আজ দামেস্ক-প্রান্তরে তাহাই ঘটিয়াছে। মদিনার সৈন্যদিগের চালিত অস্ত্রের চাক্চিক্যে এজিদ্-সৈন্য ক্ষণে ক্ষণে আত্মহারা হইতেছে। তাহারা আস্মানে কি জমিনে, তাহার কিছুই নির্ণয় করিতে পারিতেছে না। তবে বিপক্ষগণের অস্ত্রের ঝনঝনি শব্দে চমক ভাঙ্গিয়া, রণরঙ্গের কথা তাহাদের মনে পড়িতেছে বটে, কিন্তু সে সময় প্রাণভয়ে, প্রাণ চতুর্গুণ আকুল হইতেছে, দেখিতেছে, যেন প্রান্তরময় বৃষ্টিপাত হইতেছে। গগনস্থ ঘনঘটা হইতে বৃষ্টি হইতেছে না। সে রক্তবৃষ্টি মেঘ হইতে ঝরিতেছে না। ঝরিতেছে-দামেস্ক সৈন্যের শরীর হইতে; আর ঝরিতেছে-আম্বাজী সৈন্যের তরবারির অগ্রভাগ হইতে। মেঘমালার খণ্ড খণ্ড অংশই শিলা;-তাহারও অভাব হয় নাই-খণ্ডিত দেহের খণ্ড খণ্ড অংশই সে ক্ষেত্রে শিলারূপ দেখাইতেছে।
দামেস্ক-প্রান্তর দামেস্ক-সৈন্য-শোণিতেই ডুবিয়াছে। রক্তের ঢেউ খেলিতেছে। মহাবীর হানিফার সম্মুখে যে সৈন্যদলই পড়িয়াছে, সংখ্যায় যতই হউক, তৃণবৎ উড়িয়া খণ্ডিত দেহে ভূতলশায়ী হইয়াছে। সে রঞ্জিত তরবারিধারে খণ্ডিত দেহের রক্তধার, ধরণী বহিয়া, মরুভূমি সিক্ত করিয়া, প্রান্তরময় ছুটিতেছে। কিন্তু হানিফার মনের আগুন নিবিতেছে না। মদিনাবাসীর ক্রোধানল একটুও কমিতেছে না।
প্রভু হোসেনের কথা, কারবালা প্রান্তরে একবিন্দু জলের কথা, হোসেনের ক্রোড়স্থিত শিশুসন্তানের কোমল বক্ষ ভেদ করিয়া লৌহতীর প্রবেশের কথা মনে হইয়া হানিফার প্রাণ আকুল করিয়াছে। বিস্ফারিত চক্ষে রোষাগ্নির তেজ বহিয়া অবশেষে বাষ্পবারি বহাইয়া তাঁহাকে একপ্রকার উন্মাদের ন্যায় করিয়া তুলিয়াছে। “কই এজিদ্! কই সে দুরাত্মা এজিদ্! কই সে নরাধম এজিদ্! কই এজিদ্? কই এজিদ্?” মুখে বলিতে বলিতে এজিদান্বেষণে অশ্বে কশাঘাত করিয়াছেন। সে মূর্তি এজিদের চক্ষে পড়িতেই এজিদ্ ভাবিয়াছিল যে, এ মহাকালের হস্ত হইতে আর রক্ষা নাই, পলায়নই শ্রেয়ঃ। বীরের ন্যায় বক্ষবিস্তারে হানিফার সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া ‘আমি এজিদ্-আমিই সেই মদিনার মহাবীরগণের কালস্বরূপ এজিদ। হানিফা! আইস, তোমাকে ভবযন্ত্রণার দায় হইতে মুক্ত করিয়া দিই!’-এই সকল কথা বলা দূরে থাকুক, যেই দেখা অমনি পলায়নের চেষ্টা;-প্রাণভয়ে দামেস্করাজ অশ্বারোহণ করিয়া যথাসাধ্য অশ্ব চালাইতেছে।
হানিফাও এজিদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ দুল্দুল চালাইয়াছেন। এ দৃশ্য অনেকেই দেখেন নাই। রণরঙ্গে মাতোয়ারা বীরসকল এ কথা অনেকেই শুনেন নাই। যাঁহারা দেখিয়াছেন, যাঁহারা শুনিয়াছেন, তাঁহারাও তাহার পর কী ঘটিয়াছে, কী হইয়াছে, এ পর্যন্ত কোন সন্ধানপ্রাপ্ত হন নাই। কোন সন্ধানী সন্ধান আনিতে পারে নাই।
এদিকে মস্হাব কাক্কা, ওমর আলী, আক্কেল আলী (বাহরাম) প্রভৃতি মহামহিম যোধসকল কাফেরদিগকে পশুপক্ষীর ন্যায় যথেচ্ছ বধ করিতে করিতে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। গাজী রহমানের পূর্ব বচন সফল হইল। এজিদ-সৈন্য প্রাণভয়ে পলাইয়াও প্রাণরক্ষা করিতে পারিতেছে না; অশ্বের দাপটে, তরবারির আঘাতে, বর্শার সূক্ষ্মাগ্রে, তীরের লক্ষ্যে, গদার প্রহারে, খঞ্জরের দোধারে,-প্রাণ হারাইতেছে। কত শিবির, কত চন্দ্রাতপ, কত উষ্ট্র, কত অস্ত্র, প্রজ্বলিত অগ্নিশিখায় হু-হু শব্দে পুড়িয়া