যুদ্ধাবসানে নরপতি জেয়াদ দর্পের সহিত বলিতে লাগিলেন-
“মদিনার শত্রুকুল,-মহারাজ এজিদ্ নামদারের নামের বলেই এইরূপ নির্মূল হইবে। সেইরূপ চিন্তা করিয়া কৌশলজাল বিস্তার করিয়াছিলাম, তাহাতে বাদশা নামদারের মহাশত্রু আজ সবংশে বিনষ্ট হইত, দৈববিপাকে তাহা হইল না। মোস্লেমের যে দশা ঘটিল, প্রধান শত্রু হোসেনকেও সেই দশায় পতিত হইতে হইত। দামেস্ক এবং কুফার সৈন্যের তরবারি-ধারে হোসেন-মস্তক নিশ্চয়ই দেহ-বিচ্ছিন্ন হইত। পরিবার-পরিজন-সঙ্গীরাও আজ কুফার সিংহদ্বারের সম্মুখস্থ প্রান্তরে রক্তমাখা হইয়া গড়াগড়ি যাইত। ভাগ্যক্রমে হোসেন ষষ্টি-সহস্র লোকজনসহ কুফার পথ ভুলিয়া কারবালার পথে গিয়াছে; জেয়াদের হস্ত হইতে রক্ষা পাইয়াছে। সম্পূর্ণরূপে সর্বাংশে যশ লাভ করিতে পারিলাম না, ইহাই আমার নিদারুণ আক্ষেপ! মদিনার একটি প্রাণীও আজ কুফার সৈন্যগণের হস্ত হইতে রক্ষা পায় নাই। সমুদয় শেষ হইয়া যমালয়ে গমন করিয়াছে। একটি প্রাণীও পলাইতে পারে নাই। ধন্য কুফার সৈন্য!”
গুপ্তচর, গুপ্তসন্ধানিগণ মধ্য হইতে একজন বলিল- “ধর্মাবতার! মোস্লেমের দুই পুত্র মারা যায় নাই, ধরা পড়িয়া বন্দিও হয় নাই! তাহারা যুদ্ধাবসানে, যুদ্ধক্ষেত্র হইতে অতিত্রস্তপদে নগরের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে। কি কৌশলে যে তাহারা কুফার সৈন্যগণচক্ষে ধূলি দিয়া প্রাণ বাঁচাইল,-আর এ পর্যন্ত যে জীবিত আছে,-ইহাই আশ্চর্য! মহারাজ! তাহারা দুই ভ্রাতা এই নগরেই আত্মগোপন করিয়া রহিয়াছে। আমরা বিশেষ সন্ধানে জানিতে পারিয়াছি, তাহারা নগরের বাহিরে যায় নাই,-যাইতে পারে নাই।”
আবদুল্লাহ্ জেয়াদ অতি ব্যস্তভাবে বলিতে লাগিলেন, “সে কী কথা? মোস্লেমের পুত্রদ্বয় জীবিত আছে?” অমাত্যগণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “ওহে! এ কী ভয়ানক কথা? ভুজঙ্গ হইতে ভুজঙ্গশিশুর বিষ যে অত্যধিক মারাত্মক, তাহা কি তোমরা জান না? এখনই ডঙ্কা বাজাইয়া ঘোষণা প্রচার কর। নগরের প্রতি রাজপথে, ক্ষুদ্র পথে, প্রকাশ্য স্থানে নগরবাসীর প্রতি দ্বারে ডঙ্কা, দুন্দুভি, ভেরী বাজাইয়া ঘোষণা করিয়া দাও,-যে ব্যক্তি মোসলেমের পুত্রদ্বয়কে ধরিয়া আমার নিকটে আনিতে পারিবে-সহস্র সুবর্ণমুদ্রা তৎক্ষণাৎ পারিতোষিক পাইবে। আর যে ব্যক্তি মোসলেম পুত্রদ্বয়কে আশ্রয় দিয়া গোপনে রাখিবে, প্রকাশমাত্র বিচার নাই,-কোন কথা জিজ্ঞাস্য নাই,-দ্বিতীয় আদেশের অপেক্ষা নাই, শূলদণ্ডই তাহার জীবনের সহচর। শূলদণ্ডকেই চির আলিঙ্গন করিয়া-প্রাণের সহিত আলিঙ্গন করিয়া মজ্জাভেদে মরিতে হইবে।”
