সীমার প্রেরিত সৈন্যদল দুই পার্শ্ব হইতে অগ্রসর হইতে হইতে পুনঃ একত্র মিশিয়া অর্ধচন্দ্রাকৃতিভাবে শিবিরাভিমুখে যাইতে লাগিল। ক্রমেই অগ্রসর, ক্রমেই আক্রমণের উদ্যোগ!
এ যুদ্ধ দেখে কে? এ বীরগণের প্রশংসা করে কে? সীমার বাহাদুরির যশোগান মুক্তকণ্ঠে গায় কে? জাগে নক্ষত্র, জাগে নিশা, জাগে উভয় দলের সৈন্যদল। কিন্তু দেখে কে?
সীমার দল এবং তাহার অর্ধচন্দ্রাকৃতি দল অগ্রসরে ক্ষান্ত হইল। আর পদবিক্ষেপের সাহস হইল না। শিবিরের চতুর্দিক হইতে অনবরত তীর আসিতে লাগিল। সীমারপক্ষীয় বিস্তর সৈন্য তীরাঘাতে হত-আহত হইয়া ভগ্নোৎসাহ হইয়া পড়িল। উভয় দলেই দুই হস্তে নিশাদেবীকে তাড়াইয়া ঊষার প্রতীক্ষা করিতেছেন-গগনের চিহ্নিত নক্ষত্র-প্রতিও বারবার চক্ষু পড়িতেছে। দেখিতে দেখিতে শুকতারা দেখা দিল, শিবিররক্ষীদিগের তীরও তূণীরে উঠিল। কারণ প্রভাতীয় উপাসনার সময় প্রায় সমাগত; এ সময় অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ। বিপক্ষদল তীর নিক্ষেপে ক্ষান্ত হইলেও, সীমার সৈন্য একপদ ভূমিও অগ্রসর হইতে সাহসী হইল না। সীমারের জ্বলন্ত উত্তেজনা বাণীতেও তাহাদের হস্তপদ আর উঠিল না। সকলেরই প্রভাতের প্রতীক্ষা।
শিবিরস্থ মন্ত্রীদল দেখিতেছেন, শিবিরের চতুর্দিকেই বিপক্ষ সৈন্য, আপনারা এক প্রকারে বন্দি! এ আগন্তুক শত্রুর হস্ত হইতে পরিত্রাণ না পাইলে মদিনা যাওয়া কঠিন। উভয় দলই ঊষাদেবীর প্রতীক্ষায় দণ্ডায়মান। ক্রমে প্রদীপ্ত দীপশিখার তেজ হ্রাস হইতে আরম্ভ হইল-ঘোর অন্ধকারে তরলতা প্রবেশ করিল। দেখিতে দেখিতে প্রভাতবায়ুর সহিত ক্ষণস্থায়ী ঊষাদেবী ধবল বসনে ঘোমটা টানিয়া, পূর্ব দিক হইতে রজনী-দেবীকে সরাইয়া সরাইয়া দিনমণির আগমনপথ পরিষ্কার করিয়া দিলেন! উভয় দলই পরস্পরের চক্ষে পড়িল।
সীমার পক্ষ হইতে জনৈক অশ্বারোহী সৈন্য দ্রুতবেগে শিবিরের নিকট আসিয়া বলিতে লাগিল, “তোমরা যে উদ্দেশ্যে যেখানে যাইতেছ, ক্ষান্ত হও! যদি প্রাণের আশা থাকে গমনে ক্ষান্ত হও-আর যাইতে পারিবে না। যদি চক্ষু থাকে, তবে চাহিয়া দেখ, তোমরা মহারাজ এজিদের প্রধান বীর সীমারের কৌশলে এখন বন্দি! পরের জন্য কেন প্রাণ হারাইবে? তোমাদের সহিত মহারাজ এজিদের কোন প্রকারের বাদ-বিসম্বাদ নাই। তোমাদের কোন বিষয়ে অভাব কি অনটন হইয়া থাকে, বল-আমরা অভাব পূরণ করিতে প্রস্তুত আছি। মানে মানে প্রাণ লইয়া স্ব-স্ব রাজ্যে গমন কর। মদিনাভিমুখে যাইবার কথা আর মুখে আনিয়ো না। যদি এই-সকল কথা অবহেলা করিয়া মদিনাভিমুখে যাইতে কিঞ্চিৎ অগ্রসর হও, তবে, জানিয়ো, মরণ অতি নিকট। এখন তোমাদের ভাল-মন্দের ভার তোমাদের হস্তে।”
শিবিরবাসীদের পক্ষ হইতে কেহ তাহার নিকটে আসিল না, কেহ তাহার কথায় উত্তর করিল না। কিন্তু কথা শেষের সহিত,-লাখে-লাখে ঝাঁকে-ঝাঁকে তীরসকল গগন আচ্ছন্ন করিয়া, স্বাভাবিক শন্শন্ শব্দে আসিতে লাগিল। আক্রমণ ও বাধার আশা, অতি অল্প সময়মধ্যেই সীমারের অন্তর হইতে অপসৃত হইয়া গেল। সীমারের সৈন্যগণ আর তিষ্ঠিতে পারিল না। আঘাত সহ্য করিতেছে, মরিতেছে, কেহ অজ্ঞান হইয়া পড়িতেছে, রক্তবমন করিতেছে, বক্ষ হইতে রক্তের ধারা ছুটিতেছে, চক্ষু উল্টাইয়া পড়িতেছে, ক্ষত-বিক্ষত হইয়া মহা অস্থির হইয়া পলাইতেছে; আবার কেহ ধরাশায়ী হইয়া নাকে-মুখে শোণিত উদ্গগীরণ করিয়া প্রাণ বিসর্জন করিতেছে।
সীমারের চাতুরী বুঝিয়া উঠা বড়ই কঠিন। সন্ধির প্রস্তাবে দূত প্রেরণ করিল। শিবিরস্থ সৈন্যগণের সুতীক্ষ্ণ তীর তূণীরে প্রবেশ করিল, ক্ষণকালের জন্য যুদ্ধ স্থগিত রহিল।
সীমার-প্রেরিত দূতের প্রার্থনা এই যে, “আমরা বহু দূর হইতে আপনাদের অনুসরণে আসিয়া মহাক্লান্ত হইয়াছি। আজিকার মত যুদ্ধ ক্ষান্ত থাকুক;-আগামী প্রভাতে আমরা প্রস্তুত হইব। যদি বিবেচনা হয়, তবে বিনাযুদ্ধে মদিনার পথ ছাড়িয়া দিব। আমার মহাক্লান্ত!”
