“আমি ইহাতে অসম্মত নহি, কিন্তু ওত্বে অলীদের কোন সংবাদ না পাইয়া জয়নালবধে অগ্রসর হওয়া ভাল কি মন্দ, তাহা আজ আমি স্থির বলিতে পারিলাম না। জয়নাল মদিনার সিংহাসনে বসিয়া দামেস্ক সিংহাসনের অধীনতা স্বীকারপূর্বক কিছু কিছু কর যোগাইলে দামেস্ক রাজ্যের যত গৌরব, হোসেন-বংশ একেবারে শেষ করিয়া একচ্ছত্র রূপে মক্কা-মদিনায় রাজত্ব করিলে কখনো তত গৌরব হইবে না।”
“সে কথা যথার্থ, কিন্তু তাহাতে সন্দেহ অনেক। কারণ জয়নাল প্রাণরক্ষার জন্য আপাতত আমার অধীনতা স্বীকার করিলেও করিতে পারে, কিন্তু সে যে বংশের সন্তান, তাহাতে কালে তাহার পিতা, পিতৃব্য এবং ভ্রাতাগণের দাদ উদ্ধার করিতে বদ্ধপরিকর হইয়া আমার বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা করিবে না, ইহা আমি কখনোই বিশ্বাস করিতে পারি না।”
“যাহা হউক মহারাজ! জয়নাল-বধ বিশেষ বিবেচনাসাপেক্ষ; আগামীকল্য প্রাতে যাহা হয়, করিব।”
উদ্ধার পর্ব ১১ প্রবাহ
এজিদের গুপ্তচরের অনুসন্ধান যথার্থ। তোগান ও তুর্কীয় ভূপতিদ্বয় সসৈন্যে মোহাম্মদ হানিফার সাহায্যে মদিনাভিমুখে যাইতেছেন এবং দিনমণি অস্তাচলে গমন করায়, গমনে ক্ষান্ত দিয়া বিশ্রাম-সুখ অনুভব করিতেছেন। প্রহরিগণ ধনু হস্তে শিবির রক্ষার্থে দণ্ডায়মান। শিবিরের চতুর্দিকে আলোকমালা সজ্জিত। ভূপতিগণ স্ব-স্ব নিরূপতি স্থানে অবস্থিত। শিবিরমধ্যে বিশ্রাম, আয়োজন, রন্ধন, কথোপকথন, স্বদেশ-বিদেশের প্রভেদ, জলবায়ুর গুণাগুণ, দ্রব্যাদির মূল্য, আচার-ব্যবহারের আলোচনা, নানা প্রকার কথা এবং আলাপের স্রোত চলিতেছে।
ওদিকে সীমার সসৈন্যে মহাবেগে আসিতেছে। সীমারের মনে আশা অনেক। হোসেনের মস্তক দামেস্কে আনিয়া পুরস্কার পাইয়াছে, আবার এই বৃহৎ কার্যে কৃতকার্য হইতে পারিলে বিশেষ পুরস্কার লাভ করিবে। ক্রমে মানমর্যাদার বৃদ্ধির সহিত পদবৃদ্ধির নিতান্তই সম্ভাবনা। যদি বিপক্ষদলের সহিত দেখা হয়, তবে প্রকাশ্যভাবে যুদ্ধ করিবে, কি নিশাচর নরপিশাচের ন্যায় গুপ্তভাবে আক্রমণ করিবে-এ চিন্তাও অন্তরে উদয় হইয়াছে। কি করিবে, আজ মহারাজ এজিদের সৈন্যাধ্যক্ষ পরিচয়ে দণ্ডায়মান হইবে, কি দস্যু নামে জগৎ কাঁপাইবে-এ পর্যন্ত মীমাংসা করিতে পারে নাই। যাইতে যাইতে আগন্তুক রাজগণের শিবির বহির্দ্বারস্থ আলোকমালা দেখিতে পাইল। স্থায়ী গৃহ নহে, চিরস্থায়ী রাজপুরী নহে,-নিশোপযোগী বস্ত্রবাস মাত্র। তাহারই সম্মুখস্থ আলোকমালার পারিপাট্য দেখিয়া সীমার আশ্চর্যান্বিত হইল। যতই অগ্রসর হইতে লাগিল, ততই নয়নের তৃপ্তি বোধ হইতে লাগিল। শিবিরের চতুষ্পার্শ্বেই প্রহরী হস্তে তীরধনু, বিশেষ সতর্কতার সহিত প্রহরীরা আপন-আপন কার্য করিতেছে। সাবধানের মার