গাজী রহমান প্রভুর আদেশমত ‘শাহীনামা’ পত্র, যাহা যাহার নিকট উপযুক্ত, তখনই লিখিতে আরম্ভ করিলেন। সৈন্যগণ ক্রমে আসিয়া জুটিল। মন্ত্রীপ্রবর-রাজাদেশে সকল শ্রেণীর প্রধান প্রধান অধ্যক্ষগণকে সমস্ত বিবরণ জ্ঞাপন করাইলেন। নির্দিষ্ট স্থানে কাসেদ সকল প্রেরিত হইল। সকলে আবার গমনে অগ্রসর হইলেন। একদিন প্রেরিত গুপ্তচর ও সন্ধানী লোকদিগের সহিত দেখা হইল। সবিস্তার অবগত হইয়া পুনরায় যাইতে লাগিলেন। নির্দিষ্ট স্থান অতি নিকট; উৎসাহে গমনবেগ বৃদ্ধি করা হইল।
উদ্ধার পর্ব ০৯ প্রবাহ
ওত্বে অলীদ সৈন্যসহ মদিনা-প্রবেশপথের প্রান্তরে হানিফার অপেক্ষায় রহিয়াছে। একদা সায়াহ্নকালে কয়েকজন অনুচরসহ নিকটস্থ শৈলশিখরে বায়ু সেবন আশায় সজ্জিত বেশে বহির্গত হইল। পাঠক! যে স্থানে মায়মুনার সহিত মারওয়ান নিশীথ সময়ে কথা কহিয়াছিল, এই সেই পর্বত। হোসেনের তরবারির চাক্চিক্য দেখিয়া যে পর্বতের গুহায় অলীদ লুকাইয়াছিল, এই সেই পর্বত! শৈলশিখরে বিহার করিবে, প্রকৃতির স্বাভাবিক শোভা দেখিয়া নয়ন পরিতৃপ্ত করিবে, এই আশাতেই এখানে অলীদের আগমন। আশার অভ্যন্তরে যে একটু স্বার্থ না আছে তাহাও নহে। স্বাভাবিক দৃষ্টির বহির্ভূত যদি কোন ঘটনা ঘটিবার লক্ষণ অনুমান হয়, প্রত্যক্ষভাবে তাহা দেখিবার জন্য দূরদর্শন যন্ত্রও সঙ্গে আনিয়াছে। অশ্বতরী সকল সমতল ক্ষেত্রে রাখিয়া জন কয়েক অনুচরসহ পর্বতে আরোহণ করিল। প্রথমে মদিনানগরের দিকে যন্ত্রাশ্রয়ে ঈক্ষণ করিয়া দেখিল, নীলবর্ণ পতাকা সকল উচ্চমঞ্চে উড়িয়া হোসেনের মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করিতেছে। অন্যদিকে দেখিল, খর্জুর বৃক্ষের শাখা সকল বাতাঘাতে উন্মত্ত ভাব ধারণ করিয়া হোসেনের শোকে মহাশোক প্রকাশ করিতেছে। তাহার পর সম্মুখ দিকে ঈক্ষণ করিতেই হস্ত কাঁপিয়া গেল। যন্ত্রটি সুবিধা মত ধরিয়া দেখিল, সন্দেহ ঘুচিল না। আবার বিশেষ মনোযোগের সহিত দেখিল, সন্দেহ ঘুচিয়া নিশ্চিত সাব্যস্ত হইল। এখন কথা-এ কা’র সৈন্য? এমন সুসাজে সুসজ্জিত হইয়া মদিনাভিমুখে আসিতেছে,-এ সৈন্যশ্রেণী কার? তুরগগুলি গায়ে গায়ে মিশিয়া নৃত্য করিতে করিতে অগ্রসর হইতেছে; অশ্বারোহীদের অশ্বপৃষ্ঠে বসিবারই কি পরিপক্বতা; অস্ত্র ধরিবারই-বা কি পারিপাট্য; বেশভূষা, কান্তি, গঠন, অতি চমৎকার, মনোহর এবং নয়নের তৃপ্তিকর। ইহারা কে? শত্রু-না মিত্র? আবার দূরদর্শন যন্ত্র চক্ষু দিয়া সঙ্গিগণকে বলিলেন, “তোমরা একজন শীঘ্র শিবিরে যাইয়া শ্রেণীবিভাগের অধ্যক্ষগণকে সংবাদ দাও যে, অর্ধচন্দ্র আর পূর্ণতারাসংযুক্ত পতাকা গগনে দেখা গিয়াছে, প্রস্তুত হও।”
আজ্ঞামাত্র একজন সহচর দ্রুতগতি তুরগপৃষ্ঠে আরোহণ করিয়া প্রস্থান করিল।