ছাই হইতেছে। এজিদ্পক্ষের জীবন্ত প্রাণী আর কাহারো চক্ষে পড়িতেছে না। দৈবাৎ দেখা পাইলে, মার মার শব্দে চারিদিক্ হইতে হানিফার সৈন্যগণ, তাহাকে ঘিরিয়া ক্রীড়া-কৌতুক হাসি-রহস্য করিয়া মারিয়া ফেলিতেছে। ক্রোধের ইতি নাই, মার মার শব্দের বিরাম নাই। সময়ে সময়ে মুখে সেই হৃদয়বিদারক, মর্মঘাতী কথা কহিয়া নিজে কান্দিতেছে, জগৎ কান্দাইতেছে। হায় হাসান! হায় হোসেন! তোমরা আজ কোথায়? সে মহাপ্রান্তর কারবালা কোথায়? ফোরাতের উপকূল কোথায়? যে সৈন্যদল ফোরাতের জল হইতে পথ বন্ধ করিয়াছিল, তাহারাই বা কোথায়? কই এজিদের সৈন্য? কই এজিদ্? কই তাহার শিবির? কিছুই তো চক্ষে দেখিতেছি না। প্রভু হোসেন? তুমি কোথায়? এ দৃশ্য তোমাকে দেখাইতে পারিলাম না। অহো! কাসেম! মদিনার শ্রেষ্ঠ বীর কাসেম!! একবিন্দু জলের জন্য হায়! হায়! একবিন্দু জলের জন্য কি না ঘটিয়াছে? উহু! কী নিদারুণ কথা! পিপাসায় কাতর হইয়া প্রভুপুত্র আলী আকবর পিতার জিহ্বা চাটিয়াছিল! হায়! হায়! সে দুঃখ তো কিছুতেই যায় না। কারবালার কথা কিছুতেই ভুলিতে পারিতেছি না। সে দিন রক্তের ধার ছুটিয়া কারবালা প্রান্তর ডুবাইয়াছে। আজ দামেস্ক-প্রান্তর দামেস্ক-সৈন্য-শোণিতে ডুবিয়াছে, দামেস্ক-রাজ্য মদিনার সৈন্য-পদতলে দলিত হইতেছে। কিন্তু আশা মিটিতেছে না, সে মনোবেদনার অণুমাত্রও উপশম বোধ হইতেছে না। বুঝিলাম, হোসেন শোক অন্তর হইতে অন্তর হইবার নহে; মানিলাম, কারবালার ঘটনা, মদিনার মায়মুনার কীর্তি, জায়েদার আচরণ, জগৎ হইতে একেবারে যাইবার নহে। চন্দ্র, সূর্য, তারা, নক্ষত্র যতদিন জগতে থাকিবে, ততদিন তাহা সকলের মনে সমভাবে জ্বলন্তরূপে বিষাদ-কালিমা রেখায় অঙ্কিত থাকিবে।
সমরাঙ্গণে অস্ত্রাগ্নি নির্বাণ হইয়াছে কিন্তু আগুন জ্বলিতেছে। ঊর্ধ্বে অগ্নিশিখা-নিন্মে রক্তের খেলা। রক্তমাখা দেহসকল, রক্তস্রোতেই ভাসিয়াছে, ডুবিতেছে, গড়াইয়া যাইতেছে।
সৈন্যদলসহ মস্হাব কাক্কা প্রভৃতি নগরের নিকট পর্যন্ত আসিলেন। শত্রুপক্ষীয় একটি প্রাণীও তাঁহাদের চক্ষে আর পড়িল না। জয়নাল আবেদীন সহ গাজী রহমান নগরপ্রবেশ-দ্বার পর্যন্ত যাইয়া হানিফার অপেক্ষা করিতেছিলেন। কাক্কার দল আসিয়া জুটিলেই-“জয় মদিনা-ভূপতির জয়! জয় মহারাজ জয়নাল আবেদীনের জয়!”-ঘোষণা করিতে করিতে বীরদর্পে নগরে প্রবেশ করিলেন। কার সাধ্য বাধা দেয়? কে মাথা উঠাইয়া সে বীরগণের সম্মুখে বক্ষবিস্তারে দণ্ডায়মান হয়? কাহার সাধ্য, একটি কথা কহিয়া সরিয়া যায়? জনপ্রাণী দ্বারে নাই। রাজপথেও কোন লোক কোন স্থানে কোন কার্যে নিয়োজিত নাই। পথ পরিষ্কার-জনতা, কোলাহলের নামমাত্র নাই। কেবল স্বদল মধ্যে, মধ্যে মধ্যে মার মার কাট কাট, “জয় জয়নাল আবেদীন! জয় মোহাম্মদ হানিফা” আর বহু দূরে প্রাণভয়ে পলায়নের কোলাহল আভাস। শত্রুহস্তে ধন-মান প্রাণরক্ষা হইবে না ভাবিয়া অনেকেই ঘর বাড়ি ছাড়িয়া পলায়নের উদ্যোগ করিতেছে, রক্ষার উপায় ভাবিতেছে। পরস্পরে এই সকল কথা, ডাকা হাঁকা, প্রস্থানের লক্ষণ অনুমানে অনুভূত হইতেছে। বিনা যুদ্ধে, বিনা বাক্যব্যয়ে গাজী রহমান ও মহা মহা বীরগণ সৈন্যগণসহ জয়নাল আবেদীনকে লইয়া সহস্র মুখে বিজয়ঘোষণা করিয়া দীন মোহাম্মদী নিশান উড়াইয়া, বিজয়-ডঙ্কা বাজাইয়া সিংহদ্বার পার হইলেন।
