মারওয়ানকে লক্ষ্য করিয়া বলিতে লাগিলেন, “রে বিধর্মী কাফের! তুই এখানে কেন? দূর হ! সখিনার সম্মুখ হইতে দূর হ! তুই কী আশায় এখানে আসিয়াছিস্? দূর হ কাফের, দূর হ! এ পবিত্র শিবির হইতে দূর হ! ঐ দেখ! যদি চক্ষু থাকে, তবে ঐ দেখ। শূন্যে চাহিয়া দেখ-সাহানা বেশ! সেই নয়নমনমুগ্ধকারী সাহানা বেশ! লোহিত রঞ্জিত সেই সাহানা বেশ! সেই সাহানা বেশ। শত্রু-অস্ত্রে ক্ষতবিক্ষত হইয়া সাহানা বেশ! ওরে নরাধম বর্বর! চণ্ডালের অমৃত আশা? শয়তানের বেহেস্তে আশা? ঘোর নারকীর জান্নাতে আশা? মহাপাতকীর হুরে আশা! দেখ! এই দেখ-যার প্রাণ তার নিকটে, যেখানে কাসেম, সেইখানে সখিনা-রক্তমাখা সুতীক্ষ্ণ খঞ্জর-কাসেমের হস্তের খড়্গ-এই বলিয়া হস্তস্থিত খঞ্জর সুকোমল বক্ষে সজোরে বসাইয়া পৃষ্ঠ পার করিয়া দিলেন। হায় রে রুধির ধারা! খঞ্জরের অগ্রভাগ বহিয়া বহিয়া শোণিতের ধারা ছুটিল। সখিনা কাসেমের মৃতদেহ পার্শ্বে অর্ধমুকুলিত ছিন্নলতার ন্যায় ধরাশায়িনী হইলেন! (সতী-সাধ্বী সখিনার আত্মঘাতিনী হওয়া সম্বন্ধে শাস্ত্রমতে অনৈক্য আছে।)
মারওয়ান নিস্তব্ধ! অন্য অন্য যোধগণ, যাহারা সখিনার-সাধ্বী সতী সখিনার কীর্তি স্বচক্ষে দেখিল, তাহারা সকলেই নিস্তব্ধ এবং স্থিরভাবে দণ্ডায়মান। পদপরিমাণ ভূমিও অগ্রসর হইতে আর সাহসী হইলেন না।
মারওয়ান বলিতে লাগিল, “ভ্রাতৃগণ! হোসেন পরিবারের প্রতি কেহ কোন প্রকার অত্যাচার করিয়ো না। সাবধান তাঁহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া কেহ কোন কথা মুখে আনিয়ো না। প্রত্যক্ষ প্রমাণ স্বচক্ষেই তো দেখিলে? কী অসীম সাহস! কী অসীম ক্ষমতা! কী আশ্চর্য! বিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেখ, ইঁহাদের এখনকার ভাবভঙ্গি-মনের ভাবগতিক বড় ভয়ানক! সাবধানে কথাবার্তা কহিবে। দেখ, ভাবটি সহজ ভাব নহে! দেখিলেই বোধ হয়, ইঁহারা সন্তোষসহকারে কোথায় যেন যাইতে ব্যগ্র হইয়াছেন। দুঃখের চিহ্নমাত্র নাই। বিয়োগ শোক, বেদনা, যন্ত্রণা ইঁহাদের অন্তরের বিন্দুপরিমাণ স্থানও যেন অধিকার করিতে পারে নাই। সকলের হাতেই এক-একখানি শাণিত অস্ত্র। তরবারি, খঞ্জর, কাটারি, ছোরা, যে যাহা পাইয়াছে লইয়াছে। ধন্য রে আরবীয় নারী! তোমরাই ধন্য! পতি-পুত্র বিয়োগ-বেদনা ভুলিয়া সমরসাজে শত্রুসম্মুখীন! ধন্য তোমরা! ভ্রাতাগণ! আমাদের বীরত্বে ধিক্! অস্ত্রে ধিক্! নারীহস্তে অস্ত্র দেখিয়া কি আর এ-সকল অস্ত্র ধরিতে ইচ্ছা করে? ইঁহারা আমাদের প্রতি অস্ত্র নিক্ষেপ করুন বা না-করুন, আমরা কিছুই বলিব না। ছি ছি! অবলা কুলস্ত্রীর সহিত যুদ্ধ করিতে অস্ত্রের ব্যবহার শিক্ষা করি নাই। ভ্রাতৃগণ! তোমরা আর কোন কথা বলিয়ো না, সকলেই স্ব-স্ব অস্ত্র কোষে আবদ্ধ কর। যাহা বলিবার আমিই বলিতেছি।”
মারওয়ান অবনতমস্তকে বলিতে লাগিলেন, “সাধ্বী সতী দেবিগণ! আমরা মহারাজ এজিদের আজ্ঞাবহ এবং চিরানুগত দাস। মহারাজের আদেশে আমরাই কারবালা ক্ষেত্রে হোসেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছিলাম। যুদ্ধ শেষ হইয়াছে। আমরা জয়লাভ করিয়াছি। আমরাই আপনাদের সুখতরী আজ মহারাজ এজিদের আদেশাস্ত্রে খণ্ড খণ্ড করিয়া বিষাদ-সিন্ধুতে ডুবাইয়াছি। আজিকার অস্ত্রের সহিত আপনাদের স্বাধীনতা-সূর্য একেবারে চির-অস্তমিত হইয়াছে। এখন আপনারা মহারাজ এজিদ-সৈন্য-হস্তে চির-বন্দি। বন্দির প্রতি অত্যাচার-অবিচার কাপুরুষের কার্য। বরং আপনাদের জীবন রক্ষার প্রতি সর্বদা আমাদের দৃষ্টি থাকিবে। ক্ষুৎপিপাসা নিবারণহেতু যদি কোন দ্রব্যের অভাব হইয়া থাকে, বলুন, আমি সে অভাব মোচন করিতে প্রস্তুত আছি।”
সকলেই নীরব! কাষ্ঠপুত্তলিকাবৎ নীরব! স্পন্দহীন জড়বৎ নীরব! অনিমেষে নীরব! কেবল অল্পবয়স্ক বালক-বালিকারা শুষ্ককণ্ঠে বলিয়া উঠিল, “জল! জল! জল! আমরা তোমাদের নিকট জল চাহি; দয়া করিয়া এক পাত্র জল দাও-”
মারওয়ান অতি অল্প সময়মধ্যে ফোরাতজলে অনেকের তৃষ্ণা-নিবারণ করিলেন। কিন্তু যাহাদের অন্তরে পতি-পুত্র-ভ্রাতা-বিয়োগজনিত শোকাগ্নি প্রচণ্ডবেগে হু-হু শব্দে জ্বলিতেছে-শরীরের প্রতি লোমকূপ হইতে সেই মহা-অগ্নির জ্বলন্ত শিখা মহাতেজে নির্গত হইয়া জীয়ন্ত জীবন জ্বালাইতেছিল, তাহাদের নিকট জলের আদর হইল না। ফোরাতজলে সে জ্বলন্ত আগুন নির্বাণ হইল না; বরং আরো সহস্রগুণ জ্বলিয়া উঠিল!
