“যেদিন রমণী-মুখচন্দ্রিমার সামান্য আভায় ধরণীপতির মস্তক ঘুরিয়াছে, মহীপাল এজিদের মহাশক্তিসম্পন্ন মজ্জা, পরকর-শোভিত মর্দিত কমলদলের মুমূর্ষু অবস্থার ঈষৎ আভায় গলিয়া বিপরীত ভাব ধারণ করিয়াছে, সেইদিন নিরাশার সঞ্চার হইয়া স্বাধীনতা ধনে বঞ্চিত হওয়ার সূত্রপাত ঘটিয়াছে। রাজার আচার, রাজার ব্যবহার, প্রজার আদর্শ এবং শিক্ষার স্থল। যে রাজচক্ষু কোমলপ্রাণা কামিনীর কমল-অক্ষির কোমল তেজ সহ্য করিতে অক্ষম, সে চক্ষু মোহাম্মদ হানিফার সুতীক্ষè তরবারির জ্বলন্ত তেজ সহ্য করিতে কখনো সক্ষম হইবে না। সে অসীম বলশালী মহাবীরের অস্ত্রাঘাত কি রূপজ মোহে ঘূর্ণিত মস্তক সহ্য করিতে পারে? কখনোই নহে। আর আশা কি?-কামিনী কটাক্ষশরে জর্জরিত হৃদয়ের আশ্বাস জন্য রাজনীতি উপেক্ষা করিয়া অকারণ রণবাদ্য বাজাইতে যে মন্ত্রী মন্ত্রণা দেয়, সে মন্ত্রী গাজী রহমানের মন্ত্রণা ভেদ করিয়া কৃতকার্য হইতে কোনকালেও ক্ষমবান হইবে না, কখনোই গাজী রহমানের সমকক্ষ হইতে পারে না। যদি যুদ্ধই ঘটিয়া থাকে, তবে নিশ্চয়ই পরাভব-নিশ্চয়ই দামেস্কের অধঃপতন-নিশ্চয়ই দামেস্ক-সিংহাসনে জয়নাল আবেদীন-নিশ্চয়ই এজিদের মৃত্যু, মারওয়ানের মনোগত আশা বিফল। পীরিত, প্রণয়, প্রেম,-এই তিন কারণেই আজ দামেস্কের-এই দুর্দশা! কী ঘৃণা!! কী লজ্জা!!!”
“বৃদ্ধ বয়সে অবিচারে পিঞ্জরাবদ্ধ হইয়া আকুলিত হই নাই। যত দূর বুঝিয়াছি-বলিয়াছি। আমার ভ্রম দর্শাইয়া ইহা অপেক্ষা শতগুণ শাস্তি দিলেও ক্ষোভের কারণ ছিল না। উচিত কথায় আহাম্মক রুষ্ট, এ কথা নূতন নহে। প্রকাশ্য দরবারে মত জিজ্ঞাসা করায়, বুদ্ধি-বিবেচনায় যাহা আসিয়াছে, বলিয়াছি! ইহাই তো অপরাধ, ইহাতেই বন্দি, ইহাতেই পি রে আবদ্ধ। কিছুমাত্র দুঃখ নাই, কারণ মূর্খ, স্বার্থপর, মিথ্যাবাদী, পরশ্রীকাতর, পরস্ত্রী-আকাঙ্খী, স্বেচ্ছাচারী এবং রোষপরবশ রাজার নিকট ইহা অপেক্ষা আর কি আশা করা যাইতে পারে? প্রাণদণ্ডের আদেশ হয় নাই, ইহাই শত লাভ, সহস্র প্রকারে ঈশ্বরে ধন্যবাদ।”
“ভাল কথা, ওমর আলী বন্দি হওয়ার কথাই শুনিলাম, প্রাণবধের কথা তো শুনিলাম না। শূলে জয়নাল আবেদীনের প্রাণদণ্ড হইবে, ঘোষণার কথাই কানে প্রবেশ করিল, শেষ কথাটা আর কেহ বলিল না। সংবাদ কি? এ অন্যায় যুদ্ধের পরিণাম কি? কী হইতেছে, কী ঘটিতেছে, কোন্ বীর কেমন তরবারি চালাইতেছে, বর্শা উড়াইতেছে, তীর চালাইতেছে, কই-কেহই তো কিছুই বলে না। আমাদের পক্ষের অতি সামান্য সামান্য শুভ সংবাদ লোকের মুখে ক্রমে অসামান্য হইয়া উঠে। কই-এ কয়েক দিন ভাল-মন্দ কোন সংবাদই তো শুনিতে পাই না। মন্দ কথা কানে আসিবার কথা নহে-ভাল কথার যখন একটা বর্ণও প্রকাশ হইতেছে না, তখন আর কী বলি।”
