আবদুল্লাহ্ জেয়াদ, মারওয়ান, ওমর এবং আর-আর যোধগণ অশ্বের পশ্চাৎ পশ্চাৎ হোসেনশিবিরাভিমুখে বেগে ছুটিল। শিবিরমধ্যে বীর বলিতে আর কেহ নাই। একমাত্র জয়নাল আবেদীন। হোসেনের উপদেশক্রমে পরিজনেরা জয়নালকে বিশেষ সাবধানে গোপনভাবে রাখিয়াছেন। হাসনেবানু কাসেমদেহ বক্ষে ধারণ করিয়া শোকসন্তপ্তহৃদয়ের জ্বলন্ত হুতাশনে শোণিতের আহুতি দিতেছেন। সখিনা মৃত পতির পদপ্রান্তে ধুলায় লুটাইয়া অচেতনভাবে পড়িয়া রহিয়াছে! যিনি যেখানে যেভাবে ছিলেন, তিনি সেইখানে সেইভাবেই আছেন। কাহারো মুখে কোন কথা নাই। নীরব!-চতুর্দিক নীরব! কিন্তু আকাশ, পাতাল, বায়ু ভেদ করিয়া যে একটি রব হইতেছে, বোধ হয় শোক-তাপ-পিপাসায় কাতরতা-প্রযুক্ত এতক্ষণ কেহই সে রব শুনিতে পান নাই। সাহারবানুর মন, চক্ষু, কর্ণ, চিন্তা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে, ভিন্ন ভিন্ন দিকে। হঠাৎ শুনিলেন-অঙ্গ শিহরিয়া উঠিল। আবার শুনিলেন-স্পষ্ট শুনিলেন। বন, উপবন, গগন, বায়ু, পর্বত, প্রান্তর ভেদ করিয়া রব হইতেছে, “হায় হোসেন! হায় হোসেন!! হায় হোসেন!!!”
সাহারবানুর মোহতন্দ্রা ভাঙ্গিয়া গেল। হৃদয় কাঁপিয়া উঠিল, মুখে বলিয়া উঠিলেন, “হায়! এ কী হইল? কী ঘটিল? কে বলিতেছে? চতুর্দিক হইতে কেন রব হইতেছে? ও রব কেন হইতেছে? নাম উচ্চারণে কেন হায় হায় করিতেছে? হায়! হায়! কী নিদারুণ কথা? হায় রে আবার সেই রব! আবার সেই অন্তরভেদী হায়! হায় রব!!
“এ-কী কথা! যে সকল পবিত্র বসন, পবিত্র অস্ত্র পবিত্রভাবে ভক্তিসহকারে অঙ্গে ধারণ করিয়া গিয়াছেন, তাহাতে কী কোন সন্দেহ হইতে পারে? ঐ অশ্বপদশব্দ! কে শিবিরাভিমুখে আসিতেছে? কাহার অশ্ব? হায় রে! এ কাহার অশ্ব?” সাহারবানু শিবিরদ্বারদেশে যাইতেই রক্তমাখা শরীরে হোসেনের অশ্ব শিবিরে প্রবেশ করিল। “ভগ্নী! কপাল পুড়িয়াছে! আমাদের কপাল পুড়িয়াছে! দেখ অশ্ব দেখ, দুল্দুলের তীর-সংযুক্ত শরীর দেখ, রক্তের প্রবাহ দেখ।” বলিতে বলিতে সাহারবানু অচেতনভাবে ভূতলে পড়িয়া গেলেন। আর-আর পরিজনেরা শূন্যপৃষ্ঠ দুল্দুল্-সমস্ত শরীর রক্তে রঞ্জিত, আঘাতে-আঘাতে র্জর্জ এবং শোণিতের ধারা দেখিয়া, মর্মভেদী আর্তনাদ,-কেহ-বা হতচেতন অবস্থায় বিকট চিৎকার করিয়া, অচেতনভাবে ধরাশায়ী হইলেন। দুল্দুল্ কাঁপিতে কাঁপিতে মাটিতে পড়িয়া গেল। হোসেনের প্রিয়তম অশ্বপ্রাণ বায়ুর সহিত মিশিয়া অনন্ত আকাশে চলিয়া গেল।
এদিকে মারওয়ান, ওমর, অলীদ, জেয়াদ প্রভৃতি যোধগণ উগ্রমূর্তিতে, বিকট শব্দে “কই জয়নাল? কোথা সখিনা?” নাম উচ্চারণ করিতে করিতে শিবিরমধ্যে প্রবেশ করিল। কিন্তু দক্ষিণে, বামে, সম্মুখে কিঞ্চিৎ দূরে দৃষ্টি পড়িবামাত্র তাহাদের শরীর হঠাৎ শিহরিয়া উঠিল, বীরহৃদয় কাঁপিয়া গেল। ভয়ের সঞ্চার হইল।-কী মর্মভেদী দৃশ্য!
