নর্তকী হাসিমুখে বলল, আমার নাম অপালা।
দেবী, আমি কি নিভৃতে আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারি?
হ্যাঁ, পারেন। আসুন গোলাপ-বাগানে।
তারা দু’জন গোলাপ-বাগানে গেল। ফুলে-ফুলে চারদিকে আলো হয়ে আছে। রাজ-নর্তকী অপালা বলল, কী আপনার নিবেদন, কবি? আপনি আমার কাছে কী চান?
যা চাই তাই কি আমি পাব? এত বড় সৌভাগ্য সত্যি কি আমার আছে?
তা তো বলতে পারছি না। আগে আমাকে বলতে হবে, আপনি কি চান?
আমি আপনাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখতে চাই।
বেশ তো লিখুন।
আপনার অপূর্ব দেহ-সুষমা নিয়ে একটি কবিতা লিখতে চাই।
বেশ তো।
কিন্তু দেবী, তার জন্যে আপনার দেহটিকে তো আমার দেখতে হবে।
দেখতেই তো পাচ্ছেন। পাচ্ছেন না?
না, পাচ্ছি না। আপনার অপূর্ব দেহটি আড়াল করে রেখেছে কিছু অপ্রয়োজনীয় পোশাক। এইগুলি খুলে ফেলুন। পোশাক আপনার জন্যে বাহুল্য। এত সুন্দর একটি শরীরকে পোশাক ঢেকে রাখবে এটা কিছুতেই আমি মেনে নিতে পারছি না।
সে খানিকক্ষণ ভাবল, তারপর একে-একে খুলে ফেলল সব। শুধু গলায় রইল একটি চন্দ্রহার। সে চন্দ্রহারও খুলে ফেলতে গেল। কিন্তু কবি চেঁচিয়ে উঠলেন, না না, চন্দ্রহার খোলার দরকার নেই। চন্দ্রহার সরিয়ে ফেললে দেহের সমস্ত সৌন্দৰ্য একসঙ্গে আমার চোখে পড়বে। আমি তা সহ্য করতে পারব না।
গলায় শুধুমাত্র চন্দ্রহার পরে সে বাগানে হাঁটতে লাগল। আর রাজকবি একটি গাছের ছায়ায় তাঁর কবিতার খাতা নিয়ে বসলেন। আকাশ ঘন নীল। সূর্য তার হলুদ ফুল ছুড়ে দিচ্ছে চারদিকে। বাতাসে সেই হলুদ ফুলের নেশা-ধরানো গন্ধ। গাছে-গাছে পাখি ডাকছে।
গল্পের শেষ অংশ বেশ নাটকীয়। হঠাৎ বাগানে প্রবেশ করলেন রাজা। এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। রাজ-নর্তকী অপালার মৃত্যুদণ্ড হল। কবির চোখ অন্ধ করে দেয়া হল। অন্ধ কবি পথে-পথে ঘুরে বেড়ান এবং নর্তকীকে নিয়ে গীত রচনা করেন। অপূর্ব সব গীত। তিনি নিজেই তাতে সুর দেন। নিজেই গান। বনের পশু-পাখিরা পর্যন্ত সেই গান শুনে চোখের জল ফেলে।
পরবর্তী কয়েক পৃষ্ঠা জুড়ে কবির লেখা গীত। গীতগুলি গদ্যের মতো সরল নয়। ছেলেমানুষি ছড়া।
এই লেখার পর প্রায় দুবছর আর কিছু লেখা হয়নি। দুবছর পর হঠাৎ লেখা আমার জীবন। গদ্য এখানে অনেক স্বচ্ছ, গতিময়। হাতের লেখাও বদলে গেছে। আগের গোটা গোটা হরফ উধাও হয়েছে। এসেছে প্যাচানো ধরনের অক্ষর; আগের কোনো লেখায় কোনো রকম কাটাকুটি নেই। মনে হয় আগে অন্য কোথাও লিখে পরে খাতায় তোলা হত। আমার জীবন লেখাটিতে প্রচুর কাটাকুটি।
আমার জীবন
