দূতবর নিজ প্রভুর আজ্ঞা প্রকাশ করিয়া নতশিরে পুনরায় অভিবাদন করিয়া দণ্ডায়মান হইলে, গাজী রহমান বলিতে লাগিলেন, “দূতবর! তোমার রাজপ্রতিনিধি বীরবর অলীদ মহোদয়কে গিয়া বল, আপনার রাজ্যে প্রবেশ করিতে কাহারো অনুমতির অপেক্ষা করে না। হোসেনের-পরিজনকে কারাগারে হইতে উদ্ধার করাই আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য এবং হাসান-হোসেনের প্রতি যিনি যে প্রকার ব্যবহার করিয়াছেন তাহার সমুচিত প্রতিবিধান করিতে আমরা কখনোই ভুলিব না। পৈতৃক দামেস্ক রাজ্য, মাবিয়ার পুত্র এজিদ্ যাহা নিজরাজ্য বলিয়া দামেস্ক সিংহাসনের অবমাননা করিয়াছে, তাহাকে সমুচিত শাস্তিবিধান করিব। মদিনায় প্রবেশ করিয়া আমাদের গতি ক্ষান্ত হইবে না। অলীদের লক্ষাধিক সৈন্য-শোণিতে আমাদের চিরপিপাসু তরবারির শোণিত-পিপাসা মিটিবে না! এজিদের এক-একটি সৈন্যশরীর শত খণ্ডিত করিলেও আমাদের তরবারির তেজ কমিবে না। ক্রোধ নিবৃত্তি হইবে না। বন্দিভাবে আমাদিগকে দামেস্কে পাঠাইতে হইবে না-এই সজ্জিতবেশে, এই বীরবেশে, বিজয় নিশান উড়াইয়া, রণভেরী বাজাইতে বাজাইতে শৃগাল-কুকুরের ন্যায় শত্রুবধ করিতে করিতে আমরা দামেস্ক নগরে প্রবেশ করিব। আমাদের বিশ্রাম-বিরাম-ক্লান্তি কিছুই নাই। এখন মদিনায় প্রবেশ করিব। তুমি শিবিরে যাইতে-না-যাইতে দেখিবে-যুদ্ধ নিশান উড়িয়াছে, আমরাও শিবিরের নিকটবর্তী।”
দূতবর নতশিরে অভিবাদন করিয়া বিদায় হইলেন। তাঁহার শিবির হইতে বহির্গত হওয়া মাত্রেই সুনীল আকাশে মোহাম্মদ হানিফার পক্ষে লোহিত ধ্বজা উড়িতে লাগিল। ঘোররবে রণভেরী বাজিয়া উঠিল। কাড়া-নাকাড়া ও ডঙ্কা ঝাঁজরি শারদীয় ঘনঘটাকে পরাজয় করিয়া চতুর্দিক আলোড়িত করিয়া তুলিল। তুরঙ্গসকল কর্ণ উচ্চ করিয়া পুচ্ছ-গুচ্ছ স্বাভাবিক ঈষৎ বক্রভঙ্গিতে হ্রেষারবে নৃত্য করিতে করিতে অগ্রসর হইতে লাগিল। পদাতিক সৈন্যরাও বীরদর্পে পদক্ষেপণ করিতে লাগিল। বহুদূর ব্যাপিয়া প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল। মোহাম্মদ হানিফার অন্তরে ভ্রাতৃবিয়োগ শোক, পরিবারের কারারোধ-বেদনা বা জয়নালের উদ্ধার চিন্তার নাম এখন নাই। এখন একমাত্র চিন্তা-মদিনায় প্রবেশ ও হজরত নূরনবী মোহাম্মদের রওজা ‘জিয়ারত’ (ভক্তি দর্শন)। কিন্তু মুখের ভাব দেখিলে বোধ হয় যে তিনি নিশ্চিন্তভাবে সৈন্য-শ্রেণীকে উৎসাহের দৃষ্টান্ত সাহসের আদর্শ ও বীরজীবনের উপমা দর্শন করাইয়া মহানন্দে অশ্ব চালাইয়া যাইতেছেন। এজিদ্পক্ষেও সমর-প্রাঙ্গণ-সীমার নির্দিষ্ট লোহিত নিশান নীলাকাশে দেখা দিয়াছে। সৈন্যশ্রেণী সপ্তশ্রেণীতে পঞ্চপ্রকার ব্যূহ নির্মাণ করিয়া দণ্ডায়মান হইয়াছে। কোন ব্যূহ চতুষ্কোণে স্থাপিত, কোন ব্যূহ পশু-পক্ষীর শরীরের আদর্শে গঠিত। আক্রমণ এবং বাধা উভয়ভাবেই অটল।
গাজী রহমান বলিলেন,-“অলীদ যে প্রকারে ব্যূহ নির্মাণ করিয়া আক্রমণ এবং বাধা দিতে দণ্ডায়মান, এ সময় একটু বিবেচনার আবশ্যক হইতেছে। আমাদের সৈন্যসংখ্যা অপেক্ষা বিপক্ষসৈন্য অধিক-তাহাতে সন্দেহ নাই। সম্মুখযুদ্ধে আমাদের আম্বাজী সৈন্যগণ সুদক্ষ। এত অধিক বিপক্ষ সৈন্যের মধ্যে পড়িয়া ব্যূহ ভেদ করিলেও আমাদের বিস্তর সৈন্যক্ষয় হইবে। কিছুক্ষণের জন্য শত্রুদিগকে দ্বৈরথ যুদ্ধে আহ্বান করাই যুক্তিসঙ্গত। যদি অলীদের আর সৈন্য না থাকে তবে অবশ্যই তাহাকে রচিত ব্যূহ ভগ্ন করিয়া যুদ্ধার্থে সৈন্য পাঠাইতে হইবে। একজন আম্বাজী সৈন্য যদি দশজন কাফেরকে নরকে প্রেরণ করিয়া শহীদ হয় সেও সৌভাগ্য।”
মোহাম্মদ হানিফা গাজী রহমানের বাক্যে অশ্বগতি রোধ করিলেন। ক্রমে সৈন্যগণও প্রভুকে গমনে ক্ষান্ত দেখিয়া দণ্ডায়মান হইল।
গাজী রহমান বলিলেন, “কে দ্বৈরথ-যুদ্ধ-প্রিয়? কার অস্ত্র অগ্রে শত্রুশোণিতপানে সমুৎসুক?”
