ফাজিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, আপনি যা বলছেন তা করা হবে, কিন্তু তা করার আগে আমাদের বোধহয় নিশ্চিত হওয়া উচিত যে জামশেদের গ্রেফতারের ব্যাপারটা একটি ধাপ্পা। হয়তো সে সত্যি সত্যি গ্রেফতার হয়েছে।
সে গ্রেফতার হয়নি। আর না হলেও কিছু যায় আসে না। ঐ ছোকরাকে একটু ভড়কে দেয়া দরকার।
ঠিক আছে। আমি কি এখন উঠব।
হ্যাঁ। রাতদুপুরে অকারণে আমার সামনে বসে থাকার কোনো কারণ দেখি না।
১৮.
জামশেদকে রাখা হয়েছে কড়া পাহারায়। কিন্তু তাকে মোটেই ভয়াবহ মনে হচ্ছে না। বরং ফুর্তিবাজ ধরনের লোক বলেই মনে হচ্ছে। ক্রমাগত কফি খাচ্ছে, চুরুট টানছে। জিপসি মেয়েদের নিয়ে চমকার অশ্লীল রসিকতা করে সবাইকে হাসিয়েছে। কে বলবে এই সেই ভয়াবহ লোক। যে-অফিসার তাকে গ্রেফতার করেছে সে ক্রমেই চিন্তিত হতে শুরু করল। কোথাও ভুল হয়নি তো?
ভুল হবার কথা অবিশ্যি নয়। সে গভীর রাতে একটি টেলিফোন পেয়ে দলবল নিয়ে ছুটে গেছে। ফোনকলটা ছিল সংক্ষিপ্ত—-জামশেদ অমুক ঠিকানায় রাত কাটাবে। আপনারা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে এলে তাকে ধরতে পারবেন। সে তখুনি নয়জনের একটি স্কোয়াড নিয়ে গিয়েছে। আর সত্যি আউটহাউসে একজনকে পাওয়া গেছে। কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছিল।
তাকে ডেকে তুলে জিজ্ঞেস করা হল : কী নাম?
লোকটি বলল, জামশেদ।
দেশ?
বাংলাদেশ।
তুমিই কি সেই বিখ্যতি জামশেদ?
বিখ্যাত কি না জানি না তবে আমিই সেই লোক।
তোমার সঙ্গে অস্ত্রটস্ত্র কী আছে?
আপাতত একটা বারো ইঞ্চি ড্যাগার ছাড়া কিছুই নেই।
তোমাকে গ্রেফতার করা হল।
ভালো কথা। এতে কি তোমার প্রমোশনের কোনো সুবিধা হবে?
গ্রেফতারের ঘটনাটা এক ঘণ্টার ভেতর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। পুলিশ কমিশনার বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেবার জন্যে আদেশ দিলেন। পুলিশি তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো পত্রিকা, রেডিও বা টিভি ইন্টারভিউ যেন না দেয়া হয় সেরকম নির্দেশ দেয়া হল। তদন্তকারী অফিসার হিসেবে নিয়োগ করা হল হমিসাইঙ ইন্সপেক্টর রিনালো ও কিনসিকে। এদের পাঠানো হল পোর্ট সিটিতে।
রিনালো এসে পৌঁছাল ভোর ছটায়। তার সঙ্গে জামশেদের কথাবার্তা হল এরকম—
রিনালো : তুমি জামশেদ?
জামশেদঃ হ্যাঁ।
রিনালো : জামশেদ যখন হাসপাতালে ছিল তখন প্রায়ই তার সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। তোমাকে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।
জামশেদঃ (নিশ্চুপ)
রিনালোঃ এই কাণ্ডটি কেন করেছ?
জামশেদঃ (নিশ্চুপপ)
রিনালোঃ তোমার নিজের বুদ্ধিতেই করেছ, না অন্য কারোর বুদ্ধিতে?
জামশেদ: নিজের বুদ্ধিতে। আসল জামশেদকে সাহায্য করবার জন্যে করেছি।
রিনালো : তোমার ধারণা এতে তার সাহায্য হবে?