“যুদ্ধকাণ্ড বড়ই কঠিন! সামান্য বিবেচনার ত্রুটিতে সর্বস্ব বিনাশ। লক্ষ প্রাণীর প্রাণ মুহূর্তে ধ্বংস? বড়ই কঠিন ব্যাপার! দামেস্করাজ্যের যে সময় উপস্থিত, এ সময় যুদ্ধ করাই অন্যায়। যুদ্ধের কারণ দেখিতে হইবে, লাভালাভের প্রতিও লক্ষ্য রাখিতে হইবে, আপন আপন ক্ষমতার পরিমাণও বুঝিতে হইবে, ধনাগারের অবস্থাও ভাবিতে হইবে। আত্মীয়, স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পুরবাসী, প্রতিবেশী, সমকক্ষ, সমশ্রেণী জ্ঞাতিকুটুম্ব এবং রাজ্যের গণ্য, মান্য, ধনী ও সাধারণ প্রজার মনের ভাব, বিশেষ করিয়া অতি গোপনে কৌশলে পরীক্ষা করিতে হইবে। কেবল ধনভাণ্ডার খুলিয়া দিয়াই চক্ষু শীতল করিলে চলিবে না। আহার্য সামগ্রী কেবল মানুষের নয়, গরু-ঘোড়া ইত্যাদি পালিত জীবজন্তু সহ নগরস্থ প্রাণী মাত্রের কত দিনের আহার মজুত, প্রাণীর পরিমাণ, আহার্য সামগ্রীর পরিমাণ, আনুমানিক যুদ্ধকালের পরিমাণ করিয়া সমুদয় সাব্যস্ত, বন্দোবস্ত, আমদানি, রপ্তানি, পানীয় জলের সুবিধা পর্যন্ত করিয়া-তবে অন্য কথা।”
“এ যুদ্ধে এ কথাটা অগ্রেই ভাবা উচিত ছিল। মহাবীর মোহাম্মদ হানিফা বহুদূর হইতে আক্রমণ আশায় আসিয়াছেন। ভিন্ন দেশ, তাঁহার পক্ষে সহসা প্রবেশই দুঃসাধ্য। ইহার পর নগর আক্রমণে আশা। রাজবন্দিগৃহ হইতে পরিজনগণকে উদ্ধারের আশা-এজিদ্ বধ করিয়া দামেস্ক-সিংহাসন অধিকার করিবার আশা-এক-একটি আশা কম পরিমাণের আশা নহে। কথাচ্ছলে আমি ইহাকে এক প্রকার দুরাশাও বলিতে পারি, কারণ রাজ্যের সীমাই যুদ্ধের সীমা। সে সীমা অতিক্রম করিয়া নগরের প্রান্তভাগের প্রান্তরে এজিদের মহাকাল স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত। এক গাজী রহমানের বুদ্ধিকৌশলে সকল বিষয় সুন্দর বন্দোবস্ত। যাহা তাহাদের পক্ষে কঠিন ছিল, তাহাও তাহারা অনায়াসেই সুসিদ্ধ করিয়াছে। রাজ্য-সীমায় প্রবেশ দূরে থাকুক, নগরের প্রান্তসীমায় রঙ্গভূমি,-আর আশা কি!”
“অন্যায় সমরে রাজা স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে! কী পরিতাপ! যে রাজা রাজনীতির বাধ্য নহে, সমরনীতির অধীন নহে, স্বেচ্ছাচারিতাই যাহার মস্তিষ্কের বল, তাহার কী আর মঙ্গল আছে? প্রণয়, প্রেমে যে রাজা আসক্ত তাহার কি আর শ্রীবৃদ্ধি আছে? যুদ্ধবিগ্রহে পীরিত প্রণয়ের প্রসঙ্গ আসিতেই পারে না; মূল কারণ হওয়া দূরে থাকুক, সে নামেই সর্বনাশ। রাজনীতি সমরনীতি, এই দুইটি নীতির অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া যত জ্ঞানলাভ হইবে যত অভিজ্ঞতা জন্মিবে, ততই বুঝিতে পারা যাইবে যে, ইহার মধ্যে কি না আছে। জগতের সমুদয় ভাব স্বভাব, ব্যবহার, কার্যপ্রণালী, সমুদয় ঐ দুই নীতির মধ্যগত, কিন্তু ব্যবহারের ক্ষমতা, পরিচালনার বল, কার্যে পরিণত করিবার অধিকার সম্পূর্ণরূপে জগতে কোন প্রাণীর মস্তকে আছে কি না সন্দেহ।”
