মারওয়ান সালেমা বিবির নিকট যাইয়া বলিল, “আপনাদের কপালের এমনই গুণ যে ভাল করিতে গেলেও মন্দ হইয়া যায়। আমার ইচ্ছা যে কোন প্রকারে এই বিপদ হইতে আপনারা উদ্ধার পান।”
সালেমা বিবি বলিলেন, “কি প্রকারে ভাল করিতে ইচ্ছা কর?”
“মহারাজ এজিদ্ নামদার আজ্ঞা করিয়াছেন যে, জয়নাল আবেদীনের দ্বারা আজিকার জুম্মার খোৎবা পড়াইয়া তাঁহাদিগকে কারামুক্ত করিয়া দাও।”
“ভাল কথা। জয়নাল কই? তাহাকে এ-কথা বলিয়াছ?”
“বলিয়াছি এবং তাহার উত্তর শুনিয়াছি!”
“সে কী উত্তর করিল? তার বুদ্ধি কী?”
“বুদ্ধি খুব আছে, ক্রোধও খুব আছে।”
“ক্রোধের কথা বলিয়ো না। বাপু! তাহারা ধর্মের দাস, ধর্মই তাহাদের জীবন; বোধ হয়, ধর্মসংক্রান্ত কোন কথা বলিয়া থাকিবে। ধর্মবিরোধী কথা তাহাদের কর্ণে প্রবেশ না করিলে কখনোই সে শরীরে ক্রোধের সঞ্চার হয় না।”
“মহারাজ আজ্ঞা করিয়াছেন, আজ হোসেনের নাম পরিবর্তন করিয়া মক্কা ও মদিনা এইক্ষণে যাঁহার করতলে, জয়নাল আবেদীন তাঁহারই নামে খোৎবা পাঠ করুন। আমি আজই তাঁহাদিগকে বন্দিগৃহ হইতে মুক্ত করিয়া মদিনায় পাঠাইয়া দিব। জয়নাল মদিনার সিংহাসনে বসিয়া রাজত্ব করুন,-কিন্তু তাঁহাকে দামেস্করাজের অধীনে থাকিতে হইবে!”
“এ কী কথা! বন্দি হইয়া আসিয়াছি বলিয়াই কী সে ধর্মের প্রতি হস্তক্ষেপ করিবে? আমাদের প্রতি যে অত্যাচার করিতেছে তাহাকে যথার্থ ধার্মিক বলিয়া কিরূপে স্বীকার করিব? হজরত মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ্র প্রচারিত ধর্মে যে দীক্ষিত নহে, মদিনার সিংহাসনের যে অধীশ্বর নহে, তাহার নামে কী প্রকারে খোৎবা পাঠ হইতে পারে? তাও আবার পাঠ করিবে-জয়নাল আবেদীন! এ কী কথা!”
“আপনি বৃদ্ধ হইয়াছেন, একটু শান্ত হউন! বন্দিভাবে থাকিয়া এতদূর বলা নিতান্ত অন্যায়। যাহা হউক, আমি বলি, যদি খোৎবাটা পড়িলেই মুক্তিলাভ হয়, তাহাতে হানি কী? জয়নাল মদিনার সিংহাসনে বসিতে পারিলে কি আর তাঁহার উপর দামেস্করাজের কোন ক্ষমতা থাকিবে? তখন যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পারিবেন, ইহাতে আর আপনাদের ক্ষতি কি?”
“ক্ষতি কিছুই নাই;-কিন্তু-”
“আর ‘কিন্তু’ কথা মুখে আনিবেন না, প্রাণ বাঁচাইবার জন্য অনেক-”
“জয়নালকে একবার ডাকিতে বল।”
জয়নাল আবেদীন আড়ালে থাকিয়া সকলই শুনিতেছিলেন, সালেমা বিবির কথার আভাসেই নিকটে আসিয়া দাঁড়াইলেন। মহারোষের চিহ্ন এবং ক্রোধের লক্ষণ দেখিয়া, সালেমা বিবি অনুমানেই অনেক বুঝিলেন। সস্নেহে জয়নালের কপোলদেশ চুম্বন করিয়া অতি নম্রভাবে বলিতে লাগিলেন, “এজিদের নামে খোৎবা পড়ায় দোষ কি? যদি ভগবান্ কখনো তোমার সুখসূর্যের মুখ দেখান, তোমার নামে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি লোক খোৎবা পাঠ করিবে। এখন মারওয়ানের কথা শুনিলে বোধ হয় ঈশ্বর ভালই করিবেন।”
জয়নাল বলিলেন, “আপনিও কী এজিদের নামে খোৎবা পড়িতে অনুমতি করেন?”
