উভয় দলের লোকেই দেখিল যে গদাধারী যোধশরীর দ্বিখণ্ডিত হইয়া অশ্বের দুই দিকে পড়িয়া গেল।
ক্রমে দামেস্কের সত্তরজন সেনাকে একা জাফর শমনসদনে প্রেরণ করিলেন। এখনো ব্যূহ পূর্ববৎ রহিয়াছে। কিন্তু আর কেহই দ্বৈরথযুদ্ধে অগ্রসর হইতেছে না। জাফর চক্রাকারে অশ্ব চালাইতেছেন,-অশ্ব গলদ্ঘর্ম হইয়া ঘনঘন শ্বাস নিক্ষেপ করিতেছে।
ওত্বে অলীদ মহাক্রোধান্বিত হইয়া বলিল, “একটা লোক সত্তরজনের প্রাণ বিনাশ করিল, আর তোমরা তাহার কিছুই করিতে পারিলে না। দ্বৈরথ যুদ্ধ তোমাদের কার্য নহে! প্রথম ব্যূহের সমুদয় সৈন্য যাইয়া হানিফার সৈন্যের মস্তক আনয়ন কর।”
আজ্ঞামাত্র জাফরকে সৈন্যগণ ঘিরিয়া ফেলিল। মোহাম্মদ হানিফার আশাও পূর্ণ হইল; গাজী রহমান বলিলেন, “এ-ই সময়-এ-ই উপযুক্ত সময়!” সিংহগর্জনে মোহাম্মদ হানিফা আসিয়া জাফরের পৃষ্ঠপোষক হইলেন, অশ্বের দাপটে দামেস্ক সৈন্যগণ বহু দূরে সরিয়া দাঁড়াইল।
অলীদ দেখিলেন, মোহাম্মদ হানিফা স্বয়ং জাফরের পৃষ্ঠপোষক। দ্বিতীয় ব্যূহ ভগ্ন করিতে আদেশ করিয়া বলিলেন, “উভয়কে ঘিরিয়া কেবল তীর নিক্ষেপ কর! তরবারির আয়ত্তমধ্যে কেহ যাইয়ো না।”
আজ হানিফার মনের সাধ পূর্ণ হইল। ভ্রাতৃবিয়োগ-শোক-বহ্নি বিপক্ষ-শোণিতে শীতল করিতে লাগিলেন। দূর হইতে তীর নিক্ষেপ করিয়া কি করিবে? তরবারির আঘাতে, দুল্দুলের (হানিফার অশ্বের নাম) পদাঘাতে, জাফরের বর্শায় দামেস্ক-সৈন্য তৃণবৎ উড়িয়া যাইতে লাগিল,-মরুভূমিতে রক্তের স্রোত চলিল। জগৎ-লোচন রবি, সেই রক্তস্রোতের প্রতিবিম্বে আরক্তিম দেহে পশ্চিমগগনে লুক্কায়িত হইলেন। মোহাম্মদ হানিফা এবং জাফর শত্রু-বিনাশ বিরত হইয়া বেষ্টনকারী সৈন্যের এক পার্শ্ব হইতে কয়েকজনকে লোহিত বসন পরাইয়া সেই পথে নিজ শিবিরে প্রবেশ করিলেন। কার সাধ্য সম্মুখে দাঁড়ায়? কত তীর, কত বর্শা মোহাম্মদ হানিফার উদ্দেশে নিক্ষিপ্ত হইল-কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না।
ওত্বে অলীদ প্রথম যুদ্ধ-বিবরণ, হানিফার বাহুবলের পরিচয়, তাঁহার তরবারি-চালনের ক্ষমতা, বিস্তারিতরূপে লিখিয়া দামেস্কনগরে এজিদের নিকট কাসেদ প্রেরণ করিল।
উদ্ধার পর্ব ১০ প্রবাহ
বিশ্রামদায়িনী নিশার দ্বিযাম অতীত! অনেকেই নিদ্রার ক্রোড়ে অচেতন। এ সময় কিন্তু আশা, নিরাশা, প্রেম, হিংসা, শোক, বিয়োগ, দুঃখ, বিরহ, বিচ্ছেদ, বিকার এবং অভিমানসংযুক্ত হৃদয়ের বড়ই কঠিন সময়। সে হৃদয়ে শান্তি নাই-সে চক্ষে নিদ্রা নাই। ঐ এজিদের মন্ত্রণাগৃহে দীপ জ্বলিতেছে, প্রাঙ্গণে, দ্বারে, শাণিত কৃপাণহস্তে প্রহরী দণ্ডায়মান রহিয়াছে। গৃহাভ্যন্তরে, মন্ত্রণাদাতা মারওয়ানসহ এজিদ জাগরিত, সন্ধানী গুপ্তচর সম্মুখে উপস্থিত।
মারওয়ান আগন্তুক গুপ্তচরকে জিজ্ঞাসা করিল, “কোন্ দিকে যাইতে দেখিলে? আর সন্ধানেই-বা কি কি জানিতে পারিলে?”
