মোস্লেম হতাশ হইলেন না; কিন্তু তাঁহাকে নূতন প্রকার চিন্তার আলোচনায় প্রবৃত্ত হইতে হইল। নিজ সৈন্য এবং কুফার সৈন্যের সাহায্যে যে যে প্রকার যুদ্ধের কল্পনা করিয়াছিলেন, এক্ষণে তাহা পরিবর্তন করিয়া নূতনরূপ চিন্তায় নিমগ্ন হইলেন। ওদিকে ওত্বে অলীদ কি মনে করিয়া আর অগ্রসর হইলেন না। আপন আয়ত্তাধীনে সম্ভবতঃ দূরে থাকিয়াই দ্বৈরথ যুদ্ধ আরম্ভ করিবার অভিপ্রায়ে মহাবীর ওত্বে অলীদ গম্ভীর স্বরে বলিতে লাগিলেন, “মোস্লেম, যদি নিতান্তই যুদ্ধসাধ হইয়া থাকে, তবে আইস, আমরাই উভয়ে যুদ্ধ করি, জয়-পরাজয় আমাদের উভয়ের উপরেই নির্ভর। অনর্থক অন্য অন্য প্রাণ বিনষ্ট করিবার আবশ্যক কী?”
মোসলেম সে কথায় উত্তর না দিয়া কতক সৈন্য সহিত ওত্বে অলীদকে ঘিরিয়া ফেলিলেন।
ওত্বে অলীদ আবার বলিলেন, “মোস্লেম! এই কী যুদ্ধের রীতি, না বীরপুরুষের কর্তব্য কার্য? কে তোমাকে বীর আখ্যা দিয়াছিল? ‘কহ মহারথি! এই কী মহারথি-প্রথা’?”
মোস্লেম সে কথায় কর্ণপাত না করিয়া সৈন্যদিগকে বলিলেন, “ভ্রাতৃগণ! বিধর্মীর হস্তে মৃত্যুই বড় পুণ্য। প্রভু মোহাম্মদের দৌহিত্রগণকে যাহারা, যে পাপাত্মারা-যে নরপিশাচেরা শত্রু মনে করে, তাঁহাদের প্রাণবিনাশের চেষ্টা করে, তাহাদের হস্তে প্রাণবিসর্জন করিতে পারিলে, তাহা অপেক্ষা ইহজগতে আর কী অধিকতর সুখ আছে? এক দিন মরিব বলিয়াই জন্মিয়াছি। যে মরণে সুখ, সহস্র সহস্র পাপ থাকিলেও সর্বসুখ ভোগের অধিকার, এমন মরণে কে না সুখী হয়? আমরা যুদ্ধে জয়ী হইব না, আশাও করি না। তবে বিধর্মীয় হস্তস্থিত তরবারি ইসলাম-শোণিতে রঞ্জিত হইয়া পরিণামে আমাদিগকে স্বর্গ-সুখের অধিকারী করিবে, এই আমাদের আশা। জয়ের আশা আর মনে করিয়ো না, আজই যুদ্ধের শেষ-আজই আমাদের জীবনের শেষ।” মোস্লেম এই বলিয়া ওত্বে অলীদের প্রতি অস্ত্রবর্ষণ করিতে লাগিলেন; মারওয়ান দেখিলেন যে, অলীদের পরমায়ু শেষ হইল, সমুদয় সৈন্য একত্রিত করিয়া মোস্লেম আক্রমণ করিয়াছে! ইহাতে একা এক প্রাণ, কতণ অলীদ রক্ষা করিবে? ক্ষণকাল বিলম্ব না করিয়া মারওয়ান সমুদয় সৈন্যসহ মোস্লেমকে আক্রমণ করিলেন। ভয়ানক যুদ্ধ আরম্ভ হইল। মোস্লেমের জীবনের আশা নাই; তাঁহার সৈন্যগণ বিধর্মীর হস্তে মরিবে, সেই আশায় কেবল মারিতেই লাগিলেন; ভবিষ্যৎ জ্ঞান, পশ্চাৎ লক্ষ্য, পার্শ্বে দৃষ্টি ইত্যাদির প্রতি কিছুই লক্ষ্য রাখিলেন না। মহাবীর মোস্লেম দুই হস্তে তরবারি ধরিলেন। অশ্ববল্গা দন্তে আবদ্ধ করিলেন। শত্রুসৈন্য অকাতরে কাটিয়া চলিলেন। মধ্যে মধ্যে “আল্লাহু আক্বার” নিনাদে দ্বিগুণ উৎসাহে সৈন্যদিগকে উৎসাহিত করিলেন। ওত্বে অলীদ ও মারওয়ান বহু পরিশ্রম ও বহু চেষ্টা করিয়াও মোস্লেমের লঘুহস্তচালিত চপলাবৎ তরবারি সম্মুখে আর তিষ্টিতে পারিলেন না। ক্ষণকালমধ্যে সৈন্যগণ ছত্রভঙ্গ হইয়া দিগ্বিদিকে পলাইতে লাগিল। মোস্লেমের সৈন্যগণও ঐ পলায়িত শত্রুর পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইয়া দেহ হইতে বিধর্মী মস্তক মৃত্তিকাশায়ী করিতে লাগিল।
