ঐ দেখুন, জীবন্ত নরদেহ লৌহপিঞ্জরে আবদ্ধ হইয়া কী ভয়াবহ রূপ ধারণ করিয়াছে। অত্যাচারে, অনাহারে, অনিয়মে শরীর জীর্ণ, বর্ণ বিবর্ণ, চক্ষু কোটরে। জিহ্বা তালু শুষ্ক-কণ্ঠ নীরস। মুখাকৃতি বিকৃত, শরীর অন্তঃসারশূন্য অস্থিপুঞ্জের সমাবেশ। কাহারো হস্তপদে জিঞ্জির, কাহারো হস্তপদ মৃত্তিকার সহিত জিঞ্জিরে আবদ্ধ। কোন বন্দি মৃত্তিকাশয্যায় শায়িত অথচ হস্তপদ লৌহশৃঙ্খলে লৌহ-পেরেকে ভূতলে আবদ্ধ। কাহারো বক্ষঃস্থল পর্যন্ত ভূগর্ভে নিহিত, কাহারো গলদেশ পর্যন্ত মৃত্তিকায় প্রোথিত। ঐ দিকে দেখুন। নরাকার রাক্ষসগণ হাসিতে হাসিতে জীবন্ত জীবের অঙ্গ হইতে সুতীক্ষ্ণ ছুরিকা দ্বারা কেমন করিয়া চর্ম ছাড়াইতেছে, লবণ মাখাইতেছে, সাঁড়াশি দিয়া চক্ষু টানিয়া বাহির করিতেছে। দেখুন, দেখুন, লৌহশলাকা-উত্তপ্ত লৌহশলাকা-মানুষের হাতে-পায়ে হাতুড়ির আঘাতে বসাইয়া মৃত্তিকার সহিত কি ভাবে আঁটিয়া দিতেছে। এ সময়ে তাহার প্রাণে কী বলিতেছে, তাহা কী ভাবা যায়, না সহজ জ্ঞানে বোঝা যায়। হস্ত পদ মৃত্তিকার সহিত লৌহ পেরেকে আবদ্ধ, বক্ষে পাষাণ চাপা, চক্ষু ঊর্ধ্বে, কোন দিকে দৃষ্টির ক্ষমতা নাই, দৃষ্টি কেবল অনন্ত আকাশে! আর দেখুন, পা দুখানি কঠিনরূপে ঊর্ধ্বে বাঁধা, মস্তক নিন্মে হস্তদ্বয় ঝুলিয়া ছড়াইয়া পড়িয়াছে, জিহ্বা-মুখ হইতে বাহির হইয়া নাসিকা ঢাকিয়া চক্ষুর উপরে হেলিয়া পড়িয়াছে! চক্ষু উল্টাইয়া ফাটিয়া রক্ত পড়িবার উপক্রম হইতেছে, ইহাতেও নিস্তার নাই, সময়ে সময়ে র্দোরার আঘাতে শরীরের চর্ম ফাটিতেছে! রক্ত পড়িতেছে! কী মর্মঘাতী অন্তরভেদী ভীষণ ব্যাপার! আর দেখা যায় না! চলুন, অন্যদিকে যাই।
ঐ যে বৃদ্ধ বন্দি-লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ, নিবিষ্টচিত্তে ধ্যানে মগ্ন, হাবভাব দেখিয়া যেন চেনা চেনা বোধ হইতেছে। কোথায় যেন দেখিয়াছি মনে পড়ে। অনুমান মিথ্যা নহে। এই মহাত্মা মন্ত্রীপ্রবর হামান হজরত মাবিয়ার প্রধানমন্ত্রী, এজিদের পুণ্যাত্মা পিতার প্রিয় সচিব মহাজ্ঞানী বৃদ্ধ হামান, এজিদ্ আজ্ঞায় বন্দি-লৌহ শৃঙ্খলে আবদ্ধ! বৃদ্ধবয়সে এই যন্ত্রণা! মন্ত্রী প্রধান হামান কী যথার্থ বিচারে বন্দি? মহারাজ এজিদ্ কী অপরাধে ইহাকে কারাগারে নিক্ষেপ করিয়াছেন, তাহা কি মনে হয়? হানিফার সহিত যুদ্ধে অমত, দামেস্কাধিপতির স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে গমনে অমত প্রকাশ, এজিদের মতের সহিত অনৈক্য-সুতরাং এজিদ্ আজ্ঞায় বন্দি। দামেস্কনগরের ভূতপূর্ব দণ্ডধর হজরত মাবিয়ার দক্ষিণ হস্তই ছিলেন-এই হামান। এজিদের হস্তে পড়িয়া মহা ঋষির এই দুর্দশা! হায় রে জগৎ! হায় রে স্বার্থ!
দামেস্ক-সিংহাসনের চির-গৌরব সূর্য এজিদ-কল্যাণে অস্তমিত!
