সীমার অবিশ্রান্ত যাইতেছে। দিনমণি মলিনমুখ, অস্তাচল গমনে উদ্যোগী। সীমারের অন্তরে নানা ভাব; তন্মধ্যে অর্থ-চিন্তাই প্রবল; চির-অভাবগুলি আশু মোচন করাই স্থির। একাই মারিয়াছি, একাই কাটিয়াছি, একাই যাইতেছি, একাই পাইব, আর ভাবনা কী? লক্ষ টাকার অধিকারীই আমি। চিন্তার কোন কারণই নাই। নিশাও প্রায় সমাগত। যাই কোথা? বিশ্রাম না করিলেও আর বাঁচি না। নিকটস্থ পল্লীতে কোন গৃহীর আবাসে যাইয়া নিশাযাপন করি। এ তো সকলই মহারাজ এজিদ্ নামদারের রাজ্যভুক্ত, অধীন ও অন্তর্গত। সৈনিক বেশ, হস্তে বর্শা, বর্শাগ্রে মনুষ্যশির বিদ্ধ, ভয়ানক রোষের লক্ষণ। কে কী বলিবে? কার সাধ্য-কে কী করিবে?
সীমার এক গৃহীর আশ্রমে উপস্থিত হইয়া ঐ স্থানে নিশাযাপন করিবেন জানাইলেন। বর্শাবিদ্ধ খণ্ডিত শির অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত বুঝি রাজসংক্রান্ত কেহ-বা হয় মনে করিয়া গৃহস্বামী আর কোন কথা বলিলেন না। সাদরে সীমারকে স্থান নির্দেশ করিয়া দিলেন, পথশ্রান্তি দূরীকরণের উপকরণ আদি ও আহারীয় দ্রব্যসামগ্রী আনিয়া ভক্তিসহকারে আতিথ্য-সেবা করিলেন। ক্ষণকাল বিশ্রামের পর অতি বিনীতভাবে বলিলেন, “মহাশয়! যদি অনুমতি করেন, তবে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি।”
সীমার বলিল- “কি কথা?”
“কথা আর কিছু নহে, আপনি কোথা হইতে আসিতেছেন? আর এই বর্শা-বিদ্ধ-শির কোন্ মহাপুরুষের?”
“ইহার অনেক কথা। তবে তোমাকে অতি সংক্ষেপে বলিতেছি। মদিনার রাজা হোসেন, যাঁহার পিতা আলী এবং মোহাম্মদের কন্যা ফাতেমা যাঁহার জননী, এ তাঁহারই শির। কার্বালা প্রান্তরে, মহারাজ এজিদ্-প্রেরিত সৈন্য সহিত সমরে পরাস্ত হইয়া এই অবস্থা। দেহ হইতে মস্তক ভিন্ন করিয়া মহারাজের নিকট লইয়া যাইতেছি, পুরস্কার পাইব। লক্ষ টাকা পুরস্কার। তুমি পৌত্তলিক, তোমার গৃহে নানা দেবদেবীর প্রতিমূর্তি আছে দেখিয়াই আতিথ্য গ্রহণ করিয়াছি। মোহাম্মদের শিষ্য হইলে কখনো তোমার গৃহে আসিতাম না। তোমার আদর-অভ্যর্থনাতেও ভুলিতাম না, তোমার আহারও গ্রহণ করিতাম না।”
“হাঁ, এতক্ষণে জানিলাম, আপনি কে? আর আপনার অনুমানও মিথ্যা নহে। আমি একেশ্বরবাদী নহি। নানা প্রকার দেব-দেবীই আমার উপাস্য। আপনি মহারাজ এজিদের প্রিয় সৈন্য, আমার অপরাধ গ্রহণ করিবেন না। স্বচ্ছন্দে বিশ্রাম করুন। কিন্তু বর্শা-বিদ্ধ-শির এ প্রকারে না রাখিয়া আমার নিকটে দিলে ভাল হইত। আমি আজ রাত্রে আপন তত্ত্বাবধানে রাখিতাম। প্রাতে আপনি যথা ইচ্ছা গমন করিতেন। কারণ যদি কোন শত্রু আপনার অনুসরণে আসিয়া থাকে, নিশীথ সময়ে কৌশলে কি বলপ্রয়োগে এই মহামূল্য শির আপনার নিকট হইতে কাড়িয়া লয়, কি আপনার ক্লান্তিজনিত অবশ অলসে, ঘোর নিদ্রায় অচেতন হইলে আপনার অজ্ঞাতে এই মহামূল্য শির,-আপাততঃ যাহার মূল্য লক্ষ টাকা-যদি কেহ লইয়া যায়, তবে মহাদুঃখের কারণ হইবে, আমাকে দিন, আমি সাবধানে রাখিব, আপনি প্রত্যূষে লইবেন। আমার তত্ত্বাবধানে রাখিলে আপনি নিশ্চিন্তভাবে নিদ্রাসুখ অনুভব করিতে পারিবেন।”
সীমারের কর্ণে কথাগুলি বড়ই মিষ্ট বোধ হইল। আর দ্বিরুক্তি না করিয়া প্রস্তাব শ্রবণমাত্রেই সম্মত হইল। গৃহস্বামী হোসেন-মস্তক সম্মানের সহিত মস্তকে লইয়া বহুসমাদরে গৃহমধ্যে রাখিয়া দিল। পথশ্রান্তিহেতু সীমারের কেবল শয়ন বিলম্ব; যেমনই শয়ন অমনই অচেতন।
গৃহস্বামী বাস্তবিক হজরত মোহাম্মদ মোস্তফার শিষ্য ছিলেন না। নানা প্রকার দেব-দেবীর আরাধনাতেই সর্বদা রত থাকিতেন। উপযুক্ত তিন পুত্র এবং এক স্ত্রী। নাম, “আজর।” (হজরত ইব্রাহিম খলিলুল্লার পিতার নামও আজর বোত্পরস্ত ছিল। ইনি সে আজর নহেন।)
সীমারের নিদ্রার ভাব জানিয়া, আজর স্ত্রীপুত্রসহ হোসেনের মস্তক ঘিরিয়া বসিলেন এবং আদ্যন্ত সমুদয় ঘটনা বলিলেন!
