এজিদ ওমরের অবস্থা দেখিয়া তাড়াতাড়ি বল্লম হস্তে ওমর আলীর দিকে ধাইয়া যাইতেই, ওমর আলী সরিয়া গিয়া বলিলেন, “এজিদ এদিকে কেন আসিতেছ? যাও, হানিফার অস্ত্রাঘাত সহ্য কর গিয়া। ওমর আলী তোমার সৈন্য বিনাশ করিতে চলিল।”
দেখিতে দেখিতে ওমর আলী এজিদের চক্ষু হইতে অদৃশ্য হইলেন। এদিকে সিংহবিক্রমে ঘোর নিনাদে শব্দ হইতেছে, “জয়, জয়নাল আবেদীনের জয়! জয়, মদিনার সিংহাসনের জয়! জয়, নবভূপতির জয়!”
এজিদ ব্যস্ততাসহকারে চাহিতেই দেখিল যে, তাহার সৈন্যদলমধ্যে কোন দল পৃষ্ঠ দেখাইয়া মহাবেগে দৌড়িতেছে, কোন দল রণে ভঙ্গ দিয়া দাঁড়াইয়া আছে। বিপক্ষদলের আঘাতে অজ্ঞান জড় পদার্থের ন্যায় নীরবে আত্মবিসর্জন করিতেছে। আর রক্ষার উপায় নাই-কোথায় পতাকা, কোথায় বাদিত্রদল, কোথায় ধানুকী, কোথায় অশ্বারোহী, কোথায় অস্ত্র, কোথায় বেশভূষা-প্রাণ বাঁচানোই মূল কথা। এখন আর আশা নাই-এদিকে প্রহরী দ্বিতীয় অশ্বতরী যোগাইল। এজিদ ঘোড়ায় চড়িয়া দেখিল, রাজশিবির লুণ্ঠিত হইয়াছে, বিপক্ষদল অন্য অন্য শিবির লুণ্ঠন করিয়া আগুন লাগাইয়া দিয়াছে। সৈন্যগণ প্রাণভয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়িয়া পলাইতেছে! মস্হাব কাক্কা, ওমর আলী, আক্কেল আলী প্রভৃতি তাহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ যাইয়া অশ্বপৃষ্ঠ হইতে বর্শার আঘাতে ধরাশায়ী করিতেছে,-তরবারির আঘাতে শির উড়াইয়া দিতেছে। আবার জয়ধ্বনি, আবার সেই জনরব, এজিদ সেদিকে চাহিতেই দেখিল, অগণিত সৈন্য, সকলের হস্তেই উলঙ্গ অসি, মাঝে মাঝে ঊর্ধ্বদণ্ডে অর্ধচন্দ্র, আর পূর্ণতারা-সংযুক্ত দীন মোহাম্মদী নিশান, শুভ্র মেঘের আড়ালে উড়িতে উড়িতে জয়নাল আবেদীনের বিজয় ঘোষণা প্রকাশ করিতে করিতে নগরাভিমুখে যাইতেছে। এজিদ্ কিছুই বুঝিতে পারিল না, কেবল মধ্যে মধ্যে জয় ঘোষণায় জয়নালের নাম শুনিয়া মনে মনে সাব্যস্ত করিল যে, নিশ্চয় জয়নাল এই সৈন্য-প্রাচীরে বেষ্টিত হইয়া নগরে যাইতেছে-রাজপ্রাসাদে যাইতেছে। এখন কোথা যাই, কী করি! হতাশে চতুষ্পার্শ্বে দেখিতেই, দেখিল যে, সেই কালান্তক কাল-এজিদের মহাকাল, দ্বিতীয় আজরাইল-মোহাম্মদ হানিফা, রঞ্জিত কৃপাণহস্তে রক্তমাখা দেহে রক্তআঁখি ঘুরাইতে ঘুরাইতে, ‘কোথা এজিদ? কই এজিদ?’ বলিতে বলিতে আসিতেছেন। এজিদ প্রাণভয়ে অশ্বে কশাঘাত করিল। মোহাম্মদ হানিফাও এজিদের দ্রুতগতি অশ্বের দিকে দুল্দুল্ চালাইলেন।
