জগৎকারণ জগদীশ্বরের মহিমার অন্ত নাই। ভ্রাতৃদ্বয় দৌড়িতে দৌড়িতে মদিনার পথ ভুলিয়া পুনরায় নগরের দিকে-কুফা নগরের দিকে আসিতে লাগিলেন। মনে মনে আশা করিয়াছিলেন, যাত্রীদল বেশি দূর যায় নাই, এখনই তাঁহাদের সঙ্গে যাইয়া দলে মিশিতে পারিব। নির্ভয়ে মদিনায় যাইয়া দুঃখিনী মায়ের চরণ দু’খানি দেখিতে পাইব। আশা করিলে কী হয়? মানুষের আশা পূর্ণ হয় কই? অদৃষ্ট ফেরে পথ ভুলিয়া-মদিনার পথ ভুলিয়া, অন্য পথে, কুফা নগরের দিকেই যে আসিতেছেন, দুই ভাই দৈবঘটনার কিছুই বুঝিতে পারিতেছেন না। ত্রস্তপদে যাইতে যাইতে সম্মুখে দেখিলেন, মশালের আলো। আলো লক্ষ্য করিয়া দৌড়িলেন। যাইয়া দেখিলেন যাত্রীদল নহে। রাজকীয় প্রহরীর দল অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, প্রত্যেকের হস্তে জ্বলন্ত মশাল। প্রহরীদিগের সম্মুখে পড়িতেই তাহারা বালকদ্বয়কে দেখিয়া, আকার-প্রকার, তাহাদের রূপের ছটা দেখিয়াই যাহা বুঝিবার বুঝিয়া লইল। আর কি যাইবার সাধ্য আছে? ধরিয়া ফেলিল। পুরস্কার লোভে অগ্রে শহর-কোটালের নিকট লইয়া উপস্থিত করিল, নগরপাল কোটাল উভয় ভ্রাতার আকার-প্রকার দেখিয়াই বুঝিয়া লইলেন, এই বালকদ্বয়ই বীরবর মোস্লেমের হৃদয়ের সার, প্রিয় আত্মজ। নগরপাল ভ্রাতৃদ্বয়ের রূপলাবণ্য দেখিয়া যত্নপূর্বক আপন গৃহে রাখিয়া অতি প্রত্যূষে মহারাজ জেয়াদের দরবারে উপস্থিত করিলেন।
কুফাধিপতি মোস্লেম তনয়দ্বয়ের রূপলাবণ্য, মুখশ্রী, কিঞ্চিৎ কৃষ্ণ কেশের নয়নর ন দৃশ্য দেখিয়া “শিরচ্ছেদ কর” এ কথাটা আর মুখে উচ্চারণ করিতে পারিলেন না। মায়াবশে বশীভূত হইয়া বলিলেন, “এই বালকদ্বয়কে দ্বিতীয় আদেশ না হওয়া পর্যন্ত বন্দিখানায় রাখিতে বল। কারাধ্যকে আদেশ জানাও যে, ইহারা রাজকীয় বন্দি। কোন প্রকারে কষ্ট না পায়। বন্দিগৃহ হইতে বহির্গত হইতেও না পারে, কোন প্রকারে অসম্মান-অবমাননা যেন না হয়।”
দুই ভ্রাতা করজোড়ে-সবিনয়ে, তাঁহাদের মনের কথা মুখে প্রকাশ করিতে উদ্যোগী হইতেই এদিকে প্রহরীদল উভয়কে লইয়া কারাগৃহে প্রধান কার্যকারকের নিকটে চলিয়া গেল। তাঁহারা আবদুল্লাহ্ জেয়াদের নিকট একটি কথা বলিতেও সুযোগ পাইলেন না। কারাগৃহে নীত হইলে কারাধ্যক্ষ, নাম মস্কুর, উভয় ভ্রাতার রূপমাধুরী দেখিয়া এবং ইহারাই বীরশ্রেষ্ঠ বীর মোস্লেমের হৃদয়ের ধন ভাবিয়া আদর ও যত্নের সহিত ভালবাসিলেন। বন্দিগৃহে না রাখিয়া স্বীয় ভবনে উভয় ভ্রাতাকে লইয়া আহারাদি করাইলেন। বিশ্রাম জন্য শয্যা রচনা করিয়া দিয়া ভাবিতে লাগিলেন, কি করি! রাত্রি প্রভাতেই হউক কি দুদিন পরেই হউক, নরপতি নিশ্চয়ই ইহাদের শিরচ্ছেদ আজ্ঞা প্রদান করিবেন। দুইটি ভাইকে রক্ষা করি কি প্রকারে?’ অনেক চিন্তার পর, অর্ধ নিশা অতীত হইলে, দুই ভ্রাতাকে জাগাইয়া বলিলেন,-“তোমরা আমার সঙ্গে সঙ্গে আইস, কোন চিন্তা নাই। আমি তোমাদিগকে রক্ষা করিব। ইহাতে আমার অদৃষ্টে যাহা থাকে হইবে। আইস, আমার সঙ্গে আইস।” মোসলেম পুত্রদ্বয় কারাধ্যরে সঙ্গে সঙ্গে চলিলেন। নগরের বাহির হইয়া কারাধ্যক্ষ কিঞ্চিৎ দূরে চলিয়া গিয়া দুই ভ্রাতাকে বলিলেন, “শুন, তোমরা মনোযোগ করিয়া শুন। এই যে পথের উপর দাঁড়াইয়াছি-এই পথ ধরিয়া ‘কুদ্সীয়া’ নগরে যাইবে। এই পথ ধরিয়া একটু দ্রুতপদে চলিয়া গেলে রাত্রি প্রভাতের পূর্বেই কুদ্সীয়া নগরে যাইতে পারিবে। ঐ নগরে আমার ভাই আছেন, তাঁহার নাম- এই নামটি মনে করিয়া রাখিয়ো। নাম করিলে তাঁহার বাসস্থান লোকে দেখাইয়া দিবে। আমি যে তোমাদিগকে পাঠাইতেছি, তাহার নিদর্শন আমার এই অঙ্গুরী দিতেছি, সাবধানে রাখিয়ো! কিছু বলিতে হইবে না। এই অঙ্গুরী আমার ভ্রাতাকে দিলেই তিনি তোমাদিগকে তোমাদের গম্যস্থানের কথা জিজ্ঞাসা করিবেন। তোমরা মদিনার নাম করিয়ো, যে উপায়ে হয়-যে কোন কৌশলে হয়-তোমাদিগকে তিনি মদিনায় পাঠাইয়া দিবেন। এই অঙ্গুরী লও। খোদার হাতে তোমাদিগকে সঁপিলাম। শীঘ্র এই পথ ধরিয়া চলিয়া যাও। কোন ভয়ের কারণ নাই। সর্ববিপদহর জয় জগদীশ তোমাদিগকে রা করিবেন।” ভ্রাতৃদ্বয় বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাইয়া অঙ্গুরীসহ বিদায় গ্রহণ করিয়া কুদ্সীয়ার পথে যাইতে লাগিলেন।
দয়াময় এলাহির অভিপ্রেত কার্যে বাধা দিতে সাধ্য কার? কার ক্ষমতা তাঁহার বিধানের বিপর্যয় করে? ভ্রাতৃদ্বয় সারানিশা ত্রস্তপদে হাঁটিয়া বড়ই ক্লান্ত হইলেন। জ্যেষ্ঠ বলিলেন, “ভাই, বহু দূরে আসিয়াছি। ‘কুফা’ হইতে বহুদূর কুদ্সীয়া নগর-এই সেই কুদ্সীয়া।” রাত্রি প্রভাত হইয়া আসিল। একটু স্থির হইয়া বসিতেই ঊষার আলোকে চতুর্দিক নয়নফলকে প্রতিফলিত হইতে লাগিল। ভ্রাতৃদ্বয় এখনো নির্ভয়ে বসিয়া আছেন, প্রকৃতির কল্যাণে, ঘটনার চক্রে কী সাংঘাতিক ব্যাপার ঘটিয়াছে, তাহার কিছুই জানিতে পারেন নাই। অদৃষ্টলিপি খণ্ডাইতে মানুষের সাধ্য কী? ভ্রাতৃদ্বয় সারাটি রাত্রি ত্রস্ত পদে হাঁটিয়াছেন -সত্য। মনে মনে স্থির করিয়াছেন, বহু দূরে আসিয়া পড়িয়াছি। এস্থলে আর আবদুল্লাহ্ জেয়াদের ভয়ে ভাবিতে হইবে না। হা অদৃষ্ট! তাঁহাদের ধারণা-ভাবনা সম্পূর্ণ ভুল। কুদ্সীয়ার পথ ভুলিয়া সারাটি রাত্রি কুফা নগরের মধ্যেই ঘুরিয়াছেন। এদিকে রাত্রিও প্রভাত হইল। চক্ষের ধাঁধা ছুটিয়া গেল। প্রাণ চমকিয়া উঠিল। জ্যেষ্ঠ বলিলেন, “ভাই আমাদের কপাল মন্দ! হায়! হায়! কী করিলাম! প্রাণপণে পরিশ্রম করিয়া সারারাত হাঁটিলাম, কি কপাল! এই তো সেই, আমাদিগকে যে স্থানে রাখিয়া কুদ্সীয়ার পথ দেখাইয়া গিয়াছেন-এ তো সেই স্থান।” কনিষ্ঠ ভ্রাতাও চমকিয়া উঠিয়া বলিলেন, “হাঁ ভাই! ঠিক কথা! যে স্থান হইতে তিনি বিদায় হইয়াছিলেন, এ তো সেই পথ-সেই পথপার্শ্বের দৃশ্য।”
ঘটিয়াছেও তাহাই। কারাধ্যক্ষ মস্কুর যে স্থানে তাঁহাদিগকে রাখিয়া চলিয়া গিয়াছেন, সারানিশা ঘুরিয়া প্রভাতে আবার সেই স্থানেই আসিয়াছেন।
