“এ ধর্মনীতির কথা নহে যে ঘাড় নোয়াইয়া বিশ্বাস করিতেই হইবে। পাপের প্রায়শ্চিত্ত নহে যে কালে হইবেই হইবে। এ প্রসূতির প্রসব বিষয়ে চিন্তা নহে যে, দশ মাস দশ দিন পরে যাহা হয়, একটা হইবেই হইবে। এ অদৃষ্টলিপির প্রতি নির্ভরের কার্য নহে যে, যাহা কপালে লেখা আছে, তাহাই ঘটিবে। এ রাজ-চক্র, ইহার মর্ম ভেদ করা বড়ই কঠিন। বিশেষ সমর কাণ্ড যেমন কুটিল, তেমনি জটিল। যখনই প্রশ্ন তখনই উত্তর, যে মুহূর্তে চিন্তা সেই মুহূর্তেই কার্য, তখনই কার্যফল দ্রুতগতি সময়ের সহিত সমরকাণ্ডের কার্য-সম্বন্ধ। বুদ্ধির কৌশল, বিবেচনার ফল। জয়-পরাজয়ের সময় অতি সংক্ষেপ। দক্ষিণ চক্ষু দেখিল, বীরবরের হস্তস্থিত তরবারি বিদ্যুৎ-লতায় চমকিতেছে-বাম চক্ষু দেখিল, ঐ মহাবীরের রঞ্জিত দেহ ভূতলে গড়াইতেছে, রঞ্জিত হস্তে রঞ্জিত তরবারি বদ্ধমুষ্টিতে ধরাই রহিয়াছে। বর্তমান যুদ্ধে যে কি ঘটিবে তাহা ভগবানই জানেন। আমার সময় মন্দ। কাহারো নিকট কিছু জিজ্ঞাসা করিতে সাহস হয় না, কাহারো মুখে কিছু শুনিতে পাই না। মহারাজ আজ্ঞা করিয়াছেন-বন্দি হইয়াছি। লৌহশৃঙ্খল গলায় পরিতে হুকুম দিয়াছেন, হুকুম তামিল করিয়াছি। দুঃখ মাত্র নাই, অন্তরেও বেদনা বোধ করি নাই। তবে বেদনা লাগিয়াছে যে, এই সঙ্কট সময়ে অকারণ যুদ্ধে অগ্রসর-স্বয়ং রাজা অগ্রসর, স্বয়ং অস্ত্র ধারণ! বড়ই দুঃখের কথা! এ যুদ্ধের পরিণাম ফল কি হইল? কে হারিল, কে জিতিল? সন্ধি-অসম্ভব। যুদ্ধ অনিবার্যরূপে চলিতেছে, সমর-গগনে লোহিত নিশান বায়ুর সহিত এখনো খেলা করিতেছে। সন্দেহমাত্র নাই। আমার তো বিশ্বাস যে, দামেস্ক সৈন্য-শোণিতে দামেস্ক প্রান্তরই রঞ্জিত হইতেছে। দামেস্কভূমি দামেস্ক-বীর শিরেই পরিপূর্ণ হইতেছে। এ অবৈধ সমরে সন্ধির নামই আসিতে পারে না। এজিদ্ হানিফার রণক্ষেত্রে শুভ্র-নিশান উড়াইতে পারে না। বড়ই শক্ত কথা!”
মন্ত্রীপ্রবর হামান মনের কথা এইরূপে অকপটে মুখে প্রকাশ করিতেছেন, এমন সময় দ্বাররক্ষক দ্রুতপদে মন্ত্রীপ্রবরের নিকট আসিয়া চুপে চুপে কি কথা বলিতে লাগিল। বন্দিসচিব-তাহার মুখে কোন কথাই প্রকাশ হইল না। দেখিবার মধ্যে দেখা গেল চক্ষের জল, আর শুনিবার মধ্যে শুনা গেল দীর্ঘ নিশ্বাস। পাঠক! চুপি চুপি কথা আর কিছু নহে, আমাদের জানা কথা-গত কথা, যুদ্ধের বিবরণ এবং এজিদের পলায়ন, এই সংবাদ।
চলুন, অন্যদিকে যাওয়া যাক্। শুনিতেছেন? শুনিতে পাইতেছেন? স্ত্রী-কণ্ঠ। বুঝিতে পারিতেছেন? কি কথা, একটু অগ্রসর হইয়া শুনুন।
“বাবা জয়নাল! তুই যে বন্দিখানা হইতে পলাইয়াছিস-বুদ্ধির কাজ করিয়াছিস বাপ্! আর দেখা দিস না। কখনোই কাহারো নিকট দেখা দিস না! তুই যে আমার প্রাণের প্রাণ! তোকে বুকে করিলে বুক শীতল হয়! চক্ষু জুড়ায়! তুই আমাকেও দেখা দিস না! বনে, জঙ্গলে, পশুদিগের সহিত বাস করিস্! বাপ্ রে! এজিদ বাঁচিয়া থাকিতে কখনোই লোকালয়ে আসিস্ না। কাহাকেও দেখা দিস্ না। (উচ্চৈঃস্বরে) জয়নাল! তুই আমার-তুই আমার কোলে আয়। এ বন্দিখানায় কী অপরাধে অপরাধী হইয়া বন্দি হইয়াছি-দয়াময় ঈশ্বর জানেন। কতকাল এভাবে থাকিতে হইবে, তাহাও তিনিই জানেন। জয়নাল! তোর মুখখানির প্রতি চাহিয়াই এত দিন