মারওয়ান উপস্থিত হইলে, এজিদ্ ঐ সকল গুপ্ত বিষয়ের স্থির সিদ্ধান্ত করিতে কহিলেই মারওয়ান একটু চিন্তা করিয়া বলিল, “আগামী জুম্মাবারে (শুক্রবারে) জয়নাল দ্বারা মহারাজ নামে খোৎবা পাঠ করাইব। এক্ষণে সমগ্র প্রদেশে হোসেনের নামে খোৎবা হইতেছে। কারণ হোসেনের পর এ পর্যন্ত মদিনায় রাজা কেহ হয় নাই। জয়নাল যদি আপন পিতার নাম পরিত্যাগ করিয়া মহারাজের নামে খোৎবা পাঠ করে, তবেই কার্যসিদ্ধি-তবেই দামেস্কের জয়-তবেই বিনা যুদ্ধে মদিনা করতলে। যাঁহার নামে খোৎবা, তিনিই মক্কা-মদিনার রাজা। এখনই রাজ্যমধ্যে ঘোষণা করিয়া দিতেছি যে, আগামী জুম্মাবারে, শেষ ইমাম জয়নাল আবেদীন,-দামেস্ক-সম্রাট্ মহারাজাধিরাজ এজিদ্ নামদার নামে খোৎবা পাঠ করিবেন। নগরের যাবতীয় ঈশ্বরভক্ত লোককেই উপাসনা-মন্দিরে খোৎবা শুনিতে উপস্থিত হইতে হইবে। যিনি রাজ আজ্ঞা অবহেলা করিবেন, তৎক্ষণাৎ তাঁহার শিরচ্ছেদ করা যাইবে।”
এজিদ্ মহা তুষ্ট হইয়া মারওয়ানকে যথোপযুক্ত পুরস্কৃত করিল। মুহূর্তমধ্যে রাজঘোষণা দামেস্ক নগরের ঘরে ঘরে প্রকাশ হইল। ঘোষণার মর্মে অনেকেই সুখী হইল, আবার অনেকে মাথায় হাত দিয়া মাটিতে বসিয়া পড়িল। তাহাদের হৃদয়ে বিষম আঘাত লাগিল। প্রকাশ্যে কোন কথা বলিবার সাধ্য নাই-রাজদ্রোহী সাব্যস্ত হইয়া প্রাণ যায়। গোপনে গোপনে বলিতে লাগিল, “এতদিন পরে নূরনবী মোহাম্মদের প্রচারিত ধর্মে কলঙ্করেখা পতিত হইল! হায় হায়! কি মর্মভেদী ঘোষণা! হায় হায়! ইসলাম ধর্মের এত অবমাননা! কাফেরের নামে খোৎবা। বিধর্মী নারকী ঈশ্বরদ্রোহীর নামে খোৎবা। হা ইসলাম ধর্ম! দুরন্ত জালেমের হস্তে পড়িয়া তোমার এই দুর্দশা! হায় হায়! পুণ্যভূমি মদিনার সিংহাসন যাঁহার আসন, সেই শেষ ইমাম জয়নাল আবেদীন, কাফেরের নামে খোৎবা পড়িবে? সে খোৎবা শুনিবে কে? সে উপাসনাগৃহে যাইবে কে? আমরা অধীন প্রজা, না যাইয়া নিস্তার নাই। জগদীশ! আমাদের কর্ণ বধির কর, চক্ষুর জ্যোতি হরণ কর, চলচ্ছক্তি রহিত কর।”
মোহাম্মদীয়গণ নানা প্রকারে অনুতাপ করিতে লাগিলেন। এজিদ্ পক্ষীয় বিধর্মীরা দর্প করিয়া বলিতে লাগিল, “মোহাম্মদ বংশের বংশমর্যাদার চিরগৌরব এখন কোথায় রহিল? ধন্য মন্ত্রী মারওয়ান!”