আদেশমত তখনই ঘোষণা প্রচার হইল-নগরময় ঘোষণা প্রচার হইল। কতকলোক অর্থলোভে পিতৃহীন বালকদ্বয়ের অন্বেষণে ছুটিল। নানাস্থানে খুঁজিতে আরম্ভ করিল। পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, মাঠ-ঘাট চারিদিকে সন্ধান করিয়া ব্যস্ততাসহকারে ছুটাছুটি করিয়া বেড়াইতে লাগিল।
মোস্লেমের পুত্রদ্বয় ঘোষণা প্রচারের পূর্বেই এক ভদ্রলোকের বাটীতে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন। সে ভদ্রলোকটি কুফা নগরের বিচারপতি (কাজী)। তিনি বালকদ্বয়ের দুঃখে দুঃখিত হইয়া আশ্রয় দিয়াছেন, পরিতোষরূপে আহার করাইয়া শয়নের ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছেন। মহাবীর মোস্লেমের জন্য আক্ষেপ করিতেছেন। ইতিমধ্যে ঘোষণার বিবরণ শুনিয়া কাজী সাহেব নিতান্তই দুঃখিত হইলেন। কী করেন? কী উপায়ে পিতৃহীন বালক দুটির প্রাণ রক্ষা হইতে পারে, তাহারই সুযোগ-সুবিধা খুঁজিতেছেন, চিন্তা করিতেছেন। বহু চিন্তার পর সঙ্কল্প স্থির করিয়া তাঁহার জ্যেষ্ঠপুত্র ‘আসাদ্কে’ ডাকিয়া বলিলেন, “প্রাণাধিক পুত্র! দেখ, এই পিতৃহীন বালক দুটির প্রাণ রক্ষার উপায় করিতে হইবে। ঘোষণার বিষয় তো শুনিয়াছ! সাবধান, সতর্কে নিশীথ সময়ে বালকদ্বয়কে সঙ্গে করিয়া নগরের প্রবশেদ্বার পার হইবে। কিছুক্ষণ মদিনার পথে দাঁড়াইলেই মদিনার যাত্রীদল অবশ্যই দেখিতে পাইবে। বহু যাত্রীদলই প্রতি রাত্রিতে গমন করে, অদ্যও করিবে; তাহাদের কোন-এক দলের সহিত বালকদ্বয়কে সঙ্গী করিয়া দিলেই ‘কাফেলায়’ মিশিয়া নিরাপদে মদিনায় যাইতে পারিবে। বালক দুটিরও প্রাণ রক্ষা হইবে, আমরাও নরপতি জেয়াদের ঘোষণা হইতে রক্ষা পাইব।”
কাজী সাহেব এই কথা বলিয়াই দুই ভ্রাতার কোমরে পঞ্চাশ পঞ্চাশ মোহর বাঁধিয়া দিলেন এবং খাদ্যসামগ্রীও পরিমাণ মত উভয় ভ্রাতার সঙ্গে যাহা তাহারা অনায়াসে লইয়া যাইতে পারে তাহা দিয়া দিলেন।
কাজী সাহেবের পুত্র আসাদ্ পিতৃহীন বালকদ্বয়কে সঙ্গে করিয়া নিশীথ সময়ে গৃহ হইতে বহির্গত হইলেন। সাবধান সতর্কে নগরের সিংহদ্বার পার হইয়া দেখিলেন, একদল যাত্রী মদিনাভিমুখে যাইতেছে, কিন্তু তাহারা কিঞ্চিৎ দূরে গিয়া পড়িয়াছে।
আসাদ্ বলিলেন, “ভ্রাতৃগণ! দেখিতেছ! মদিনার যাত্রীদল যাইতেছে, এমন সুযোগ-সুবিধা আর নাও পাওয়া যাইতে পারে। ঐ যে যাত্রীদল যাইতেছে, তোমরা খোদার নাম করিয়া ঐ দলে মিশিয়া চলিয়া যাও। ঐ যাত্রীদলে মিশিতে পারিলে আর ভয়ের কোন কারণ থাকিবে না। তোমাদিগকে এলাহির হস্তে সঁপিলাম। যাও ভাই! আর বিলম্ব করিয়ো না। শীঘ্র যাও। ভাই সেলাম!” আসাদ্ বিদায় হইলেন। ভ্রাতৃদ্বয় ত্রস্তপদে মদিনার যাত্রীদলের পশ্চাৎ অনুসরণ করিয়া যাইতে লাগিলেন। রজনীর ঘোর অন্ধকার। বালুকাময় পথ। তদুপরি প্রাণের ভয়, দুই ভাই একত্রে দৌড়িতে লাগিলেন,-অগ্রগামী কাফেলার দিক্ লক্ষ্য করিয়া দৌড়িতে লাগিলেন।