নাই! সীমারের পথপ্রদর্শক গুপ্তচরদিগের হস্তস্থিত দীপশিখা শিবির রক্ষীদিগের চক্ষে পড়িবামাত্র তাহারা পরস্পর কি কথা বলিয়া শরাসনে বাণ যোজনা করিল। সীমারদলের দক্ষিণ ও বাম পার্শ্ব দিয়া সমযোগে দুইটি শর বজ্র শব্দে চলিয়া গেল। পাষাণহৃদয় সীমারের অঙ্গ শিহরিয়া হৃদয় কাঁপিয়া উঠিল। ক্রমেই সুতীক্ষ্ণ বাণ উপর্যুপরি সীমার-সৈন্য মধ্যে আসিয়া পড়িতে লাগিল। শিবিরমধ্যে সংবাদ রটিয়া গেল যে, দস্যুদল অগ্নি জ্বালিয়া শিবির লুণ্ঠন করিতে আসিতেছে। তাহাদের যে প্রকার গতি দেখিতেছি, অল্প সময়মধ্যে শিবির আক্রমণ করিবে। সকলেই অস্ত্রশস্ত্রে প্রস্তুত হইলেন। তাহাদের জ্বালিত আলোকাভায় অস্ত্রের চাক্চিক্য, অশ্বের অবয়ব, সৈন্যের সজ্জিত বেশ সকলেই দেখিতে লাগিলেন, কিন্তু তমোময়ী নিশার প্রতিবন্ধকতায় নিশ্চয়রূপে নির্ণয় করিতে পারিলেন না, দস্যু কী রাজসৈন্য। গুপ্তসন্ধানীরাও সন্ধান করিয়া কিছু স্থির করিতে পারিল না! মহা সঙ্কট! সীমারের দুইটি চিন্তার একটি নিষ্ফল হইল। দস্যুভাবে আক্রমণ করিতে আর সাহস হইল না। প্রকাশ্যভাবে আক্রমণ করিবে স্থির করিয়া রণবাদ্য বাজাইতে আরম্ভ করিল।
আর সন্দেহ কি? আগন্তুক সৈন্যদল জনৈক দূত পাঠাইয়া তত্ত্বজিজ্ঞাসুর অভিমত হইতে, কাহারো কাহারো অমত হইল। তাঁহারা বলিলেন, “এই দল প্রথমে দস্যুভাবে, শেষে প্রকাশ্য রণবাদ্য বাজাইয়া আসিয়াছে, ইহাদিগকে বিশ্বাস নাই! সমর পদ্ধতি চির প্রচলিত বিধি, এ আগন্তুক শত্রুর নিকট আশা করা যাইতে পারে না। এই দলের অধিনায়ক খ্যাতনামা বীর হইলেও এইক্ষণে তিনিও নিতান্ত নীচ প্রবৃত্তির পরিচয় দিয়াছেন, অতএব কখনোই উহার নিকট দূত পাঠান কর্তব্য নহে।”
শিবিরস্থ প্রায় সকল লোকই দেখিলেন যে, আগন্তুক দল ক্রমে তিন দলে বিভক্ত হইয়া দক্ষিণ ও বামে দুই দল চলিয়া গেলে এক দল স্থিরভাবে যথাস্থানে দণ্ডায়মান রহিল। নিশীথ সময়ে যুদ্ধ কী ভয়ঙ্কর! শিবিরস্থ মন্ত্রীদল মন্ত্রণায় বসিলেন। শেষে সাব্যস্ত হইল, এক্ষণে কেবল আত্মরক্ষা, নিশাবসান হইলে চক্ষু দেখিয়া যাহা বিবেচনা হয় যুক্তি করিব। তবে রক্ষীরা আত্মরক্ষা ও শত্রুগণের আক্রমণে বাধা জন্মাইতে কেবল তীর-ধনুক যাহা করিতে পারে, তাহাই করুক, নিশাবসান না হইলে অন্য কোন প্রকারের অস্ত্র ব্যবহার করা যাইবে না। যতক্ষণ প্রভাতবায়ু বহিয়া না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত অবিশ্রান্ত তীর চলিতে থাকুক। ইহারা কে, কেন, আমাদের সহিত যুদ্ধ করিতে আসিল, তাহার এ পর্যন্ত কোন সন্ধান পাওয়া যায় নাই। সন্ধান না লইয়া, শত্রুবল না বুঝিয়া আক্রমণ বৃথা। অনিশ্চিত অপরিচিত আগন্তুক শত্রুর সহিত হঠাৎ যুদ্ধ করা শ্রেয়স্কর নহে।
