“তুমি বুঝিবে কি? যাহার শরীর কিছুতেই সমানভাবে ঢাকে না হাজার ঢাক, হাজার বেড় দাও-অসমান থাকিবেই থাকিবে। তুমি জগৎ সংসারের কি বুঝিবে? তুমি বোঝ-প্রথম অলঙ্কার, তাহার পর টাকা পয়সা, তাহার পর স্বামীকে একহাতে রাখা। আর কি বোঝ? ছেলে হল মোস্লেমের, মাথা কাটিবে জেয়াদ্, তাহাতে তোমার চক্ষে জল আসে কেন? পরের ছেলে পরে কাটিবে আমাদের কি? রাজা জেয়াদ্ মোস্লেমকে প্রাণে মারিয়াছে, তাহার ছেলে দুটাকেও মারিয়া ফেলুক, ছেলের মাকে ধরিয়া আনিয়া হয় প্রাণে মারুক,-না হয় ভালবাসিয়া, রাণী করিয়া অন্তঃপুরে রাখুক,-তোমার আমার কি? মাঝখানে আমার পাঁচটি হাজার মোহর লাভ হইবে। এ কার্যে চেষ্টা করিব না? তোমার অঞ্চল ধরিয়া-চেনা নাই, জানা নাই, মোস্লেমের জন্য-তাহার দুইটি পুত্রের জন্য কাঁদিতে থাকিব? এইরূপ বুদ্ধি আমার হইলে আর চাই কী?-সংসার টন্টনে-কসা।-একেবারে কাবার। শুন কথা! ছেলে দুইটা যা’র চক্ষে পড়বে সেই ধরবে। ধরলেও নিশ্চিন্ত নহে। বিঘ্ন বাধা অনেক। কত লোক ছুটাছুটি করিতেছে। কত গুণ্ডা ঐ খোঁজে বাহির হইয়াছে। কার হাত থেকে কে কাড়িয়া লইয়া বাদশার দরবারে দাখিল করিবে-তাহা কে জানে? ধরিতে পারিলেও কৃতকার্যের আশা অতি কম। যাহা হউক, শুন আমার মনের কথা। যদি ছেলে দুটিকে হাতে পাই-আর নিরাপদে জেয়াদ-দরবারে লইয়া যাইতে পারি-আর তোমার ভাল হউক-যদি পঞ্চজাহার মোহর পাই, তিন হাজার মোহর ভাঙ্গিয়া মাথা হইতে পা পর্যন্ত, আবার পা হইতে মাথা পর্যন্ত ডবল পেচে সোনা দিয়া তোমার এই সন্দুর দেহখানি মোড়াইয়া জড়াইয়া দিব। দেখ তো এখন লাভ কত?”
গৃহিণী অতিশয় বিষাদভাবে স্বামীর মুখ চোখপানে চাহিয়া বলিতে লাগিলেন, “দেখ! আমি তোমার কথায় বাদ প্রতিবাদ করিব না। বাধা দিতেও চাহি না;-তোমাকে উপদেশ দিবার ক্ষমতাও আমার নাই। আমি তোমার নিকট মিনতি করিয়া বলিতেছি, সবিনয়ে প্রার্থনা করিতেছি, তুমি মোসলেমের সেই ছেলে দুইটির সন্ধানে আর যাইয়ো না;-ইহাই প্রার্থনা। আমি তোমার নিকট রতি পরিমাণ সোনাও চাহি না এবং রক্তমাখা মোহরের জন্য লালায়িতও নহি। পিতৃহীন বালকদ্বয়ের শোণিতরঞ্জিত মোহর চক্ষে দেখিতে ইচ্ছা করি না, ছুঁইতেও পারিব না। জীবন কয় দিনের? ঈশ্বরের নিকট কি উত্তর করিবে? আমি তোমার দুখানি হাত ধরিয়া অনুরোধ করিতেছি, আমার মাথার দিব্বি দিয়া বলিতেছি, তুমি লোভের বশীভূত হইয়া এমন কার্যে প্রবৃত্ত হইও না।”
হারেস স্ত্রীরত্নের কথায় ক্রোধে আগুন হইয়া, রক্ত-আঁখি ঘুরাইয়া বলিলেন, “চুপ! চুপ! নারীজাতির মুখে ধর্মকথা আমি শুনি না। এখন খাইবার কি আছে শীঘ্র নিয়ে এস! একটু বিশ্রাম করিয়া এই রাত্রিতেই আবার সন্ধানে বাহির হইব! দেখি, কপালে কী আছে! তোর ও মিছরিমাখা কথা আমি শুনিতে ইচ্ছা করি না।”