বীরবল আবদুল ওহাবের খণ্ডিত দেহ, কাসেমের মৃত্যুশয্যা, হোসেনের অশ্ব ও পতিপ্রাণা সখিনার পতিভক্তির চিহ্ন দেখিয়া বীরগণ স্তম্ভিতভাবে দণ্ডায়মান রহিলেন। মন্ত্রীপ্রবর মারওয়ান একদৃষ্টে সখিনার প্রতি অনেকক্ষণ পর্যন্ত চাহিয়া মৃত-কি-জীবিত কিছুই নির্ণয় করিতে পারিল না। কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া দেখিল, সখিনাবিবি স্বামী-পদ দু’খানি বক্ষোপরি স্থাপন করিয়া মন-প্রাণ যেন ঈশ্বরে ঢালিয়া দিয়া আত্মসমর্পণ করিয়াছেন। পতি-দেহ বিনির্গত পবিত্র শোণিতে পবিত্র দেহ রঞ্জিত হইয়া অপূর্ব শ্রী ধারণ করিয়াছে। মৃত দেহে চন্দন, আতর ও কর্পূরের ব্যবস্থা আছে। সখিনার অঙ্গ রক্তচন্দনে চর্চিত হইয়া জীবন্তভাবে যেন দয়াময়ের নিকট স্বামীর মঙ্গলকামনায় আত্মবিসর্জন করিয়া রহিয়াছে।
মারওয়ান আরো একটু অগ্রসর হইল। সখিনাকে ধরিয়া তুলিবে, আশা করিয়া হস্ত বিস্তার করিতেই, যেন মৃত শরীরে হঠাৎ জীবাত্মার সঞ্চার হইল। যেন স্বর্গীয় দূত জিবরাইল মর্তে আসিয়া সখিনার কানে কানে বলিয়া গেলেন, “সখিনা! তুমি না সাধ্বী, সতী? পরপুরুষ তোমার অঙ্গ স্পর্শ করিতে উদ্যত, এখনো স্বামী-চিন্তা! এখনো স্বামী-শোক! অবলা-অবয়ব পরপুরুষের চক্ষে পড়িলে মহাপাপ। নিজে ইচ্ছা করিয়া দেখাইলে আরো পাপ! তুমি বীরদুহিতা, বীরজায়া। ছি ছি, সখিনা! তোমার এতো ভ্রম! ছি ছি! সাবধান হও!”
সখিনা ত্রস্তভাবে উঠিয়া বসিলেন। সম্মুখে চাহিতেই দেখিলেন, অপরিচিত যোধ-সকল চারিদিকে ছুটোছুটি করিতেছে, যে যাহা পাইতেছে লইতেছে। হঠাৎ দুল্দুলের প্রতি দৃষ্টি পড়িল। হজরত ইমাম হোসেনের প্রিয় অশ্ব দুল্দুল্ মৃত্তিকায় শায়িত, সমুদয় অঙ্গে তীক্ষ্ণতর তীরবিদ্ধ, তীর-সকল অশ্বশরীর বিদ্ধ করিয়া কতক মৃত্তিকাসংলগ্ন কতক শরীরোপরি পড়িয়া রহিয়াছে। প্রতি শরের মুখ হইতে শোণিতধারা ছুটিয়া,-শ্বেত অশ্ব ঘোর লোহিতে র িত হইয়াছে! সখিনা একদৃষ্টে অশ্বের প্রতি চাহিয়া রহিলেন। পূর্বকথা স্মরণ হইল। চক্ষু ঊর্ধ্বে উঠিল, মুখভাব ভিন্ন ভাব ধারণ করিল। সজোরে কাসেমের কটিদেশ হইতে খঞ্জর লইয়া মহারোষে বলিতে লাগিলেন,-
“ওরে! কাফেরগণ! বুঝিয়াছি, সেই সাহসে শিবিরে আসিয়াছিস্? সেই সাহসে অত্যাচার করিতে আসিয়াছিস্? ওরে! আমরা অসহায়া হইয়াছি, সেই সাহসে? আমরা নিরাশ্রয়া, ওরে! সেই সাহসে? পুরুষ বীর আর কেহ নাই, ওরে নরাধমেরা সেই সাহসে? ভুলিলাম! ভুলিলাম! এখন প্রাণসখা কাসেমকে ভুলিলাম! ভুলিলাম কাসেম! তোমায় এখন ভুলিলাম! নারীজীবনের উদ্দেশ্য দেখাইতে তোমাকে এখন ভুলিলাম! কাসেম! ঐ পিতার অশ্ব, সমুদয় অঙ্গে তীরবিদ্ধ। রক্তে রঞ্জিত, মৃত্তিকায় শায়িত। আর কথা কী? আর আশা কী? এখন সখিনার আর আশা কি? কাসেম চাহিয়া দেখ! প্রাণাধিক কাসেম! দেখ চাহিয়া, এই দেখ সখিনার হাতে তোমার খঞ্জর!!”