মারওয়ান একটু উচ্চৈঃস্বরে বলিতে লাগিলেন, “বন্দিগণ! শিবিরস্থ বন্দিগণ! প্রস্তুত হও। যুদ্ধাবসানে যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিতপক্ষকে রাখিবার বিধি নাই। প্রস্তুত হও, তোমরা মহারাজ এজিদের বন্দি-মারওয়ানের হস্তে; শীঘ্র প্রস্তুত হও। এখনই দামেস্ক যাইতে হইবে।”
উদ্ধার পর্ব ০২ প্রবাহ
রে পথিক! রে পাষাণহৃদয় পথিক! কী লোভে এত ত্রস্তে দৌড়িতেছ? কী আশায় খণ্ডিত শির বর্শার অগ্রভাগে বিদ্ধ করিয়া লইয়া যাইতেছ? এ শিরে-হায়! এ খণ্ডিত শিরে তোমার প্রয়োজন কি? সীমার! এ শিরে তোমার আবশ্যক কি? হোসেন তোমার কী করিয়াছিল? তুমি তো আর জয়নাবের রূপে মোহিত হইয়াছিলে না? জয়নাব ইমাম হাসানের স্ত্রী। হোসেনের শির তোমার বর্শাগ্রে কেন? তুমিই-বা সে শির লইয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে এত বেগে দৌড়াইতেছ কেন? যাইতেছই-বা কোথায়? সীমার! একটু দাঁড়াও। আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়া যাও! কার সাধ্য তোমার গমনে বাধা দেয়? কার ক্ষমতা তোমাকে কিছু বলে? একটু দাঁড়াও। এ শিরে তোমার স্বার্থ কি? খণ্ডিত শিরে প্রয়োজন কি? অর্থ? হায় রে অর্থ! হায় রে পাতকী অর্থ! তুই জগতের সকল অনর্থের মূল। জীবের জীবনের ধ্বংস, সম্পত্তির বিনাশ, পিতা-পুত্রে শত্রুতা, স্বামী-স্ত্রীতে মনোমালিন্য, ভ্রাতা-ভগ্নীতে কলহ, রাজা-প্রজায় বৈরীভাব, বন্ধু-বান্ধবে বিচ্ছেদ। বিবাদ, বিসম্বাদ, কলহ, বিরহ, বিসর্জন, বিনাশ, এ সকল তোমার জন্য। সকল অনর্থের মূল ও কারণই তুমি। তোমার কী মোহিনীশক্তি! কী মধুমাখা বিষসংযুক্ত প্রেম, রাজা, প্রজা, ধনী, নির্ধন, যুবক, বৃদ্ধ, সকলেই তোমার জন্য ব্যস্ত,-মহাব্যস্ত-প্রাণ ওষ্ঠাগত। তোমারই জন্য-কেবলমাত্র তোমারই কারণে-কত জনে তীর, তরবারি, বন্দুক, বর্শা, গোলাগুলি অকাতরে বক্ষ পাতিয়া বুকে ধরিতেছে। তোমারই জন্য অগাধ জলে ডুবিতেছে। ঘোর অরণ্যে প্রবেশ করিতেছে, পর্বতশিখরে আরোহণ করিতেছে, রক্ত, মাংসপেশী, পরমাণু সংযোজিত শরীর! ছলনে! তোমারই জন্য শূন্যে উড়াইতেছে। কী কুহক! কী মায়া!! কী মোহিনীশক্তি!!! তোমার কুহকে কে না পড়িতেছে? কে না ধোঁকা খাইতেছে? কে না মজিতেছে? তুমি দূর হও, তুমি দূর হও! কবির কল্পনার পথ হইতে একেবারে দূর হও। কবির চিন্তাধারা হইতে একেবারে সরিয়া যাও! তোমার নাম করিয়া কথা কহিতে অঙ্গ শিহরিয়া উঠে! তোমারই জন্য প্রভু হোসেন সীমারহস্তে খণ্ডিত।-রাক্ষসী! তোমারই জন্য খণ্ডিত শির বর্শাগ্রে বিদ্ধ।
