প্রভু বলিলেন, “ফাতেমা, শান্ত হও! এই মোহাম্মদ হানিফা তোমার কি কি উপকার করিবে, শুন। যে সময়ে প্রিয় পুত্র হোসেন কারবালার মহাপ্রান্তরে এজিদের আজ্ঞায় সীমার হস্তে শহীদ হইবে, তৎকালে তোমার বংশে এক জয়নাল আবেদীন ভিন্ন পুরুষপক্ষে আর কেহ থাকিবে না; তোমার আত্মীয়-স্বজন ভগিনী পুত্রবধূরা এজিদের সৈন্যহস্তে কারবালা হইতে দামেস্কে বন্দিভাবে আসিবে। তাহাদের কষ্টের সীমা থাকিবে না। সেই কঠিন সময়ে এই মোহাম্মদ হানিফা যুদ্ধ করিয়া তাহাদিগকে উদ্ধার করিবে, জয়নাল আবেদীনকে মদিনার সিংহাসনে বসাইবে।” বিবি ফাতেমা পিতৃমুখে এই সকল কথা শুনিয়া, মোহাম্মদ হানিফাকে আহ্লাদে ক্রোড়ে করিয়া হানিফার আপাদমস্তকে চুমা দিয়া আশীর্বাদপূর্বক বলিলেন, “প্রাণাধিক! তুমি আমার পুত্র, তুমি আমার হৃদয়ের ধন, মস্তকের মণি। আমার চুম্বিত স্থানে কোনরূপ অস্ত্র প্রবেশ করিবে না! তুমি সর্বদা সর্বজয়ী হইয়া জগতে মহাকীর্তি স্থাপন করিবে। আশীর্বাদ করি, তুমি দীর্ঘজীবী হও!” যে সময়ে কারবালা প্রান্তরে যুদ্ধের সূচনা হয়, সেই সময় আমি গোপনে একজন কাসেদকে মোহাম্মদ হানিফার নিকট সমুদয় বৃত্তান্ত বলিয়া পাঠাইয়াছি। মোহাম্মদ হানিফা শীঘ্রই দামেস্কে আসিয়া আমাদিগকে উদ্ধার করিবেন। এই তো শাস্ত্রের কথা। এখন সকলই ঈশ্বরের হাত। আরো একটি কথা,-হোসেন যুদ্ধকালে কি বলিয়া গিয়াছেন মনে হয়? তিনি বলিয়াছেন, “তোমরা ভাবিয়ো না, এমন একটি লোক আছে, যদি তাহার কর্ণে এই সকল ঘটনার অণুমাত্রও প্রবেশ করে, ইহার প্রতিশোধ সে অবশ্যই লইবে। সে কে? এই মোহাম্মদ হানিফা।”
জয়নাল আবেদীন এই পর্যন্ত শুনিয়া আর বিলম্ব করিলেন না। খোৎবা পাঠ করিবেন স্বীকার করিয়া উপাসনার সমুচিত পরিধেয় লইয়া বহির্গত হইলেন, মারওয়ান সঙ্গে সঙ্গে যাইতে লাগিল! নগরে হুলস্থূল পড়িয়াছে-আজ জয়নাল আবেদীন এজিদের নামে খোৎবা পাঠ করিবে। মারওয়ানের আনন্দের সীমা নাই। আজ এজিদের আশা সম্পূর্ণরূপে পূর্ণ হইবে। জয়নাল উপাসনা-মন্দিরে প্রবেশ করিয়া উপাসনান্তর খোৎবা পাঠ আরম্ভ করিলেন। মোহাম্মদীয়গণের অন্তরে খোৎবার শব্দগুলি সুতীক্ষ্ণ ছুরিকার ন্যায় বিদ্ধ হইতে লাগিল। কোন্ মুখে জয়নাল আবেদীন মদিনার ইমামের নাম অর্থাৎ হোসেনের নামের স্থানে এজিদের নাম উচ্চারণ করিবেন? হায়! হায়! এ কী হইল? কিন্তু সময় উপস্থিত হইলে মদিনার সিংহাসনের যথার্থ উত্তরাধিকারী যিনি তাঁহারই নামে খোৎবা পাঠ হইল। খতিবের (খতিব-যে খোৎবা পাঠ করে।) মুখে কেহ এজিদের নাম শুনিল না। পূর্বেও যে নাম এখনো সেই হোসেনের নাম স্পষ্ট শুনিল।
মোহাম্মদীয়গণ মনের আবেগে আনন্দ-উল্লাসে জয় জয় করিয়া উঠিল। এজিদ্পক্ষ রোষে ক্রোধে অগ্নিমূর্তি হইয়া জয়নাল আবেদীনকে নানা প্রকার কটুবাক্যে ভর্ৎসনা করিতে করিতে ভজনালয় হইতে বহির্গত হইল।
নিষ্কোষিত অসিহস্তে এজিদ্ ক্রোধে অধীর। কম্পিত কলেবরে কর্কশ স্বরে অসি ঝন্ঝনির সহিত রসনা সঞ্চালন করিয়া বলিল, “এখনই জয়নালের শিরচ্ছেদ করিব! এত চাতুরী আমার সঙ্গে?”