আবদুল্লাহ্ জেয়াদ নগরতোরণোপরিস্থ অতি উচ্চ মঞ্চে উঠিয়া উভয় দলের যুদ্ধ দেখিতেছিলেন। দেখিলেন, মোস্লেমের তরবারির সম্মুখে কেহই অগ্রসর হইতে পারিতেছে না। বহুতর সৈন্য মৃত্তিকাশায়ী হইয়াছে। যাহারা জীবিত আছে, তাহারাও প্রাণভয়ে দিশেহারা হইয়া পলাইতেছে। জেয়াদ মঞ্চ হইতে নামিয়াই দ্বাররককে বলিলেন, “দ্বার খুলিয়া দাও।” সৈন্যগণকে আদেশ করিলেন যে, “আমার পশ্চাদ্বর্তী হইয়া মোস্লেমকে আক্রমণ কর, আমরা সাহায্য না করিলে ওত্বে অলীদের প্রাণ কখনোই রক্ষা হইবে না।”
রাজাজ্ঞা প্রাপ্তিমাত্রই লক্ষাধিক সৈন্য জয়নাদে তুমুল শব্দ করিয়া পশ্চাদ্দিক হইতে মোস্লেমকে আক্রমণ করিল। আবদুল্লাহ্ জেয়াদ স্বয়ং যুদ্ধে আসিতেছেন, মোস্লেমের সেদিকে দৃষ্টিপাত নাই, কেবল অশ্ববল্গা দন্তে ধারণ করিয়া দুই হস্তে বিধর্মী নিপাত করিতেছেন। যাহাকে যে অবস্থায় পাইতেছেন, সেই অবস্থাতেই দেহ হইতে মস্তক ছিন্ন, কাহাকেও অশ্ব সহিত এক চোটে দ্বিখণ্ডিত করিয়া, জন্মশোধ যুদ্ধের সাধ মিটাইতেছেন। আবদুল্লাহ্ জেয়াদ পশ্চাদ্দিক হইতে মোস্লেমকে আক্রমণ করিবার উপক্রম করিলেই, ওত্বে অলীদ উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন, “মোস্লেম ঈশ্বরের নাম মনে কর; তোমার সাহায্যের জন্য আবদুল্লাহ্ জেয়াদ লক্ষাধিক সৈন্য লইয়া আসিয়াছেন।”
মোস্লেম জেয়াদের নাম শুনিয়া চমকিতভাবে পশ্চাতে ফিরিয়া যাহা দেখিলেন, তাহাতে আর কিছুই বলিলেন না। কেবলমাত্র বলিলেন, “বিধর্মীর কথায় কে বিশ্বাস করিবে, কাফেরের ভক্তিতে যে মুসলমান ভুলিবে, তাহার দশাই এইরূপ হইবে।” মোস্লেম ভীত হইলেন না, যুদ্ধে ক্ষান্ত দিয়াও পরাজয় স্বীকার করিলেন না, পূর্বমত বিধর্মীশোণিতে মৃত্তিকা রঞ্জিত করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাহাতে কোনই ফল হইল না। চতুর্দিক হইতে অবিশ্রান্তরূপে মোস্লেমের শরীরে শর বিদ্ধ হইতে লাগিল; সর্বাঙ্গে শোণিতধারা ছুটিল। অশ্বপদতলে বিধর্মীর রক্তস্রোত বহিতেছে, যুদ্ধক্ষেত্র মনুষ্যদেহে পরিপূর্ণ হইয়াছে, শোণিতসিক্ত মৃত্তিকায় প্রিগামী অশ্বপদ স্খলিত হইতেছে; তথাচ মহাবীর মোস্লেম শত্রুক্ষয় করিতে নিবৃত্ত হইতেছেন না। এত মারিতেছেন, কিন্তু কিছুতেই তাহার শেষ হইতেছে না। দিনমণিও সমস্ত দিন এই ঘোরতর যুদ্ধ দেখিয়া লোহিতবর্ণে অস্তমিত হইলেন। তৎসঙ্গেই ইস্লামগৌরব-রবি মহাবীর মোস্লেম লোহিত বসনে আবৃত হইয়া-জগৎ অন্ধকার করিয়া শত্রুহস্তে প্রাণবিসর্জনপূর্বক স্বর্গগামী হইলেন। মদিনার একটি প্রাণীও আর বিধর্মীর অস্ত্র হইতে রক্ষা পাইল না।