বাঁচিয়া আছি! তুই ইমাম বংশের একমাত্র সম্বল, মদিনার রাজরত্ন! তোর ভরসাতেই আজ পর্যন্ত দামেস্ক বন্দিগৃহে তোর চিরদুঃখিনী মা প্রাণ ধরিয়া বাঁচিয়া আছে! পবিত্র ভূমি মদিনা পরিত্যাগ করিয়া যে দিন কুফায় গমন করিতে পথে বাহির হইয়াছি, সেই দিন হইতে সর্বনাশের সূচনা হইয়াছে। কত পথিক দূর দেশে যাইতেছে, কত রাজা সৈন্যসামন্তসহ বন, জঙ্গল, মরুভূমি অতিক্রম করিয়া, গিরিগুহা অনায়াসে পার হইয়া নির্দিষ্ট স্থানে নির্বিঘ্নে যাইতেছে। ভ্রম নাই-পথ-ভ্রান্তি নাই-স্বচ্ছন্দে যাইতেছে, আসিতেছে-কোনরূপ পথ-বিঘ্ন নাই, বিপদ নাই, কোন কথা নাই! হায় আমাদের কি দুর্ভাগ্য! দিনে দুই প্রহরে ভ্রম! মহাভ্রম! কোথায় কুফা! কোথায় কারবালা! সেখানে যাহা ঘটিবার ঘটিল। আত্মঘাতী হইলাম না, প্রাণও বাহির হইল না,-কেন হইল না? বাপ্! তোর মুখের প্রতি চাহিয়া-বন্দিখানাতেও তোরই মুখখানি দেখিয়া কিছুই করি নাই। তুই দুঃখিনীর ধন! দুঃখীর হৃদয়ের ধন! অঞ্চলের নিধি! বাপ্! তোর দশা কী ঘটিল? হায়! হায়! কেন তুই ওমর আলীর প্রাণবধের ঘোষণা শুনিয়া বন্দিগৃহ হইতে বাহির হইলি? আমার মন অস্থির-বিকারপ্রাপ্ত। কি বলিতে কি বলি তাহার স্থিরতা নাই। বন্দিখানায় থাকিলে দুর্দান্ত পিশাচ মারওয়ানের হস্ত হইতে তোকে কখনোই রক্ষা করিতে পারিতাম না, আমার ক্রোড় হইতে কাড়িয়া লইয়া যাইত। হায়! হায়!! সে সময় তোর মুখের দিকে চাহিয়া আমার কী দশা ঘটিত বাপ্! তুমি বুদ্ধির কাজ করিয়াছ। এজিদ্ জীবিত থাকিতে লোকালয়ে আসিয়ো না। বনে, জঙ্গলে, গিরিগুহায় লুকাইয়া থাকিয়ো। বনের ফল, মূল, পাতা খাইয়া জীবনধারণ করিয়ো। কখনো লোকালয়ে আসিয়ো না। আর না হয়, যে দেশে এজিদের নাম নাই, তোমার নাম নাই-সে দেশে যাইয়া ভিক্ষা করিয়া জীবন কাটাইয়ো। তাহাতে সাহারবানুর প্রাণ শীতল থাকিবে!”
এ কী! প্রহরিগণ ছুটাছুটি করে কেন? প্রহরিগণ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়াছে! যে যেখানে ছিল, সে সেই স্থান হইতে ছুটিয়াছে! পরস্পর দেখা হইতেছে, কথা হইতেছে,-কিন্তু বড় সাবধানে, চুপে চুপে। কথা কহিতেছে-পরামর্শ করিতেছে-সাবধান হইতেছে,-আত্মরক্ষার উপায় দেখিতেছে। কেন? কী সংবাদ? দেখুন-আশ্চর্য দেখুন! একজন প্রহরী ছুটিয়া আসিয়া বৃদ্ধ মন্ত্রী হামানের কানে কানে চুপি চুপি কি কহিয়া, ঐ দেখুন কি করিল! দ্রুতহস্তে লৌহশৃঙ্খল কাটিয়া ফেলিল এবং হোসেন-পরিবার ব্যতীত অন্য অন্য বন্দিগণকে কারাগার হইতে মুক্ত করিয়া সত্বর বাহির করিয়া দিল। বন্দিগণ অবাক্! কেহ কোন কথা কহিতেছে না। সকলেই যেন ব্যস্ত। পলাইতে পারিলেই রক্ষা!-জীবনরক্ষা!
এজিদ-বধ পর্ব ০২ প্রবাহ
সমরাঙ্গণে পরাজয়-বায়ু একবার বহিয়া গেলে, সে বাতাস ফিরাইয়া বিজয়-নিশান উড়ান বড়ই শক্ত কথা। পরাজয়-বায়ু হঠাৎ চারিদিক হইতে মহাবেগে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করে না। প্রথমতঃ মন্দ মন্দ গতিতে রহিয়া রহিয়া বহিতে থাকে, পরে ঝঞ্ঝাবাত সহিত তুমুল ঝড়ের সৃষ্টি করিয়া এক পক্ষকে উড়াইয়া দেয়। নেতৃপক্ষের ঘনঘন হুঙ্কার, অস্ত্রের চাক্চিক্যে মহাবীরের হৃদয়ও কম্পিত হয়, হতাশে বুক ফাটিয়া যায়।