মারওয়ান বলিতে লাগিল, “বাদশা নামদার! আশা-সিন্ধু এখনো পার হই নাই। বহুদূরে আসিয়াছি বলিয়া ভরসা হইয়াছে,-অচিরেই তীরে উঠিব। কিন্তু মহারাজ! আজ যে একটা গোপনীয় কথা শুনিয়াছি তাহাতে জয়নাল আবেদীনের জীবন শেষ করিলে ইমামবংশ সমূলে বিনাশ হইবে না, বরং সমরানল সতেজে জ্বলিয়া উঠিবে। সে দুর্দান্ত প্রমত্ত রাবণকে মারওয়ান যতদিন কৌশলাঙ্কুশে হোসেনের দাদ উদ্ধার পর্যবেক্ষণ হইতে নিবারণ করিতে না পারিবে, ততদিন মারওয়ানের মনে শান্তি নাই, আপনার জীবনে আশা নাই।”
এজিদ্ মৃত্তিকায় তরবারি নিক্ষেপ করিয়া বলিল, “সে কী কথা? হোসেনবংশে এখনো প্রমত্ত কুঞ্জরসম বীরশ্রেষ্ঠ বীর আছে? আমি তো আর কাহাকেও দেখিতে পাই না?”
মারওয়ান বলিল, “জয়নালকে নির্দিষ্ট বন্দিগৃহে প্রেরণ করিবার আদেশ হউক। আমি সে গুপ্ত কথা-নিগূঢ়তত্ত্ব এখনই বলিতেছি।”
উদ্ধার পর্ব ০৬ প্রবাহ
যে নগরে সুখসাগরে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ খেলা করিতেছিল, মহানন্দের স্রোত বহিতেছিল; রাজপ্রাসাদ, রাজপথ, প্রধান প্রধান সৌধ আলোকমালায় পরিশোভিত হইয়াছিল; ঘরে ঘরে নৃত্য, গীত, বাজনার ধুম পড়িয়াছিল, রঙ্গিন পতাকা সকল হেলিয়া-দুলিয়া জয়সূচক চিহ্ন দেখাইতেছিল;-হঠাৎ সমুদয় বন্ধ হইয়া গেল! মুহূর্তমধ্যে মহানন্দবায়ু থামিয়া বিষাদ-ঝটিকা-বেগ রহিয়া রহিয়া বহিতে লাগিল। মাঙ্গলিক পতাকারাজি নতশিরে হেলিতে-দুলিতে পড়িয়া গেল। রাজপ্রাসাদের বাদ্যধ্বনি, নূপুরের ঝন্ঝনি, সুমধুর কণ্ঠস্বর, আর কাহারো কর্ণে প্রবেশ করিল না। সুহাস্য আস্য সকল বিষাদ-কালিমা রেখায় মলিন হইয়া গেল। কেহ কাহারো সঙ্গে কথা কহিতেছে না, জিজ্ঞাসা করিলেও উত্তর পাইতেছে না। রাজভবনের অবস্থার হঠাৎ পরিবর্তন দেখিয়া কতজনে কত কথার আলোচনায় বসিয়া গেল। শেষে সাব্যস্ত হইল, গুরুতর মনঃপীড়া হঠাৎ পরিবর্তন, নিশ্চয়ই হঠাৎ শ্রবণ। দুঃখের কথা বটে! কারবালার সংবাদ-বিবি সালেমার প্রেরিত কাসেদের আগমন।
এ প্রদেশের নাম আম্বাজ। রাজধানী হনুফানগরে! এই সমৃদ্ধিশালী মহানগরীর দণ্ডধর মোহাম্মদ হানিফা। সম্রাট্ স্বীয় কন্যার বিবাহ উপলক্ষে আমোদ-আহ্লাদে মাতিয়াছিলেন, শুভ সময়ে শুভ কার্য সুসম্পন্ন করিবেন আশা ছিল, এমন সময়ে কাসেদ আসিয়া হরিষে সম্পূর্ণ বিষাদ ঘটাইয়া মোহাম্মদ হানিফাকে নিতান্তই দুঃখিত করিয়াছে!
