হারেস-জায়া নীরব। কারণ দুর্দান্ত স্বামীর নিদ্রাভঙ্গ। প্রদীপ জ্বালিতে আদেশ। ‘যাহারা কাঁদিতেছে, তাহাদিগকে আমার সম্মুখে আনয়ন কর’-এই সকল কথায় সতী-সাধ্বী দয়াবতীর প্রাণপাখি যেন দেহপিঞ্জর হইতে উড়ি-উড়ি ভাব করিতে লাগিল। কী করিবেন, কোথা যাইবেন-কিছুই বোধ নাই-জ্ঞান নাই-নীরব। হারেস গৃহিণীর এইরূপ ভাব দেখিয়া অবাক্ হইলেন। এ কী? এ এরূপ হইল কেন? হারেস জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমার এ কী ভাব হইল?” কোন উত্তর নাই। নির্বাকে একেবারে স্বামীর মুখপানে চাহিয়া রহিলেন। হারেস স্ত্রীর এইরূপ অন্যমনস্ক ভাব দেখিতে পাইয়া নিজেই প্রদীপ জ্বালিয়া যে গৃহ হইতে ক্রন্দনের শব্দ আসিতেছিল সন্ধান করিয়া প্রদীপহস্তে সেই গৃহে প্রবেশ করিলেন। দেখিলেন, দুইটি বালক গলাগলি করিয়া শুইয়া কাঁদিতেছে। হারেস দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইলেন। অস্ফুটস্বরে বলিলেন, “এ কাহারা? আমার বাড়ির নির্জন স্থানে পরম রূপবান দুইটি বালক শয়নাবস্থায় কাঁদে কেন?” হারেস কর্কশভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোরা কে? কাঁদছিস্ কেন? শীঘ্র বল্-কে তোরা?”
বালকদ্বয় সভয়ে উত্তর করিল, “আমরা হজরত মোস্লেমের পুত্র।” হারেস নিকটে যাইয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিতে লাগিল, “মোস্লেমের পুত্র! তোরাই মোস্লেমের পুত্র! আমি কী আহাম্মক-কী পাগল! ঘরে শিকার রাখিয়া জঙ্গলে ঘুরিতেছি! কী পাগলামি! যাক্, যাহা হইবার হইয়াছে। আমার অদৃষ্টজোরেই ঘরে আসিয়াছে। পঞ্চ হাজার মোহর পায় হাঁটিয়া আমার নির্জন ঘরে আসিয়া রহিয়াছে। এখন কী করি! রাত্রি প্রভাত হইতে অনেক বিলম্ব। আর যাইবে কোথা!” এই বলিয়া দুই ভ্রাতার জোলফে জোলফে বন্ধন করিলেন। চুলে টান পড়ায় দুই ভাই কাঁদিয়া উঠিতেই হারেস-নির্দয় হারেস উভয় ভ্রাতার সুললিত কোমল গণ্ডে সজোরে চপেটাঘাত করিয়া বলিল, “চুপ! চুপ! কাঁদবি তো এখনই মাথা কেটে ফেল্বো।”
বলিতে বলিতে দুই ভ্রাতার হস্ত বন্ধন করিয়া, দ্বারে জিঞ্জির লাগাইয়া দ্বার ঘেঁষিয়া শয্যা পাতিয়া তরবারিহস্তে বসিয়া রহিলেন। স্বগতঃ বলিতে লাগিলেন, “আর ঘুমাইব না। আর কী-হোঃ হোঃ! আর কী, প্রভাতেই মোহরের তোড়া, মোহরের ঝনঝন্,-এইবার সুখের সীমা কতদূর দেখিয়া লইব।”
গৃহিণী কাঁদিতে কাঁদিতে স্বামীর পা দুখানি ধরিয়া বলিলেন, “ছেলে দুটির প্রতি দয়া কর।” হারেস বলিলেন, “দয়া তো করিবই, রাত্রিটা আছে বলে দয়া দেখিতে পাইতেছ না। একটু পরেই দয়া-মায়া সকলই দেখিবে।”
“দেখ, তুমি আমার স্বামী। তোমার পায়ের উপর মাথা রাখিয়া বলিতেছি ছেলে দুইটির প্রতি কোনরূপ অত্যাচার করিয়ো না। এতিমের উপর কোনরূপ কর্কশ ব্যবহার করিতে নাই। ছেলে দুটির প্রতি দয়া কর। টাকা কয় দিন থাকিবে?”
