দুইজনে কথা হইতেছে, এমন সময়ে এজিদ্ ওমরের নিকট দিয়া যাইতেই অলীদকে দেখিয়া অশ্ব-বল্গা ফিরাইল।
ওমর বলিতে লাগিল, “বাদশা নামদার! দেখুন আপনার প্রধান সেনাপতির বীরত্ব দেখুন।”
এজিদ্ দুঃখিতভাবে বলিতে লাগিল, “অলীদ! এতদিন এত যত্ন করিলাম, পদবৃদ্ধি করিলাম, কত পারিতোষিক দান করিলাম, কত অর্থ সাহায্য করিলাম, তাহার প্রতিফল, তাহার পরিণামফল বুঝি ইহাই হইল?”
“আমি নিমক হারামি করি নাই, কোন লাভের বশীভূত হইয়া আপনার শত্রুদলে মিশি নাই। শত্রু-শিবিরে যাইতেছিলাম-দৈব-নির্বন্ধে ধরা পড়িলাম। কি করি, পরাভব স্বীকার করিয়া সত্যধর্ম গ্রহণ করিয়াছি। পরকালে মুক্তির পথ পরিষ্কার করিতেই আজ কাফের বধে অগ্রসর হইয়াছি-অস্ত্র ধরিয়াছি।”
এজিদ্ রোষে অধীর হইয়া বলিল, “ওমর! এখনো অলীদ-শির মৃত্তিকায় লুণ্ঠিত হয় নাই, ইহাই আশ্চর্য।”
এজিদ্ ওমরকে সজোরে পশ্চাৎ করিয়া অলীদ প্রতি আঘাত করিল। কী দৃশ্য! কী চমৎকার দৃশ্য!!
অলীদ সে আঘাত বর্মে উড়াইয়া বলিল, “আমি আপনার প্রতি অস্ত্র নিক্ষেপ করিব না। বিশেষ মহাবীর মোহাম্মদ হানিফা, যিনি আজ স্বয়ং যুদ্ধভার গ্রহণ করিয়া সর্বপ্রধান সেনাপতি পদে বরিত হইয়াছেন, তাঁহার নিষেধ আছে।”
এজিদ্ বলিল, “ওরে মূর্খ! একরাত্রি মূর্খদলের সহবাসে থাকিয়াই তোর দিব্যজ্ঞান জন্মিয়াছে! স্বয়ং রাজা সেনাপতি! তবে বরিত হইল কে? রাজমুকুট শোভা পাইল কাহার শিরে? রাজা স্বয়ং যুদ্ধে আসিলে ক্ষতি কি? সেনাপতি উপাধি লইয়া স্বয়ং রাজা যুদ্ধক্ষেত্রে আসিয়া থাকে রে বর্বর?”
“এজিদ্ নামদার! আমি বর্বর নহি। রাজা সেনাপতিপদ গ্রহণ করে না তাহা আমি বিশেষরূপে জানি। মোহাম্মদ হানিফা তাঁহার রাজ্যের রাজা, মদিনার কে?”
“মদিনায় আবার কোন রাজার আবির্ভাব হইল?”
মহাশয়, যিনি মদিনার রাজা,-তিনি দামেস্কের রাজা,-তিনি মুসলমান রাজ্যের রাজা-সেই রাজরাজেশ্বর, মহারাজাধিরাজ আজ রাজপদে বরিত হইয়াছেন। রাজমুকুট তাঁহারই শিরে শোভা পাইতেছে। রাজঅস্ত্র তাঁহারই কটিদেশে দুলিতেছে।”
“অলীদ, তোমার এরূপ বুদ্ধি না হইলে ভিখারীর ধর্ম গ্রহণ করিবে কেন? আমি শুনিয়াছি, মোহাম্মদ হানিফাকে মদিনার লোক রাজা বলিয়া স্বীকার করিয়াছে। সমগ্র মুসলমান রাজ্য মোহাম্মদ হানিফার নামে কম্পিত হয়,-কেমন নূতন ধার্মিক?”
“ধর্মের সঙ্গে হাসি-তামাশা কেন? আপনার জ্ঞান থাকিলে কি আজ আপনি হানিফার বিরুদ্ধে যুদ্ধডঙ্কা বাজাইতে পারিতেন? আপনি মন্ত্রীহারা, জ্ঞানহারা, আত্মহারা হইয়াছেন। অতি অল্প সময়মধ্যেই রাজ্যহারা হইবেন। আপনার জীবন হরণের জন্য মহাবীর হানিফা আছেন। আমাদের ক্ষমতার মধ্যে যাহা তাহার কথা বলিলাম। বলুন, আজিকার যুদ্ধে স্বার্থ কী?”
“হানিফার জীবন শেষ, জয়নাল আবেদীনের বধ-মদিনার সিংহাসন লাভ। আর স্বার্থের কথা কী শুনিবে? সে স্বার্থ অন্তরে-হৃদয়ে চাপা।”
“ঈশ্বরের ইচ্ছায় সকলই অন্তরে চাপা থাকিবে। আর মুখে যাহা বলিলেন, তাহা কেবল মুখেই থাকিল। বলুন তো মহাশয়, জয়নাল আবেদীনকে কী প্রকারে বধ করিবেন?”
“কেন, বন্দির প্রাণবধ করিতে আর কথা কী?”