অলীদ আবার দূরদর্শনে মনোনিবেশ করিল। আগন্তুক সৈন্যগণ আর অগ্রগামী হইতেছে না,-শ্রেণীবদ্ধমত নানা শ্রেণীতে বিভক্ত হইয়া দণ্ডায়মান হইল। আরো দেখিল যে, একজন অশ্বারোহী দ্রুতবেগে চলিয়া আসিতেছে। তৎক্ষণাৎ তূণীর হইতে তীর বাহির করিয়া ধনুকে টঙ্কার দিল। অশ্বারোহীর প্রতি লক্ষ্য করিতেই দেখিল, সে জাতীয় চিহ্নযুক্ত শুভ্র নিশান উড়াইয়া সংবাদবাহীর পরিচয় দিতে দিতে নক্ষত্রবেগে ছুটিয়াছে। সামরিক বিধির মস্তকে পদাঘাত করিয়া দূতবরের বক্ষ লক্ষ্যে শর নিক্ষেপ করিবে, কি উত্তোলিত হস্ত ধনুর্বাণসহ সঙ্কুচিত করিবে এই চিন্তা করিতে করিতে দূতবর পর্বত পার্শ্ব হইতে চক্ষের নিমিষে তাহার শিবিরাভিমুখে চলিয়া গেল। অলীদ চক্ষু ফিরাইয়া কেবল ধাবিত অশ্বের পুচ্ছসঞ্চালন, আর নিশানের অগ্রভাগ মাত্র দেখিল।
কি করিবে এখনো কিছুই সাব্যস্ত করিতে পারেন নাই। পরিশেষে তাহার হিংসাপূর্ণ হৃদয় স্থির করিল যে, যে কৌশলেই হউক, মোহাম্মদীয়গণকে বিনাশ করাই শ্রেয়ঃ। নিশ্চয়ই মোহাম্মদ হানিফা মদিনায় আসিতেছেন। হানিফার দূতকে গুপ্তভাবে বধ করিলে কে জানিবে? কে জানিবে যে, এ কার্য একজন প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষ দ্বারা সংঘটিত হইয়াছে? যে শুনিবে, সেই বলিবে, কোন দস্যু কর্তৃক এরূপ বিপরীত কাণ্ড ঘটিয়াছে। এই ভাবিয়া পুনরায় আপন আয়ত্তমত ধনুর্বাণ ধারণ করিল। মনে মনে বলিল, “পুনঃ এই পথে আসিলেই একেবারে দেখিব, দেখিব, দেখিব!” কিন্তু এই বলিতে বলিতেই তাহার কর্ণে দ্রুতগতি অশ্ব পদ-প্রতিশব্দ প্রবেশ করিল। চক্ষু ফিরাইয়া দেখিল, সেই অশ্ব, সেই নিশান, সেই দূত। দূতবরের বক্ষ লক্ষ্য করিয়া তীর নিক্ষেপ করিবে, অলীদের এই উদ্যোগেই দূতবর তাহার লক্ষ্য ছাড়াইয়া বহু দূরে সরিয়া পড়িলেন, অলীদের হাতের তীর হাতেই রহিয়া গেল। বিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেখিল, দূতবর আগন্তুক সৈন্যমধ্যে যাইয়া মিশিলেন। ওত্বে অলীদ পর্বত বিহার পরিত্যাগ করিয়া সহচরগণসহ শিবিরে আসিবার জন্য শিখর হইতে অবরোহণ করিল।
মোহাম্মদ হানিফার প্রেরিত দূত অলীদ-শিবিরে অল্প সময়মধ্যে যাহা যাহা জানিয়া গিয়াছেন, সমুদয় মোহাম্মদ হানিফার গোচর করিয়া বলিলেন, “বিনাযুদ্ধে মদিনায় যাওয়ার সাধ্য নাই। সৈন্যগণ বীরসাজে সজ্জিত-প্রধান সৈন্যাধ্যক্ষ ওত্বে অলীদ মহোদয় এক্ষণে শিবিরে নাই।”
এই সকল কথা হইতেছে, এমন সময়ে বিপক্ষ দূত শিবির দ্বারে আসিয়া উপস্থিত। মোহাম্মদ হানিফার আজ্ঞায় বিপক্ষ দূত সমাদরে আহূত হইয়া শিবিরমধ্যে প্রবেশ করিল। বিশেষ সম্মানের সহিত অভিবাদন করিয়া দূতবর বলিল, “বাদশাহ নামদার! মহারাজ এজিদের আজ্ঞা এই যে, সংস্রবশূন্য নগরে প্রবেশ করিতে, বিশেষ সৈন্যসামন্তসহ পর রাজ্যে আসিতে স্থানীয় রাজার অনুমতি আবশ্যক। আপনি সে অনুমতি গ্রহণ করেন নাই; সুতরাং আর অগ্রসর হইবেন না! আর একপদ ভূমি অগ্রসর হইলেই রাজপ্রতিনিধি মহাবীর অলীদ আপনার গমনে বাধা দিতে সৈন্যসহ অগ্রসর হইবেন। আর আপনি যদি হোসেন-পরিবারের সাহায্যের জন্য আসিয়া থাকেন, তবে ন্যূনতা স্বীকারপূর্বক স্বদেশে ফিরিয়া যাইবার প্রার্থনা করিলেও যাইতে পারিবেন না; বন্দিভাবে দামেস্কে যাইতে হইবে।”