আমি কি খুব বুদ্ধিমতী? মনে হয় না। কেউ কোনো হাসির কথা বললে আমি বুঝতে পারি না। আজ বড় খালার বাসায় সবাই আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছিল। এটা যে ঠাট্টা, আমি বুঝতে পারিনি। কী নিয়ে কথা হচ্ছে তাও বুঝতে পারছি না। অবাক হয়ে সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছি। বড় খালার মেয়ে বিনু হেসে গড়িয়ে পড়ছে। আমি অবাক হয়ে বললাম, আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না। বড় খালা বললেন, কম বোঝাই তোমার জন্যে ভাল। বেশি বুঝলে বা বুঝতে চাইলে ঝামেলায় পড়বে। আমি এই কথারও মানে বুঝলাম না। মন-খারাপ করে বাসায় চলে এলাম। সারা দুপুর ভাবলাম। তখন একটা জিনিস আমার কাছে পরিষ্কার হলআমাকে বাবা এবং মা ছাড়া কেউ পছন্দ করে না। যেমন বড় খালা, তিনি ছোট খালার ছেলেমেয়েকে তুই করে বলেন, মেজো খালার ছেলেমেয়েকে তুই করে বলেন; আমাকে বলেন তুমি করে।
সন্ধ্যাবেল বাবাকে আমি এই কথাটা বললাম। বাবা চট করে খালাদের ওপর রেগে গেলেন এবং বলতে লাগলেন–যাও কেন তাদের বাসায়? আর যাবে না। ওরাও এ-বাড়িতে আসবে না। দারোয়ানকে বলে দেব এলে যেন গেট খোলা না হয়।
বাবার রাগ যেমন চট করে ওঠে তেমনি চট করে নেমে যায়। এইবার তা হল না। কী লজ্জার কাণ্ড! পরদিন সকালবেলা বাবা বড় খালাকে টেলিফোন করে বলেন–আপনি সবাইকে তুইতুই করে বলেন, আমার মেয়েটাকে তুমি করে বলেন কেন?
ভাগ্যিস বাবার এসব কাণ্ডকারখানা মা জানতে পারেননি। জানলে খুব মন-খারাপ করতেন। মার হার্টের অসুখ খুব বেড়েছে। নড়াচড়াই করতে পারেন না। এই অবস্থায় মন-খারাপ করার মত কোনো ঘটনা ঘটতে দেয়া উচিত নয়। কিন্তু বাবা এসব কিছু শুনবেন না। যা তার মনে আসে, করবেন। আমার মাঝে-মাঝে মনে হয় মার এই অসুখের মূল কারণ হয়ত-বা বাবা। কী লিখছি আবোল-তাবোল, হার্টের অসুখের কারণ বাবা হতে যাবেন কেন? তার মত ভাল মানুষ কজন আছে?
অপালা তার খাতা নিয়ে বসেছে
আজ অনেক দিন পর অপালা তার খাতা নিয়ে বসেছে। কোনো কিছু লেখার উদ্দেশ্যে নয়। পুরনো লেখায় চোখ বোলানোর জন্যে। রাজ-নর্তকী গল্পটি সে পড়েছিল। এ-রকম একটা অদ্ভুত গল্প। এত অল্প বয়সে সে কেন লিখেছিল ভাবতে-ভাবতে লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠল। এই গল্পটি ছিঁড়ে ফেলতে হবে। কিন্তু খাতা থেকে পাতা ছিড়তে মায়া লাগে। এই গল্পটি এখন ভাল লাগছে। না, আজ থেকে কুড়ি বছর পর হয়তবা ভাল লাগবে।
আফা।
অপালা চমকে তাকাল। রমিলা যে উঠে এসেছে, তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে, সে লক্ষই করেনি।
আপনেরে নিচে ডাকে।
কে?
ঐ যে দাড়িওয়ালা লোকটা, ঘর ঠিক করে যে।
ও, আচ্ছা। বসতে বল, আমি আসছি।
রমিলা গেল না, দাঁড়িয়ে রইল। অপালা শান্ত স্বরে বলল, দাঁড়িয়ে আছ কেন? কিছু বলবে?
আপনে দুপুরে কিছু খাইলেন না আফা।