শিবিরস্থ মন্ত্রীদল মধ্যে তুর্কীর মন্ত্রী বলিলেন, “আমরা সম্মত হইলাম, ক্লান্ত শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র উত্তোলন করিলে, অস্ত্রের অবমাননা করা হয়। আমরা ক্ষান্ত হইলাম। তোমরা পথশ্রান্তি দূর কর।”
সীমারদূত যথাবিধি অভিবাদন করিয়া প্রস্থান করিল।
সীমার চিন্তায় মগ্ন হইল। অনেকক্ষণের পর সীমারের কথা ফুটিল-প্রকাশ্য যুদ্ধে পারিব না। কখনই পারিব না। এই তীরের মুখে আমরা টিকিতে পারিব না। কৌশলে, না হয় অর্থে কার্যসিদ্ধি হইবে, বাহুবলের আশা বৃথা। সীমার উঠিলেন। পরিচারকগণকে বলিলেন, “আমার এই সকল যুদ্ধসাজ, অস্ত্রশস্ত্র, বেশভূষা রাখিয়া দাও, যদি কখনো অস্ত্র হস্তে লইবার উপযুক্ত হই, তবে লইব। নতুবা এই রাখিলাম। সীমার আর উহা স্পর্শ করিবে না। যুদ্ধসাজ অস্ত্রশস্ত্র আমাদের উপযুক্ত নহে, তুর্কী ও তোগানের সৈন্যগণই উহার যথার্থ অধিকারী।”
উদ্ধার পর্ব ১২ প্রবাহ
তুমি না সেনাপতি! ছি ছি সীমার! তুমি যে এক্ষণে এজিদের সেনাপতি! কী অভিমানে বীরবেশ পরিত্যাগ করিয়া ভিখারীর বেশ ধারণ করিয়াছ? উচ্চ পদ লাভ করিয়াও কী তোমার চির-নীচতা স্বভাব যায় নাই? ছি ছি! সেনাপতির এই কার্য? বল তো, আজ কোন্ কুসুম-কাননের প্রস্ফুটিত কমলগুচ্ছ সকল গোপনে হরণ করিতে ছদ্মবেশী হইলে? কী অভিপ্রায়ে অঙ্গে মলিন-বসন,-স্কন্ধে ভিক্ষার ঝুলি,-শিরে জীর্ণ আস্তরণ? এত কপটতা কার জন্য? তোমার অন্তরের কপাট তুমিই খুলিয়া দেখ, দেখ তো, বাহ্যিক বেশের সহিত তাহার কোন বর্ণের সম্মিলন আছে কি-না? মনের কথা মন খুলিয়া বল তো, তোমার পূর্বকথার সহিত কোন কথার সমতা আছে কি-না? ও-হস্তে আর অস্ত্র ধরিবে না-তাহাই কী সত্য? সেই অভিমানেই কী এই বেশ? আজ যুদ্ধে পরাস্ত হইয়াছ বলিয়াই কী সৈন্যাধ্যক্ষের পদ পরিত্যাগ করিয়া বিরাগী? কিন্তু সীমার একটি কথা! সূর্যদেব অস্তাচলে গমন করিয়া দশ দিনের মধ্যে আর জগতে আসিবেন না,-বহু পরিশ্রমের পর কিছু দিন বিশ্রাম করিবেন। বৎসরকাল আর বিধুর উদয় হইবে না, তাঁহার ক্রোড়স্থ মৃগশিশুটি হঠাৎ ক্রোড়স্খলিত হইয়া পড়িয়া মরিয়া গিয়াছে। সেই দুঃখে তিনি মহাকাতর! এ সকল অকথ্য, স্বভাবের বিপরীত কথাও বিশ্বাস করিতে পারি; কিন্তু সীমার! তোমার বাহ্যিক বৈরাগ্য ভাব দেখিয়া, অন্তরে বিরাগ, সংসারে ঘৃণা, ধর্মে আস্থা জন্মিয়াছে, ইহা কখনো বিশ্বাস করিতে পারি না। সূর্যদেব মধ্যগগনে-উত্তাপ প্রখর, তুমি একাকী কোথায় যাইতেছ? ওদিকে তোমার প্রয়োজন কী? ওরা যে তোমার শত্রু! শত্রুশিবিরের দিকে এ বেশে কেন?