যে ঘটনায় পশুপক্ষীর চক্ষের জল ঝরিতেছে, প্রকৃতির অন্তর ফাটিয়া যাইতেছে, সেই দেহ-বিচ্ছিন্ন হোসেন-মস্তক দেখিয়া কাহার হৃদয়ে না আঘাত লাগে? দেব-দেবীর উপাসক হউন, ইসলাম ধর্মবিদ্বেষীই হউন, এ নিদারুণ দুঃখের কথা শুনিলে কে না ব্যথিত হউন? পিতাপুত্র সকলে একত্র হইয়া হোসেন-শোকে কাঁদিতে লাগিলেন।
আজর বলিলেন, “মনুষ্যমাত্রেই এক উপকরণে গঠিত এবং এক ঈশ্বরের সৃষ্ট। জাতিভেদ, ধর্মভেদ, সে-ও সর্বশক্তিমান ভগবানের লীলা। ইহাতে পরস্পর হিংসা, দ্বেষ, ঘৃণা, কেবল মূঢ়তার লক্ষণ! ইমাম হাসান-হোসেনের প্রতি এজিদ্ যেরূপ অত্যাচার করিয়াছে, তাহা মনে করিলে হৃদয়মাত্রেরই তন্ত্রী ছিঁড়িয়া যায়। সে দুঃখের কথায় কোন্ চক্ষু না জলে পরিপূর্ণ হয়? মানুষের প্রতি এরূপ ঘোরতর অত্যাচার হউক আর না-হউক, জাতীয় জীবন বলিয়াও কী প্রাণে আঘাত লাগে না? সাধু পরম ধার্মিক, বিশেষ ঈশ্বরভক্ত, মহাপুরুষ মোহাম্মদের হৃদয়ের অংশ, ইঁহাদের এই দশা? হায়! হায়!! সামান্য পশু মারিলে কত মানুষ কাঁদিয়া গড়াগড়ি যায়-বেদনায় অস্থির হয়, আর মানুষের জন্য মানুষ কাঁদিবে না! ধর্মের বিভেদ বলিয়া, মানুষের বিয়োগে মানুষ মনোবেদনায় বেদনা বোধ করিবে না? যন্ত্রণা অনুভব করিবে না? যে ধর্মই কেন হউক না, পবিত্রতা রক্ষা করিতে, তৎকার্যে যোগ দিতে কে নিবারণ করিবে? মহাপুরুষ মোহাম্মদ পবিত্র, হাসান পবিত্র, হোসেনের মস্তক পবিত্র, সেই পবিত্র মস্তকের এত অবমাননা? যুদ্ধে হত হইয়াছে বলিয়াই কী এত তাচ্ছিল্য? জগৎ কয় দিনের? এজিদ্! তুই কী জগতে অমর হইয়াছিস্? জীবনশূন্য দেহের সদ্গগতির সংবাদ শুনিয়া কী তোর চির-জ্বলন্ত রোষাগ্নি নির্বাণ হইত না? তোর আকাক্সক্ষা কি যুদ্ধ-জয়ের সংবাদ শুনিয়া মিটিত না? হোসেনপরিবারের মহা ক্রন্দনের রোল সপ্ততল আকাশ ভেদ করিয়া অনন্তধামে অনন্তরূপে প্রবেশ করিয়া অনন্ত শোক বিকাশ করিতেছে! ঈশ্বরের আসন টলিতেছে!-তোর মন কী এতই কঠিন যে জীবনশূন্য শরীরে শত্রুতা সাধন করিতে ত্রুটি করিতেছিস্ না! তোকে কোন্ ঈশ্বর গড়িয়াছিল জানি না; কী উপকরণে তোর শরীর গঠিত, তাহাও বলিতে পারি না। তুই সামান্য লোভের বশবর্তী হইয়া কী কাণ্ড করিলি! তোর এই অমানুষিক কীর্তিতে জগৎ কাঁদিবে, পাষাণ গলিবে! এই মহাপুরুষ জীবিত থাকিলে এই মুখে কত শত প্রকারে ঈশ্বরের গুণ-কীর্তন-কত কাল ঈশ্বরের মহত্ত্ব প্রকাশ হইত, তাহার কী ইয়ত্তা আছে? তুই অসময়ে মহাঋষি হোসেনের প্রাণহরণ করিয়াছিস্, কিন্তু তোর পিতা ইমাম বংশের ভিন্ন নহেন; তাঁহার হৃদয় এমন কঠিন প্রস্তরে গঠিত ছিল না! তাঁহার ঔরসে জন্মিয়া তোর এ কি ভাব? রক্ত, মাংস, বীর্যগুণ আজ তোর নিকট পরাস্ত হইল। মানব শরীরের স্বাভাবিক গুণ আজ বিপরীত ভাব ধারণ করিল। তাই যাহাই হউক, আজরের এই প্রতিজ্ঞা-জীবন থাকিতে হোসেন-শির দামেস্কে লইয়া যাইতে দিবে না; যত্নের সহিত, আদরের সহিত, ভক্তিসহকারে সে মহাপ্রান্তর কারবালায় লইয়া যাইয়া, শিরশূন্য দেহের সন্ধান করিয়া সদ্গগতির উপায় করিবে; প্রাণ থাকিতে এ শির আজর ছাড়িবে না।”