হারেস স্ত্রীর মাথায় পদাঘাত করিয়া বলিল, “দূর হ!হতভাগিনী, দূর হ! আমার সম্মুখে হতে দূর হ! তোকে কী করিব? তুই চলে যা-তোর কথাই শুনিব কি-না? পাঁচ হাজার মোহর লক্ষ্মীর কথায়, বুড়ী রূপসীর মায়া কান্নায় ছাড়িয়া দিব? এ তো আমার ঘরে তোলা টাকা। দেখ! ফিরে আমার বিছানার নিকট আস্বি কি মাথা মাটিতে গড়াইয়া দিব। তোরা সকলে ভেবেছিস্ কী? আমার চক্ষে ঘুম নাই। তোদের চক্ষে ঘুম নাই। আর তোরা কখনোই একথা মনে করিস্ না যে, মোস্লেমের দুই পুত্র আমার হাতছাড়া হইয়া মোহরগুলি হাতছাড়া হইবে, তাহা হইবে না। আর তোরা যা ভাবছিস্ তাহাও হইবে না। আমি নিশ্চয় বুঝিয়াছি, মোস্লৈমের দুই পুত্রকে জীবন্ত ভাবে, মহারাজ জেয়াদের দরবারে লইয়া যাইতে আমার মত লোকের সাধ্য নাই। পথে বাহির হইলেই, চারিদিক্ হইতে পুরস্কারলোভী গুণ্ডার দল বালক দুটিকে জোর করিয়া লইয়া যাইবে। কী অন্যায় কথা! ধরিলাম আমি, পুরস্কার পাইব আমি। তাহা না হইয়া যার বল বেশি সেই বলপূর্বক লইয়া মহারাজ জেয়াদ্-দরবারে উপস্থিত করিয়া বিজ্ঞাপিত পুরস্কার লইবে। টাকার লোভ বড় শক্ত লোভ। আমি সে সকল ভবিষ্যৎ আশঙ্কার মধ্যেই যাইব না। রাত্রি প্রভাত হইলেই মোস্লেম-পুত্রদ্বয়ের শুধু মস্তক লইয়া রাজদরবারে উপস্থিত করিব। তাহাতেই আশা, পূর্ণ কার্যসিদ্ধি। মহারাজ অধিক পরিমাণে সন্তুষ্ট হইবেন।”
স্ত্রীকে সম্বোধন করিয়া হারেস বলিলেন, “তুই স্ত্রীলোক। ওরে তুই কী বুঝিবি? এ সকল উপার্জনের অঙ্গ তুই কী বুঝিবি রে? ছেলে দুটিও দেখ্ছি ওদের পাগলী মায়ের কথায় পাগল হইয়াছে। আমার চক্ষে ঘুম নাই। তোমাদের চক্ষে ঘুম নাই? যা যা, তোরা বিছানায় যা!”
এদিকে রাত্রি প্রভাত সংবাদ, কুক্কুট দল সপ্তস্বরে কুফা নগরকে জাগ্রত করিতে লাগিল। হারেস প্রত্যূষে উঠিয়াই, মোস্লেমের পুত্রদ্বয়কে বন্ধন করিয়া ঘোড়ার পিঠে চাপাইয়া, সু-ধার তরবারি ও ঘোড়ার বাগডোর হস্তে ধরিয়া ফোরাত নদীতীরে যাইতে লাগিল। হারেসের দুই পুত্রও তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ দৌড়িল। গৃহিণীও কাঁদিতে কাঁদিতে অশ্ব-পশ্চাতে মাথায় ঘা মারিতে মারিতে ছুটিলেন। গৃহিণীও দুই পুত্রসহ গোপনে পরামর্শ করিয়াছেন, যে উপায়ে হয় তাঁহারা তিনজনে একত্রে বালক দুটিকে রক্ষা করিবেন, উপস্থিত যমের হস্ত হইতে রক্ষা করিবেন। পুত্রদ্বয় মাতার পদস্পর্শ করিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, দেহে প্রাণ থাকিতে আমাদের দুই ভ্রাতার শির স্কন্ধে থাকিতে, মোস্লেম পুত্রদ্বয়ের শির দেহ-বিচ্ছিন্ন হইতে দিব না। দৌড়িতে দৌড়িতে সকলেই ফোরাতনদী তীরে উপস্থিত হইলেন।