“আমি বিশেষ সন্ধানে জানিয়াছি, তাহারা হানিফার সাহায্যে মদিনায় যাইতেছে।”
“মোহাম্মদ হানিফা যে মদিনায় গিয়াছে-এ কথা তোমাকে কে বলিল?”
“তাঁহাদের মুখেই শুনিলাম! মোহাম্মদ হানিফা প্রথমতঃ কারবালাভিমুখে যাত্রা করেন; পরে কি কারণে কারবালায় না যাইয়া মদিনায় গিয়াছেন, সে কথা অপ্রকাশ।”
“তবে কী যুদ্ধ বাঁধিয়াছে?”
“যুদ্ধ না বাঁধিলে সাহায্য কিসের?”
“আচ্ছা, কত পরিমাণ সৈন্য?”
“অনুমানে নিশ্চয় করিতে পারি নাই; তবে তুরস্ক ও তোগান প্রদেশেরই বিস্তর সৈন্য। এই দুই রাজ্যের ভূপতিদ্বয়ও আছেন।”
এজিদ্ বলিল, “কী আশ্চর্য! ওত্বে অলীদ কী করিতেছেন? ভিন্ন দেশ হইতে হানিফার সাহায্যার্থ সৈন্য যাইতেছে, সৈন্য-সামন্তের আহারীয় পর্যন্ত সঙ্গে যাইতেছে, ইহার কী কোন সংবাদ অলীদ প্রাপ্ত হয় নাই? মোহাম্মদ হানিফা স্বয়ং মহাবীর, তাহার উপরেও এত সাহায্য, শেষ যাহাই হউক, ঐ সকল সৈন্যগণ যাহাতে মদিনায় যাইতে না পারে, তাহার উপায় করিতে হইবে। ঐ সকল সৈন্য ও আহারীয় সামগ্রী যদি মদিনায় না যায়, তাহা হইলেও অনেক লাভ। এমন কোন বীরপুরুষই কী দামেস্ক রাজধানীতে নাই যে, উপযুক্ত সৈন্য লইয়া এই রাত্রেই উহাদিগকে আক্রমণ করে, আরো না হয় গমনে বাধা দেয়?”
সীমার করজোড়ে বলিলেন, “বাদশাহ নামদার! চির-আজ্ঞাবহ দাস উপস্থিত, কেবল আজ্ঞার অপেক্ষা। যে হস্তে হোসেন-শির কারবালা-প্রান্তর হইতে দামেস্কে আনিয়াছি, সেই হস্তে তোগানের ভূপতি ও তুরস্কের সম্রাট্কে পরাস্ত করা কতক্ষণের কার্য?”
এজিদের চিন্তিত হৃদয়ে আশার সঞ্চায় হইল। মলিনমুখে ঈষৎ হাসির আভা প্রকাশ পাইল। তখনই সৈন্য-শ্রেণীর অধিনায়ককে সীমারের আজ্ঞাধীন করিয়া দিলেন।
সীমার হানিফার সাহায্যকারীদিগের বিরুদ্ধে উপযুক্ত সৈন্য লইয়া গুপ্তচরসহ ঐ নিশীথ সময়ে যাত্রা করিলেন।
এজিদ্ বলিলেন, “মারওয়ান! মোহাম্মদ হানিফা একাদিক্রমে শত বর্ষ যুদ্ধ করিলেও আমার সৈন্যবল, অর্থবল ক্ষয় করিতে পারিবে না। যে পরিমাণ সৈন্য নগর হইতে বাহির হইবে, তাহার দ্বিগুণ সৈন্য সংগ্রহ করিতে পূর্বেই আদেশ করিয়াছি! ওদিকে যুদ্ধ হউক, এদিকে আমরা জয়নাল আবেদীনকে শেষ করিয়া ফেলি। জয়নাল আবেদীনের মৃত্যু ঘোষণা হইলে হানিফা কখনোই দামেস্কে আসিবে না। কারণ জয়নাল উদ্ধারই হানিফার কর্তব্য কার্য, সেই জয়নালই যদি জীবিত না থাকিল তবে হানিফার যুদ্ধ বৃথা। দ্বিতীয় কথা, হানিফার বন্দি অথবা মৃত্যু আমাদের পক্ষে উভয়ই মঙ্গল। কিন্তু যদি জয়নাল জীবিত থাকে, আর হানিফাও জয়লাভ করে, তাহা হইলে মহা সঙ্কট ও বিপদ! এ অবস্থায় আর জয়নালকে রাখা উচিত নহে। আজ রাত্রেই হউক, কি কাল প্রত্যূষেই হউক, জয়নালের শিরচ্ছেদ করিতেই হইবে।”