“আমি অনুমতি করি না; তবে ইহা বলিতে পারি যে, তোমার মুক্তির জন্য আমরা সকলে প্রাণ দিতে প্রস্তুত আছি। একদিন খোৎবা পড়িলেই যদি তুমি সপরিবারে বন্দিগৃহ হইতে মুক্তিলাভ করিতে পার, মদিনার সিংহাসনে নির্বিবাদে বসিতে পার, তবে তাহাতে ক্ষতি কি ভাই? আরো কথা,-তুমি ইচ্ছা করিয়া এই কুকার্যে রত হইতেছ না। এ পাপ তোমাতে অর্পিবে না।”
সামান্য কারামুক্তি আর মদিনার রাজ্যলাভ জন্য আমি এজিদের নামে খোৎবা পড়িব? এ বন্দিগৃহ হইতে মুক্তির জন্য ভয় কী? শক্তি থাকিলেই মুক্তি হইবে। যদি কেহ রাজ্য কাড়িয়া লইয়া থাকে তাহার নিকট ভিক্ষা করিয়া রাজ্যগ্রহণ করা অপেক্ষা অস্ত্রে তাহার মস্তক নিপাত করাই আমার কথা।”
সালেমা বিবি জয়নালের মুখে শত শত চুম্বনপূর্বক আশীর্বাদ করিয়া বলিলেন, “তোমার মনস্কামনা সিদ্ধ হউক! ঈশ্বর তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করুন।”
মারওয়ান বলিতে লাগিল, “আপনারা এরূপ গোলযোগ করিলে কোন কার্যই সিদ্ধ হইবে না। আর সময় নাই; যদি মদিনা যাইবার ইচ্ছা থাকে, এজিদের হস্ত হইতে পরিত্রাণের আশা থাকে, জয়নালকে খোৎবা পাঠ করিতে প্রেরণ করুন; ইহাতে সম্মত না হন, আমার অপরাধ নাই, আমি নাচার।”
সালেমা বিবি বলিলেন, “জয়নাল! তুমি ঈশ্বরের নাম করিয়া মস্জিদে যাও। তোমার ভাল হইবে।”
জয়নাল আবেদীন বলিলেন, “আপনি যাইতে আজ্ঞা করিলেন?”
“হাঁ, আমি যাইতে আজ্ঞা করিলাম। তোমার কোন চিন্তা নাই। আরো একটি কথা বলিতেছি, শুন! শুনিয়া মনে মনে বিচার করিলেই ভাল-মন্দ বুঝিতে পারিবে। একদা তোমার পিতামহ হজরত আলী কাফেরদিগের সহিত যুদ্ধ করিতে আম্বাজ নামে এক নগরে গমন করিয়াছিলেন। সেখানে যাইয়া শুনিলেন, এদেশ পুরুষাধিকারে নহে, একজন রাজ্ঞীর অধিকারভুক্ত। আরো আশ্চর্য কথা,-রাজ্ঞী এ পর্যন্ত বিবাহ করেন নাই; তাঁহার পণ এই, বাহুযুদ্ধে যে তাঁহাকে পরাস্ত করিবে, তাঁহাকেই পতিত্বে বরণ করিবেন, আর রাজ্ঞী জয়ী হইলে পরাজিত পক্ষকে আজীবন দাসত্ব স্বীকার করিয়া তাঁহার দাসভাবে থাকিতে হইবে। মহাবীর আলী স্ত্রীলোকের এই পণের কথা শুনিয়া যুদ্ধে প্রস্তুত হইলেন। বিবি হনুফাও কম ছিলেন না। আরবীয় যাবতীয় বীরকে তিনি জানিতেন। তাঁহারও মনে মনে ইচ্ছা ছিল যে, আলীকে পরাস্ত করিয়া একজন মহাবীর দাস লাভ করিবেন। ঘটনাক্রমে সুযোগ ও সময় উপস্থিত-দিন নির্ণয় হইল। রূপের গরিমায়-যৌবনের জ্বলন্ত প্রতিভায় বিবি হনুফা আরবের সুবিখ্যাত বীরকেও তুচ্ছজ্ঞানে সমরাঙ্গণে উপস্থিত হইলেন; কিন্তু ঈশ্বরের মহিমায় যুদ্ধে পরাস্ত হইয়া মোহাম্মদীয় ধর্ম গ্রহণপূর্বক মহাবীর আলীকে স্বামীত্বে বরণ করিলেন। হজরত আলী বিবি ফাতেমার ভয়ে এ কথা মদিনার কাহারো নিকট প্রকাশ করেন নাই। সময়ে বিবি হনুফার গর্ভে এক পুত্রসন্তান হয়। আলী সে সময়ে মহা চিন্তিত হইয়া কি করেন-কথাও গোপন থাকে না। বিবি ফাতেমার ভয়ও কম নহে। পুত্রকে গোপনে আনাইয়া একদা প্রভু মোহাম্মদের পদপ্রান্তে ফেলিয়া দিয়া জোড়হস্তে দণ্ডায়মান হইলেন। প্রভু মোহাম্মদ পুত্রটিকে ক্রোড়ে লইয়া মুখে চুমা দিয়া বলিলেন, “আমি সকলই জানি। আমি ইহার নাম, ইহার মাতার নামের সহিত এবং আমার নামের সহিত যোগ করিয়া রাখিলাম।” বিবি ফাতেমা দেখিলেন যে, একটি অপরিচিত সন্তানকে প্রভু ক্রোড়ে করিয়া বারবার মুখে চুমা দিতেছেন। বিবি ফাতেমা সন্তানের কথা জিজ্ঞাসা করায় প্রভু সমুদয় বৃত্তান্ত প্রকাশ করিলে, বিবি ফাতেমা ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিয়া পিতাকে এক প্রকার ভর্ৎসনা করিয়া বলিলেন, “আমার সপত্নীপুত্রকে আপনি স্নেহ করিতেছেন? আর কোন্ বিবেচনায় আপনার নামের সহিত যোগ করিয়া নাম রাখিলেন?”