পিতার মাননীয়-পিতার ভালবাসার পাত্রকে কোন্ পুত্র অবজ্ঞা করিয়া থাকে? হামানের চিন্তা ভ্রমসঙ্কুল ছিল না। আশা ও দুরাশার পথে অযথা দণ্ডায়মান হইয়া কুহকে মাতাইয়া ছিল না-কারণ এ-আশা মানুষেরই হয়। মানুষের দৃষ্টান্তেই মানুষ শিক্ষা পায়। আশা ছিল,-মন্ত্রীপ্রবরের মনে আশা ছিল, এজিদ্ মাবিয়ার সন্তান, পিতৃ অনুগৃহীত বলিয়া অবশ্যই দয়া করিবে; বৃদ্ধ বয়সে নবীন রাজপ্রসাদে সুখী হইয়া নিশ্চিন্তভাবে ঈশ্বর আরাধনায় জীবনের অবশিষ্ট অংশ কাটিয়া যাইবে। নিয়তির বিধানে তাহা ঘটিল না। অথচ এজিদের স্বেচ্ছাচার বিচারে বৃদ্ধ বয়সে লৌহ-নিগড়ে আবদ্ধ হইতে হইল। শুনুন, মন্ত্রীপ্রবর মৃদুমৃদু স্বরে কি বলিতেছেন।
“রাজার অভাব হইলে রাজা পাওয়া যায়, রাজ-বিপ্লব ঘটিলে তাহারও শান্তি হয়, রাজ্যমধ্যে ঘোর বিদ্রোহানল প্রজ্বলিত হইলেও যথাসময়ে অবশ্যই নির্বাণ হয়, উপযুক্ত দাবী বুঝাইয়া দিলে সে দুর্দমনীয় তেজও একেবারে বিলীন হইয়া উড়িয়া যায়। মহামারী, জলপ্লাবন ইত্যাদি দৈবদুর্বিপাকে রাজ্যধ্বংসের উপক্রম বোধ হইলেও নিরাশ-সাগরে ভাসিতে হয় না-আশা থাকে। রাজার মজ্জা-দোষে কি মন্ত্রণা অভাবে রাজ্যশাসনে অকৃতকার্য হইলেও আশা থাকে। মূর্খ রাজার প্রিয়পাত্র হইবার আশায়, মন্ত্রণাদাতাগণ অবিচার অত্যাচার নিবারণে উপদেশ না দিয়া অহরহ তোষামোদের ডালি মাথায় করিয়া প্রতি আজ্ঞা অনুমোদন করাতেই যদি রাজা প্রজায় মনান্তর ঘটে, তাহাতেও আশা থাকে-সে ক্ষেত্রেও আশা থাকে। কিন্তু স্বাধীনতা-ধনে একবার বঞ্চিত হইলে সহজে সে মহামণির মুখ আর দেখা যায় না। বহু আয়াসেও আর সে মহামূল্য রত্ন হস্তগত হয় না। স্বাধীনতা-সূর্য একবার অস্তমিত হইলে পুনরুদয় হওয়া বড়ই ভাগ্যের কথা।”
“রাজা আর রাজ্য, এই দুইটি পৃথক্ কথা-পৃথক ভাব-পৃথক্ সম্বন্ধ। রাজা নিজ বুদ্ধি-দোষে অপদস্থ হউন, সমযুক্তি সুমন্ত্রণায় অবহেলা করিয়া পর-পদতলে দলিত হউন, স্বেচ্ছাচারিত্ব দোষে অধঃপাতে যাউন, তাহাতে রাজ্যের কি? কার্য অনুরূপ ফল, পাপানুযায়ী শাস্তি। স্বেচ্ছাচারী, সুমন্ত্রণা-বিদ্বেষী, নীতি বর্জিত, উচিতে বিরক্ত, এমন রাজার রাজ্যপাট যত সত্বর ধ্বংস হয়, ততই মঙ্গল, ততই রাজ্যের শনিক্ষয় ও ভবিষ্যৎ মঙ্গলের আশা। দামেস্ক-রাজ্যের আর মঙ্গল নাই। বিনা কারণে, প্রেমের কুহকে, পীরিতের দায়ে, প্রণয় বাসনায়, পরিণয়-ইচ্ছায়, যদি এই রাজ্য যথার্থই পরকরতলস্থ হয়, পরপদভরে দলিত হয়, আমাদের স্বাধীনতা লোপ হয়, তবে সে দুঃখের আর সীমা থাকিবে না, সে মনোকষ্টের আর ইতি হইবে না। রাজা প্রজারক্ষক, বিচারক, প্রজাপালক এবং করগ্রাহক। কিন্তু রাজ্যের যথার্থ অধিকারী প্রজা। দায়িত্ব প্রজারই অধিক। রাজ্য প্রজার, রক্ষার দায়িত্ব বাসিন্দামাত্রেরই। যদি রাজ্যমধ্যে মানুষ থাকে, হৃদয়ে বল থাকে, স্বদেশ বলিয়া জ্ঞান থাকে, পরাধীন শব্দের যথার্থ অর্থ বোধ থাকে, জন্মভূমির মূল্যের পরিমাণ জ্ঞান থাকে, একতা-বন্ধনে আস্থা থাকে, ধর্মবিদ্বেষে মনে মনে পরস্পর বৈরীভাব না থাকে, জাতিভেদ, হিংসা, ঈর্ষা এবং ঘৃণার ছায়া না থাকে, অমূল্য সময়ের প্রতি সর্বদা লক্ষ্য থাকে, আলস্যে অবহেলা এবং শৈথিল্যে বিরোধী যদি কেহ থাকে, চেষ্টা থাকে, বিদ্যার চর্চা থাকে, আর সর্বোপরি ঈশ্বরে ভক্তি থাকে, তবে যুগ-যুগান্তরে হউক, শতাব্দী পরে হউক, সহস্রাধিক বর্ষ গত হউক, কোনকালে হউক, অন্ধকারাচ্ছন্ন পরাধীনতা-গগনে স্বাধীনতা-সূর্যের পুনরুদয় আশা একবার করিলেও করা যাইতে পারে। কিন্তু দামেস্করাজ্যে সে আশা-আশা-মরীচিকা। দামেস্ক বীরশূন্য। দামেস্ক চিন্তাশীল দেশহিতৈষী মহোদয়গণের অনুগ্রহ হইতে বঞ্চিত। সে উপকরণে গঠিত কোন মস্তক আছে কি না, তাহাতেই বিশেষ সন্দেহও হইবে কি না তাহাতেও নানা সন্দেহ।”
