখে-দেখে দুপুরটা কাটিয়ে দেয়। সেটা করা ঠিক হবে না। লোকে অন্য অর্থ করবে। যে মেয়েটি রাঁধছে। তার বয়স অল্প। মুখে লাবণ্য এখনো খানিকটা আছে। এই মেয়ের আশপাশে দীর্ঘ সময় থাকার একটি মানেই হয়। বুড়ো যে পাঁচটি টাকা পেযেও বিরস মুখে বসে রইল। তার মানেও এই। বুড়ো অন্য কিছু ভেবে বসেছে। ফিরোজ মগবাজারের দিকে লম্বা-লম্বা পা ফেলতে লাগল। এখন সে যাবে তাজিনদের বাসায়। তাজিন তার বড় বোন। মবগাজার ওয়ারলেস কলোনিতে থাকে। ফিরোজের যখন টাকা পয়সার টানাটানি হয় তখন দুপুরে এই বাড়িতে খেতে আসে।
কেমন আছিস রে আপা? তোর পুত্র-কন্যারা কোথায? বাসা একেবারে খালি মনে হচ্ছে!
তাজিন মুখ অন্ধকার করে রাখল।
হয়েছে কী? কথা বলছিস না কেন? কৰ্তার সঙ্গে আবার ফাইটিং?
তাজিন থমথমে গলায় বলল, তুই কি একটা মানুষ, না অন্য কিছু?
কেন?
রুমি এত করে বলে দিল তার জন্মদিনে আসাব জন্যে, তুই আসতে পারলি না? মেয়ে কাঁদতে-কাঁদতে অস্থিবি। বাচ্চাগুলি তোকে এত পছন্দ করে, আব্বা তুই এ-রকম করিস? ভালবাসার দাম দিতে হয় না?
খুব কেঁদেছিল?
জিনিসপত্র ফেলে-ছড়িয়ে একাকার করেছে, শেষে তোর দুলাভাইকে পাঠালাম তোর খোঁজে।
আপা, হয়েছে কি জান…আমাদের এক কলিগ…
চুপ কর, আব্বা মিথ্যা কথা বলতে হবে না। ভাত খেতে এসেছিস, খেয়ে বিদায় হ।
আজ তোদের রান্না কী?
তাজিন জবাব না-দিয়ে টেবিলে ভাত বাড়তে লাগল।
তোদের টেলিফোন ঠিক আছে আপা?
আছে।
তুই রেডি কর সব কিছু, আমি টেলিফোন কবে আসছি। দারুণ একটা খবব আছে। আগামী সপ্তাহে বিযে করছি।
এই দারুণ খবরেও তাজিনকে বিচলিত মনে হল না।
বিশ্বাস হচ্ছে না? এই নে, মেয়ে্র ছবি দেখা। কি, এখন বিশ্বাস হচ্ছে?
ফিরোজ টেলিফোন করতে গেল। বি কবিম সাহেবকে জিজ্ঞেস কবৰে, মতিন কাজটা কবেছে কি না। বি, করিম সাহেবকে পাওযা গেল। তিনি অত্যন্ত উৎসাহেব সঙ্গে বললেন, কে, ফিবোজ সাহেব নাকি?
আমার কি সৌভাগ্য। গলা চিনে ফেলেছেন।
ঠাট্টা করছেন নাকি ভাই?
পাগল হয়েছেন। আপনার সঙ্গে কি আমার ঠাট্টার সম্পর্ক?
আমার চিঠিটা নিয়ে গিয়েছিলেন?
হ্যাঁ, গিয়েছিলাম। বহু কষ্টে ব্যাটার ঠিকানা বের করতে হয়েছে।
কী বলেছেন উনি?
আপনার পারসোনাল টাচওয়াল পেনসিলের চিঠিটা পড়ে মুখ বিকৃত করে বলল বি. করিম এই শালা আবার কে? আমার কাছে পেনসিলে চিঠি লেখে, আস্পর্ধা তো কম নয়।
করিম সাহেব বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। নিজেকে সামলে নিয়ে মেঘস্বরে বললেন, ফিরোজ সাহেব, একটা কথা শুনুন।
বলুন।
কেন সবসময। এ-রকম উল্টোপাল্টা কথা বলেন?
সত্যি কথা বলছি। শুধু-শুধু মিথ্যা বলব কেন?
ঐ ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার টেলিফোনে কথা হয়েছে। আপনি তার কাছে এখনো যাননি। তিনি ঠিকানা বদলেছেন, এখন থাকেন রামকৃষ্ণ মিশন রোডে।
ও, আচ্ছা।
আপনি গেলেই উনি আপনাকে কাজ দেবেন।
মেনি থ্যাংকস।
ফিরোজ সাহেব।
জি।
আচার-আচরণ সাধারণ মানুষের মত করার চেষ্টা করুন। ইয়ারকি-ফাজলামি তো যথেষ্ট করলেন। বয়স কত আপনার?
পঁয়ত্ৰিশ।
বয়স তো মাশাআল্লাহ কম হয়নি। আরেকটা কথা।