“তবে বুঝি রাত্রের কথা মনে নাই? থাকিবে কেন, কথাগুলি সমুদয় পেয়ালায় গুলিয়া পেটে ঢালিয়াছেন?”
এজিদ্ একটু চিন্তা করিয়া বলিল, “হাঁ হাঁ মনে হইয়াছে; জয়নাল বন্দিগৃহ হইতে পলাইয়াছে। আমার রাজ্য-যাবে কোথা?”
“যেখানে যাইবার সেখানে গিয়াছে। ঐ শুনুন, সৈন্যগণ কাহার জয় ঘোষণা করিতেছে।”
“জয়নাল কি হানিফার সঙ্গে মিশিয়াছে?”
“আপনিই বিবেচনা করিয়া দেখুন, মোহাম্মদ হানিফা আজ সেনাপতি। সৈন্যগণ সহস্রমুখে প্রতি মুহূর্তে নবভূপতির জয় ঘোষণা করিতেছে। আর কী শুনিতে চাহেন?”
এজিদ্ মহাব্যস্তে বলিল, “অলীদ! তুমি আমার চিরকালের অনুগত, অধিক আর কি বলিব, ঐদিকে যখন গিয়াছ, তখন মন ফিরাও হানিফার সৈন্যশিরেই তোমার অস্ত্র বর্ষিতে থাকুক। আর কি বলিব আমার এই শেষ কথা-আমি তোমাকে দামেস্ক রাজ্যের প্রধানমন্ত্রীত্বপদ দান করিব।”
“ও-কথা মুখে আনিবেন না। আপনি আমার সহিত যুদ্ধ করুন, না হয় আমার অস্ত্রের সম্মুখ হইতে সরিয়া যাউন। আমি জয়নাল আবেদীনের দাস, মোহাম্মদ হানিফার আজ্ঞাবহ। আপনার মন্ত্রী হইয়া লাভ যাহা, তাহা তো স্বচক্ষেই দেখিতেছেন। ঐ দেখুন, বর্শার অগ্রভাগ দেখুন, আপনার এক মন্ত্রী একশত মারওয়ান-রূপ ধারণ করিয়া বর্শার অগ্রভাগে বসিয়া আছে।”
এজিদ্ মহাক্রোধে বলিল, “নিমকহারাম, কমজাৎ, কমিন আমার সঙ্গে তামাশা? ইহকালের মত তোর কথা কহিবার পথ বন্ধ করিতেছি।” সজোরে অলীদ-শির লক্ষ্য করিয়া আঘাত করিল। অলীদ সে আঘাত বাম হস্তস্থিত বর্শাদণ্ড দ্বারা উড়াইয়া সরিতেই-ওমর অলীদের গ্রীবা লক্ষ্যে আঘাত করিল। বহুদূর হইতে ওমর আলী এই ঘটনা দেখিয়া নক্ষত্রবেগে অলীদের নিকট আসিয়া দেখিলেন যে, এজিদ্ ও ওমর উভয়ে অলীদের প্রতি অস্ত্র নিক্ষেপ করিতেছে।
ওমর আলী চক্ষু ঘূর্ণিত করিয়া বলিলেন, “এজিদ্! এদিকে কেন? মোহাম্মদ হানিফার দিকে যাও। সেদিনেও দেখিয়াছ, আজিও বলিতেছি, তোমার প্রতি কখনোই অস্ত্র নিক্ষেপ করিব না। তোমার শোণিতে হানিফার তরবারি রঞ্জিত হইবে। যাও, সেদিকে যাও,-আজ-”
ওমর আলীর কথা শেষ হইতে-না-হইতেই ওমর অলীদ প্রতি দ্বিতীয় আঘাত করিল। সঙ্গে সঙ্গে এজিদ্ অলীদের অশ্বকে বর্শা দ্বারা আঘাত করিয়া বাম পার্শ্ব হইতে দক্ষিণ পার্শ্ব পর্যন্ত পার করিয়া দিল। অশ্ব কাঁপিতে কাঁপিতে মৃত্তিকায় পড়িয়া গেল। ওমর এই সুযোগে অলীদের পৃষ্ঠে আঘাত করিল, বর্শাফলক পৃষ্ঠ ভেদ করিয়া বক্ষঃস্থল হইতে রক্তমুখে বহির্গত হইল। অলীদ ঈশ্বরের নাম করিতে করিতে শহীদ হইলেন।
ওমর আলী এজিদকে দেখিয়া একটু দূরে ছিলেন, অলীদের অবস্থা দর্শনে অসি সঞ্চালন করিয়া ভীমনাদে ওমরের দিকে আসিয়া প্রথমতঃ ওমরের অশ্বগ্রীবা লক্ষ্যে আঘাত করিতেই, বাজীরাজ শিরশূন্য হইয়া মৃত্তিকায় পড়িয়া গেল। বাম পার্শ্বে ফিরিয়া দ্বিতীয় আঘাতে এজিদের অশ্ব-মস্তক মৃত্তিকায় লুটাইয়া দিলেন। পশ্চাৎ ফিরিয়া দেখেন যে, ওমর এখনো সুস্থির হইয়া দণ্ডায়মান হইতে পারে নাই; তৃতীয় আঘাতে বৃদ্ধ ওমরকে ধরাশায়ী করিলেন।