হারেসের স্ত্রী আর কোন কথা কহিলেন না। স্বামীর আহারের আয়োজন করিয়া দিলেন। হারেস মনে মনে নানা চিন্তা করিতে করিতে অন্যমনস্কে আহার করিলেন। হস্ত-মুখ প্রালন করিয়া অমনই শয়ন করিলেন। এত পরিশ্রমেও তাঁহার চক্ষে নিদ্রা নাই। কোথায় মোস্লেমের সন্তান দুটিকে পাইবেন; কোন্ পথে, কোথায়, কোন্ স্থানে গেলে তাঁহাদের দেখা পাইবেন? দেখা পাইয়া কী প্রকারে ধরিয়া রাজদরবারে লইয়া যাইবেন;-এই চিন্তা তাঁহার মাথার মধ্যে ঘুরিতে লাগিল। বালক দুটির দেখা পাওয়া-পাঁচ হাজার সোনার টাকা-এই সকল ভাবিতে ভাবিতে বহুক্ষণ পরে ঘুমাইয়া পড়িলেন।
গৃহিণী দেখিলেন স্বামী ঘোর নিদ্রায় অচেতন। কী উপায়ে ছেলে দুটিকে রক্ষা করিবেন, এই চিন্তা করিয়া পরামর্শে বসিলেন। এ পর্যন্ত পরিচারিকা ভিন্ন, বাড়ির অন্য কাহাকেও বালকদ্বয়ের কথা বলেন নাই। এখন বাধ্য হইয়া স্বামীর ঐরূপ ভাব দেখিয়া তাঁহার মুখের কথা শুনিয়া দয়াবতী স্নেহময়ী রমণী অস্থির হইয়াছেন। কী উপায়ে পিতৃহীন বালকদ্বয়কে রক্ষা করিবেন? স্বামীর মনের ভাব-অদ্যকার ভয়ের কারণই অধিক, আর আশ্রয়ের স্থান কোথায়? প্রকাশ হইলে ছেলে দুটির মাথা যায়। হইতে পারে নিজের প্রাণের আশা অতি সঙ্কীর্ণ। স্বামী পুরস্কারের লোভে স্ত্রীর বিরোধী হইতে পারেন। আর একটা গোলের কথা, স্বামীর সঙ্গে বালক দুটি লইয়া কথান্তর হইলে পাড়া-প্রতিবেশী সকলেই জানিবে! ভাল করিতে কেহ আগে যাইতে চাহে না; মন্দ করিতে কোমর বাঁধিয়া দৌড়িতে থাকে। যাইয়া বলিলেই হইল-অমুকের ঘরে ছিল। অমুক স্ত্রীলোকের আশ্রয়ে ছিল। আর প্রাণের আশা কী?-সকল কথা ভাবিয়া চিন্তিয়া আরো দুইটি লোকের সহিত পরামর্শ করিয়া কার্য করাই স্থির করিলেন।
একজন তাঁহার গর্ভজাত পুত্র; সে বুদ্ধিমান্, বিচক্ষণ-দয়ার শরীর, সে শরীরে পিতার গুণ অল্প ছিল, মাতার গুণ অধিক;-সেই একজন। আর এক পুত্র তাঁহার গর্ভজাত নহে,-পালকপুত্র। শৈশবকাল হইতে আপন স্তন্যপান করাইয়া প্রতিপালন করিয়াছেন। তাঁহার সম্পূর্ণ গুণের অধিকারী সেই পালকপুত্র হইয়াছে। সেই তাঁহার সম্পূর্ণ বিশ্বাসী। আপন গর্ভজাত পুত্র তাহার পিতা হারেসের কথা অমান্য করিতে পারে না। অন্যায় কার্য হইলেও প্রতিবাদ করে না,-চুপ করিয়া নীরবে থাকে। পালকপুত্রটি তাহা নহে। সে তাঁহারই অনুগত-বাধ্য, হারেসের কথা সে শুনে না। হারেস কোন অন্যায় কথা বলিলে সে অকপটে নির্ভয়ে তাহার প্রতিবাদ করে।