এ সকল সংবাদ বন্দিরা এখন পর্যন্ত জানিতে পারে নাই! এজিদ্ মনে করিয়াছে, উহাদের জীবন আমার হস্তে,-মুহূর্তে প্রাণ রাখিতে পারি, মুহূর্তে বিনাশ করিতে পারি। জুম্মার দিন জয়নালকে ধরিয়া আনিয়া মস্জিদে পাঠাইয়া দিব। যদি আমার নামে খোৎবা পড়িতে অস্বীকার করে, রাজাজ্ঞা অমান্য করার অপরাধে তখনই উহার প্রাণবিনাশ করিব।
জুম্মাবার উপস্থিত; নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই মোহাম্মদীয়গণ প্রাণের ভয়ে উপাসনা-মন্দিরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। জয়নাল আবেদীনের নিকটে যাইয়া মারওয়ান বলিল, “আজ তোমাকে মস্জিদে খোৎবা পড়িতে হইবে।”
জয়নাল বলিলেন, “আমি প্রস্তুত আছি। ইমামদিগের কার্যই উপাসনায় অগ্রবর্তী হওয়া, খোৎবা পাঠ, ধর্মের আলোচনা, শিষ্যদিগকে উপদেশ দান;-সুতরাং ঐ সকল আমার কর্তব্য কার্য। তুমি অপেক্ষা কর, আমি আমার মায়ের অনুমতি লইয়া আসিতেছি।”
“তোমার মা’র অনুমতি লইতেই যদি চলিলে, তবে আর একটি কথা শুনিয়া যাও।”
“কি কথা?”
“খোৎবা পড়িতে হইবে বটে, কিন্তু তোমার নামে পড়িতে পারিবে না।”
জয়নাল চক্ষু পাকল করিয়া বলিলেন, “কেন পারিব না?”
“কেন-র কোন উত্তর নাই,-রাজার আজ্ঞা।”
“ধর্মচর্চায় বিধর্মী রাজার আজ্ঞা কি? আমার ধর্মকর্ম আমি করিব, তাহাতে তোমাদের কথা কি? আমি যতদিন মদিনার সিংহাসনে না বসিব ততদিন পিতার নামেই খোৎবা পাঠ করিব: এই তো রাজার আজ্ঞা। তুমি কোন্ রাজার কথা বল?”
“তুমি নিতান্তই অবোধ, কিছুই বুঝিতেছ না। তোমার মার নিকট বলিলে তিনি সকলই বুঝিতে পারিবেন।”
“আমি অবোধ না হইলে তোমাদের বন্দিখানায় কেন আসিব? আর কী কথা আছে বল। আমি মা’র নিকটে যাইতেছি।”
“যিনি দামেস্কের রাজা, তিনিই এক্ষণে মদিনার রাজা। মক্কা ও মদিনা একই রাজার রাজ্য হইয়াছে। এখন ভাব দেখি, কাহার নামে খোৎবা পড়া কর্তব্য?”
“আমি ও-প্রকারের কথা বুঝিতে পারি না। যাহা বলিবার হয়, স্পষ্টভাবে বল।”
“তোমার কিছুমাত্র জ্ঞান নাই; কেবল থাকিবার মধ্যে আছে-রাগ আর নিজের অহঙ্কার। বাদশা এজিদের নামে খোৎবা পড়িতে হইবে।”
জয়নাল আবেদীন রোষে এবং দুঃখে সজলনয়নে বলিতে লাগিলেন, “কাফেরের নামে আমি খোৎবা পড়িব? এজিদ্ কোন্ দেশের রাজা? আর সে কোন্ রাজার পুত্র?”
মারওয়ান অতিব্যস্তে জয়নাল আবেদীনকে ধরিয়া সস্নেহে বলিতে লাগিল, “সাবধান! সাবধান!! ও-কথা মুখে আনিয়ো না। ও-কথা মুখে আনিলে নিশ্চয় তোমার মাথা কাটা যাইবে।”
“আমি মাথা কাটাইতে ভয় করি না। তুমি আমার নিকট হইতে চলিয়া যাও; আমি খোৎবা পড়িতে যাইব না।”
মারওয়ান মনে করিয়াছিল যে, জয়নালকে বলিবামাত্র সে খোৎবা পড়িতে আসিবে। কিন্তু তাহার কথা শুনিয়া অবাক্ হইল। এদিকেও উপাসনার সময় অতি নিকট। মারওয়ান মনে মনে বলিতে লাগিল, “এ সিংহশাবকের নিকট চাতুরী চলিবে না, বল প্রকাশ করিলেও কার্য উদ্ধার হইবে না। সালেমা বিবির নিকট যাইয়া বলি;-তিনি সর্বশ্রেষ্ঠা, বয়সেও প্রবীণা, অবশ্যই ভাল-মন্দ বিবেচনা করিয়া জয়নালকে সম্মত করাইয়া দিবেন। সকলেই এক বন্দিগৃহে।”