জামশেদ :, আমার তা-ই ধারণা।
রিনালো : তুমি একটি মহাবেকুব। তুমি যে কী পরিমাণ জটিলতার সৃষ্টি করেছ সে সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা নেই।
রিনালো মহা বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। ঠিক তখনই এল টেলিফোন। মিহি সুরে একজন বলল, ভিকানডিয়া আপনাকে গভীর সমবেদনা জানাচ্ছেন। এবং আশা করছেন আপনি ভবিষ্যতে এমন কিছু করবেন না যাতে এজাতীয় দুঃখ আপনাকে আরো পেতে হয়।
রিনালো কিছুই বুঝতে পারল না। তার যমজ মেয়েদের একটি মারা গেছে গাড়ির নিচে চাপা পড়ে, এই খবর তখনও তার কাছে এসে পৌঁছায়নি।
১৯.
ক্যানটারেলা কয়েক মুহূর্ত নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। এটা কি স্বপ্ন না চোখে ভুল দেখছে? সন্ধ্যা থেকে এ পর্যন্ত তিন-চার পেগ হুইসকি খেয়েছে শুধু। এতে তার কোনো নেশা হয় না। কিন্তু নেশা ছাড়া এরকম একটি দৃশ্য দেখা সম্ভব নয়। ক্যানটারেলা দেখল তার সোফায় একজন কে বসে আছে। ঘর অন্ধকার। তবু বোঝা যাচ্ছে লোকটার হাত খালি নয়। লোকটি বলল, আমাকে চিনতে পারছ?
হ্যাঁ। তুমি কেমন আছ?
ভালো। তুমি ভালো আছ, ক্যানটারেলা?
ভালোই আছি। এ-জায়গার ঠিকানা কোথায় পেলে, জামশেদ?
বলছি। তার আগে তুমি পকেট থেকে তোমার ছোট্ট মিসিমার পিস্তলটা আমার পায়ের কাছে ফেলে দাও। অন্য কিছুই করতে চেষ্টা করবে না।
ক্যানটারেলা পিস্তুলটা বের করে ছুড়ে দিল। মৃদুস্বরে বলল, তুমি ওস্তাদ লোক, জামশেদ। সাহসী ও বুদ্ধিমান। দুটো জিনিস একসঙ্গে হয় না। সাহসী লোকরা হয় বোকা। আমি বুদ্ধিমান, সে কারণেই আমার সাহস কম। তোমার যদি আপত্তি না থাকে তা হলে আমি এক পেগ হুইসকি খেতে চাই। আমার চিন্তা করার শক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ক্যানটারেলা অনুমতির অপেক্ষা না করেই দক্ষিণের দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেল। ছোট্ট একটি ঘরোয়া ধরনের বার আছে সেখানে।
জামশেদ, তুমিও কি একটু চেখে দেখবে?
মদ খাওয়া আমি ছেড়ে দিয়েছি।
এরকম একটা পরিস্থিতিতে খাওয়া উচিতও নয়। ভালো কথা, তুমি কি আমাকে মেরে ফেলবে? কথাবার্তা খোলাখুলি হওয়া প্রয়োজন।
জামশেদ ভারী গলায় বলল, না, তোমাকে আমি মারব না।
আমিও তা-ই ভাবছিলাম। তুমি অনেক খোঁজখবর নিয়েছ, কাজেই আমি নিশ্চিত ছিলাম অ্যানি অপহরণ এবং মৃত্যুর ব্যাপারে আমার ভূমিকার কথা তুমি জান।
আমি জানি।
কতটুকু জান?
আমি জানি তুমি প্রথম থেকেই এর বিরোধিতা করেছ। অ্যানির মৃত্যুর খবর পেয়ে তুমি ছুটে গিয়েছিলে এতরাকে গুলি করে মারবার জন্যে। ভিকানডিয়া হস্তক্ষেপ না করলে এতরা সেই রাতেই মরত।
হ্যাঁ, তুমি অনেক খবরই রাখ। তবে আমি নিজে এতরাকে মারার জন্য যাইনি। লোক পাঠিয়েছিলাম। নিজের হাতে আমি মানুষ কখনো মারিনি। আমার সাহস কম।