অশ্বারোহী সৈন্যগণ সমস্বরে বলিয়া উঠিল, “আমি অগ্রে যাইব।” মোহাম্মদ হানিফা সকলকে ধন্যবাদ দিয়া আশ্বস্ত করিলেন এবং বলিলেন, “প্রথম যুদ্ধ জাফরের।”
জাফর প্রভুর আদেশে নিষ্কোষিত অসিহস্তে সমরক্ষেত্রে উপস্থিত হইয়া বিপক্ষ সৈন্যকে যুদ্ধে আহ্বান করিলেন। আহ্বানের শব্দ অলীদ-শিবিরে প্রবেশমাত্র মুহূর্তমধ্যে বায়ুবেগে বিপক্ষদল হইতে একজন সৈন্য আসিয়া বলিতে লাগিল, “ওরে! মদিনা প্রবেশের আশা এই পরিশুষ্ক বালুকা রাশিতে বিসর্জন করিয়া পলায়ন কর। ওরে! তোরা কী সাহসে যুদ্ধ করিতে আসিয়াছিস্? হাসান, হোসেন, কাসেম যখন আমাদের হাতে বিনাশ হইয়াছে, তখন তোরা কোন্ সাহসে তরবারি ধরিয়াছিস্? তোদের সৌভাগ্যসূর্য কারবালা প্রান্তরে লোহিত বসন পরিয়া ইহকালের তরে একেবারে অস্তমিত হইয়াছে। এখন তোদের অঙ্গে নীল বসনই বেশি শোভা পায়; আর্তনাদ এবং বক্ষে করাঘাত করাই তোদের এখনকার কর্তব্য; রণভেরী বাজাইয়া আবার কি সাধে তরবারি ধরিয়াছিস্? দুঃসময়ে লোকে যে বুদ্ধিহারা হইয়া আত্মহারা হয়, তাহার দৃষ্টান্ত তোরাই আজ দেখাইলি, জগৎ হাসাইলি। পিপীলিকার পালক যে জন্য উঠিয়া থাকে, তাহাই তোদের ভাগ্যে আছে। আর অধিক কি?”
আম্বাজী বীর বলিলেন, “কথার উত্তর-প্রত্যুত্তরের সময় আমাদের এখন নাই। সময় উত্তীর্ণ হইয়া যাইতেছে। যমদূত অস্থির হইতেছেন; আমার হস্তস্থিত অস্ত্র প্রতি চাহিয়া আছেন।”
“যমদূত কোথায় রে বর্বর! দেখ, যমদূত কে?” বলিয়াই অসির আঘাত! আঘাতে আঘাত উড়িয়া গেল। এজিদ্-সেনা লজ্জিত, মহা লজ্জিত হইলেন। অশ্ব ফিরাইয়া পুনরায় আঘাত করিবার ইচ্ছায় যেমন তরবারি উত্তোলন করিয়াছেন, অমনই তাঁহার বামস্কন্ধ হইতে দক্ষিণ পার্শ্ব দিয়া জাফরের সুতীক্ষ্ণ অসি, চঞ্চল চপল সদৃশ চাক্চিক্য দেখাইয়া চলিয়া গেল। অলীদ জাফরের তরবারির হাত দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইলেন। এদিকে দ্বিতীয় যোধ সমরে আগত। সে আর টিকিল না-যে তেজে আগত, সেই তেজেই খণ্ডিত। তৃতীয় সৈন্য উপস্থিত-সে আর তরবারি ধরিল না,-বর্শা ঘুরাইয়া জাফরের প্রতি নিক্ষেপ করিল। জাফর সে আঘাত ভর্মে উড়াইয়া পদাঘাতে বিপক্ষকে অশ্ব হইতে মৃত্তিকায় ফেলিয়া বর্শার দ্বারা বিদ্ধ করিলেন। চতুর্থ বীর গদাহস্তে আসিয়া জাফরকে বলিল, “কেবল তরবারি খেলা আর বর্শা ভাঁজাই শিখিয়াছ। বল তো ইহাকে কি বলে?” গদা বজ্রবৎ জাফরের মাথায় পড়িল। জাফর বামহস্তে বর্ম ধরিয়া গদার আঘাত উড়াইয়া দিলেন। কিন্তু রোষে তাঁহার চক্ষু ঘোর রক্তিমবর্ণ ধারণ করিল। মহাক্রোধে তরবারির আঘাত করিয়া বলিলেন, “যা কাফের, তোর গদা লইয়া নরকে যা।”