০৩.এজিদ-বধ পর্ব
এজিদ-বধ পর্ব ০১ প্রবাহ
বন্দিগৃহ! বন্দিগৃহ সুবর্ণে নির্মিত, মহামূল্য প্রস্তরে খচিত, সুখসেব্য আরামের উপকরণে সুসজ্জিত হইলেও মহাকষ্টপ্রদ-যন্ত্রণাস্থান। সুখ-সম্ভোগের সুখময় সামগ্রী দ্বারা পরিপূরিত হইলেও বন্দিগৃহ, দেহদগ্ধকারী মহাকষ্টপ্রদ জ্বলন্ত অগ্নিময় নরকনিবাস। সুবর্ণ পাত্রে সুস্বাদু সুমিষ্ট সরস খাদ্য-পরিপূরিত রসনা পরিতৃপ্ত করিতে, সুন্দর বন্দোবস্তের সহিত সুব্যবস্থা থাকিলেও বন্দিগৃহ মহাকাল যমালয়। কোন বিষয়ের অভাব-অনটন না হইলেও সর্বতোভাবে মশান হইতে শ্মশান আদরের। অমূল্য রত্ন স্বাধীনতাধন যে স্থানে বর্জিত, সে স্থান অমরপুরীসদৃশ মনোনয়নমুগ্ধকর সুখ-সম্ভোগের স্থান হইলেও মানবচক্ষে অতি কদাকার ও জঘন্য। বুদ্ধিশক্তিসম্পন্ন সজীব প্রাণীর নয়নে কণ্টকসমাকীর্ণ বিসদৃশ বিজন বন। বিজন বনেও পশুদিগের স্বাধীনতা আছে, ইচ্ছানুসারে পরিভ্রমণ, স্বজাতি-স্বজন পরিদর্শন ক্ষমতা আছে, বন্দিখানায় বন্দির ভাগ্যে তাহাও নাই। সুতরাং বাধ্যবাধকতা, অধীন-অধীনতা সংস্রবে স্বর্গসুখও মহা যন্ত্রণাদায়ক। যন্ত্রণাদায়ক কেন? সুখস্বাচ্ছন্দ্যের আমূল পরিচ্ছেদক।
বন্দির মনে নানা ভাব! নানা চিন্তা, নানা কথা। কাহারো অন্তরে আত্মগ্লানির মহাবেগ শতধারে ও সহস্র প্রকারে ছুটিয়া হৃদয়ের অন্তঃস্থল পর্যন্ত অগ্নিদাহের ন্যায় দগ্ধ করিয়া উত্তমাঙ্গস্থিত সপ্তদ্বারে তাপের শেষ পর্যন্ত ক্রমে ক্রমে বহির্গত হইতেছে। কাহারো অনুতাপানল আক্ষেপ-ইন্ধনে পরিবর্ধিত হইয়া সতেজে রসনা আশ্রয়ে ছুটিয়া ছুটিয়া বাহির হইতেছে। কেহ মনের কথা মনভারে মনে মনে চাপিয়া হৃদয়ের রক্ত সমধিক হা-হুতাশে জলে পরিণত করিতেছে; কাহারো প্রতি লোমকূপ হইতে সে হা-হুতাশকৃত জলের কথঞ্চিৎ অংশ গর্মচ্ছলে বহির্গত হইয়া অবসাদে নির্জীব প্রায় করিতেছে। কেহ গত কথা স্মরণ করিয়া বন্দিখানাস্থিত মনুষ্যঘাতী জল্লাদের কুঠারহস্তে দণ্ডায়মান উচ্চমঞ্চের উপরিভাগপ্রতি স্থিরনেত্রে দৃষ্টি করিয়া মস্তিষ্কের মজ্জা