তাহার মনে ধারণাই এই যে, যাঁহার শরীরের শোণিতে আমার জীবন রক্ষা হইয়াছে, দেহ বৃদ্ধি হইয়াছে, যাঁহার স্নেহ-মমতা অনুগ্রহে এত বড় হইয়াছি, তিনিই আমার সর্বস্ব-তিনিই আমার পূজনীয়া, তিনিই আমার মুক্তিদাত্রী মাতা,-মাতাই আমার সম্বল-মাতাই আমার বল। হারেস-জায়া নিশীথ সময়ে দুই পুত্রকে চুপি চুপি ডাকিয়া আনিয়া অন্য কক্ষে অতি নির্জন স্থানে দুই পুত্রকে সম্মুখে করিয়া বসিলেন।
পালকপুত্রকে বলিলেন, “বাবা! তুই আমার পেটে না জন্মিলেও আমি তোকে আমার বুকের দুধ দিয়া প্রতিপালন করিয়াছি। কত মল-মূত্র দুই হাতে পরিষ্কার করিয়া তোকে বাঁচাইয়াছি। বাবা! তুই আমার শরীরের সার অংশ দ্বারা প্রতিপালিত হইয়াছিস্। আমার শরীরের রক্ত অংশে তোর দেহপুষ্টি হইয়াছে।” আপন গর্ভজাত সন্তানের হস্ত ধরিয়া বলিলেন, “বাবা! তোতে আর এতে ভিন্ন কী? অতি সামান্য! সেই সামান্য অংশটুকু ছাড়িয়া দিলে-তুইও যেমন, (পালকপুত্রের হস্ত ধরিয়া-) এও তেমনই। পরিচারিকাকে যে কথা বলিতে বলিয়াছিলাম, তোমাদের দুই জনকে একত্র বসাইয়া সে তাহা বলিয়াছে। তোমরা সকলই শুনিয়াছ। এখন সেই বালক দুইটির রক্ষার উপায় কি? আমি ভাবিয়াছিলাম তোমাদের পিতা বাটী আসিলে, ছেলে দুইটির কথা বলিব। তিনি কতই দুঃখ করিবেন। ছেলে দুইটির রক্ষার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিবেন। এখন দেখিতেছি, তিনিই তাহাদের সংহারক, তিনিই তাহাদের প্রাণনাশক-প্রধান শত্রু। মোহরের লোভে তিনি বালক দুইটিকে ধরিবার জন্য বহু চেষ্টা-বহু পরিশ্রম করিয়াছেন। নিদ্রা হইতে উড়িয়া এই রাত্রিতেই পুনরায় তাহাদের অন্বেষণে ছুটিবেন। তিনি যদি বালক দুইটির সন্ধান পান, তাহা হইলে আর রক্ষা নাই। কিছুতেই তাহারা দুরন্ত বাঘের মুখ হইতে রক্ষা পাইবে না-বাঁচিবে না। এক্ষনে তোমরাই আমার সহায়-সম্বল। তোমরা দুই ভাই যদি আমার সহায়তা কর, তোমরা দুই ভাই যদি আমার পক্ষে থাকিয়া পিতৃহীন বালক দুটির রক্ষ্রর জন্য চেষ্টা কর-তবে তাহারা বাঁচিতে পারে। তোমাদের পিতার চক্ষে পড়িলে আর কিছুতেই রক্ষা পাইবে না।”
দুই ভাই বলিল, “মাতঃ! আপনি ব্যস্ত হইবেন না। আমরা সকলই শুনিয়াছি-বালকদ্বয়ের অবস্থা সকলই শুনিয়াছি, আমাদের বাটীতেই আছে তাহাও জানিয়াছি! আপনি অত উতলা হইবেন না। পিতা গুরুজন, তাঁহার নিন্দা করিব না। আমরা তাঁহার অর্থলালসার কথা শুনিয়া বড়ই দুঃখিত হইয়াছি,-আক্ষেপ করিয়াছি। কি করি, পিতা গুরুজন, তাঁহার কথার প্রতিবাদ করাই মহাপাপ; যাহাই হউক, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন; রাত্রি দ্বিপ্রহর অতীত হইলেই আমরা দুই ভাই, বালকদ্বয়কে সঙ্গে করিয়া মদিনায় যাইব। যদি সুবিধা করিতে পারি ভালই, না করিতে পারি, আমরা সঙ্গে করিয়া লইয়া মদিনায় রাখিয়া আসিব।”
গৃহিণী সন্তুষ্টচিত্তে অথচ চক্ষুজলে ভাসিতে ভাসিতে দুই পুত্রের দুই হাত দুই হাতে ধরিয়া আপন মাথার উপর রাখিয়া বলিলেন, “বাবা, তোরা আমার মাথার উপর হাত রাখিয়া বল যে, আমরা সাধ্যানুসারে বালকদ্বয়কে রা করিব।”
পুত্রদ্বয় অকপটচিত্তে স্বীকার করিল, আর বলিল, “মাতঃ! আপনি নিশ্চয় জানিবেন বালকদ্বয়ের অনিষ্ট সম্বন্ধে আমাদের পিতার কোন কথা আমরা শুনিব না; বরং তাঁহার বিরোধী হইব। আপনার আদেশ-আপনার আজ্ঞা পালন করিতে যদি আমাদের প্রাণও যায় তত্রাচ আপনার আদেশের অন্যথা করিব না, কি পশ্চাৎপদ হইব না।”
দুই পুত্র লইয়া গৃহিণী অন্য গৃহে পরামর্শ করিতেছেন। অন্য কক্ষে অতি নির্জন স্থানে ভ্রাতৃদ্বয় শুইয়া আছে। ভিন্ন আর এক কক্ষে হারেস শুইয়াছেন। ঈশ্বরের মহিমার অন্ত নাই। মোহাম্মদ ও এব্রাহিম, নির্জন কে নিদ্রায় ছিলেন, হঠাৎ মোহাম্মদ জাগিয়া ক্রন্দন করিতে করিতে এব্রাহিমকে জাগাইয়া বলিল, “ভাইরে, আর ঘুমাইও না। শুন-স্বপ্নবিবরণ শুন। এখনই পিতাকে স্বপ্নে দেখিলাম। শুন, অতি আশ্চর্য স্বপ্ন।”
“স্বপ্নে দেখিলাম-আকাশের দ্বার হঠাৎ খুলিয়া গেল। স্বর্গীয় সৌরভে জগৎ আমোদিত ও মোহিত হইল। দেখিলাম, স্বর্গীয় উদ্যানে হজরত মোহাম্মদ রসুল মকবুল (দ.), হজরত আলী (ক.), হজরত বিবি ফাতেমা জোহ্রা এবং হজরত ‘হাসন-উদ্যানে ভ্রমণ করিতেছেন। পিতৃদেব তাঁহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ বেড়াইতেছেন। আমরা দুই ভ্রাতা দূরে দাঁড়াইয়া আছি। ইতিমধ্যে হজরত রসুল মকবুল, আমাদের পিতৃদেবকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, ‘মোস্লেম! তুমি চলিয়া আসিলে, আর তোমার দুইটি পুত্রকে জালেমের হস্তে রাখিয়া আসিলে?’ পিতৃদেব করজোড়ে নিবেদন করিলেন, “হজরত! এলাহির কৃপায় তাহারাও ‘ইনশাআল্লাহ্’ আগামীকল্য পবিত্র পদচুম্বনের জন্য আসিবে।”
এব্রাহিম বলিল, “ভাই! আমিও ঐ স্বপ্ন দেখিয়াছি! আর চিন্তা কি? রাত্রি প্রভাতেই আমরা পিতৃদেবের নিকট যাইব। এস ভাই, এইক্ষণে দুই ভাই গলাগলি করিয়া একবার শয়ন করি। জগতের নিদ্রার আজ শেষ নিদ্রা, নিশিরও শেষ। আমাদের পরমায়ুরও শেষ! এস ভাই, এস! গলাগলি করিয়া একবার শয়ন করি।” দুই ভাই এই বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিয়া উঠিতেই, পাপমতি হারেসের নিদ্রাভঙ্গ হইল। অতি ত্রস্তে শয্যা ত্যাগ করিয়া স্ত্রীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “আমার বাড়িতে বালকের ক্রন্দন? কাহার ক্রন্দন! কোথায় তাহারা? কোথা হইতে তাহারা আসিয়াছে? কে তাহাদিগকে তোমার নিকট আনিয়া দিল? শীঘ্র-শীঘ্র প্রদীপ জ্বালিয়া আন। আর যাহারা কাঁদিতেছে, তাহাদিগকেও আমার সম্মুখে লইয়া আইস।”