পরিশুষ্ক করিতেছে! বন্দিমাত্রই যে ন্যায় ও যথার্থ বিচারে দণ্ডিত-তাহা নহে। ভ্রান্তি-ভ্রম মানবেই সম্ভবে! ইহাও নিশ্চয়, নির্ভুল অন্তর জগতে নাই। ভ্রমশূন্য মজ্জাও মানুষের নাই। ইহার পর নিরপেক্ষ সদ্বিচারক সংখ্যা অতি অল্প। কত বন্দি-ভ্রমে, পক্ষপাতিত্বে, অনুরোধে, বিভ্রাটে আজীবন ফাটকে আটক রহিয়াছে।
পাঠক! এই তো আপনার সম্মুখে দামেস্ক কারাগারের অবিকল চিত্র। সুবিচার, অবিচার, হিংসা, দ্বেষে কত বন্দি, কত স্থানে কত প্রকার শাস্তিভোগ করিতেছে, বন্দিখানায় তুল্য কোন খানাই জগতে নাই। প্রহরীদল মানবাকার হইলেও স্বভাব ও ব্যবহারে পশু হইতেও নীচ। তাহাদের শরীর যে রক্ত-মাংস-হৃদয়-সংযোগে গঠিত, ইহা কিছুতেই বিশ্বাস হয় না। চতুষ্পার্শ্বে প্রাচীরবেষ্টিত স্থানটুকুই তাহাদের রাজ্য। সে রাজ্যের অধীশ্বরই তাহারা। প্রবল প্রতাপে আধিপত্য করার কল্যাণে, রাক্ষস ভাব, পশু ভাব, অমানুষিক ভাব আসিয়া তাহাদের মস্তকে নির্ভর করিয়াছে। দয়া, মায়া, অনুগ্রহ, স্নেহ, ভালবাসা অন্তর হইতে একেবারে সরিয়া পড়িয়াছে। মুখখানিও রসনাসহকারে এমনই বিকট ভাব ধারণ করে যে, কর্কশ, নীরস, অন্তর্ঘাতী, মর্মপীড়িত, নিদারুণ বাক্য-রোগে সর্বদা বন্দিদিগকে জর্জরিত করিতে থাকে। তদুপরি যথা-অযথা যন্ত্রণা-পদাঘাত-দণ্ডাঘাত বন্দিভাগ্যে কথায় কথায় হইতে থাকে। দামেস্ক নগরের এজিদের বন্দিগৃহ নরক হইতেও ভয়ানক। শাস্তির মাত্রাও সেই প্রকার। ক্রমে দেখিতে পাইবেন বিধির বিধানে, এজিদ্ আজ্ঞায়, মারওয়ানের মন্ত্রণায়, প্রভু হোসেন পরিবার, জয়নাল আবেদীন, সকলেই ঐ বন্দিখানায় বন্দি। কিন্তু ইহাদের প্রতি কোনরূপ শাস্তির বিধান নাই। পৃথক্ খণ্ডে,-ভিন্ন কক্ষে ইহাদের স্থান নির্ধারিত হইয়াছে। দৈনিক আহারের ব্যবস্থা বন্দিগৃহের প্রধান অধ্যক্ষ হস্তে। তিনি যে সময় বিবেচনা করেন, সে সময় শুষ্ক রুটি এবং একপাত্র জল, যাহা বরাদ্দ আছে, তাহাই দিতে অনুমতি করেন। অন্য অন্য বন্দির ভাগ্যে তাহাও নাই।
পাঠক! ঐ দেখুন! দামেস্ক বন্দিগৃহে শাস্তির চিত্র দেখুন! অধিকক্ষণ দেখাইব না। কোন্ চক্ষু এই অমানুষিক ব্যাপার দেখিতে ইচ্ছা করে?-তবে মহারাজ এজিদের বিচার-চিত্র অনেক দেখিতেছেন, বন্দিখানার চিত্রও দেখুন।
