ওমর শিবিরের বাহিরে আসিয়া পূর্ব হইতে তুমুলরবে বাজনা বাজাইতে আদেশ করিলেন। মনের উৎসাহে আনন্দে সৈন্যগণ বিষম বিক্রমে দণ্ডায়মান হইল। এদিকে এজিদ্ স্বসাজে,-মণিময় বীরসাজে সজ্জিত হইয়া শিবিরের বাহির হইয়া বলিল, “সৈন্যগণ! মারওয়ানের জন্য দুঃখ নাই, অলীদের কথা তোমরা কেহ মনে করিয়ো না। আমার সৈন্যাধ্যক্ষ মধ্যে বিস্তর অলীদ, বহু মারওয়ান এখনো জীবিত রহিয়াছে। কোন চিন্তা নাই। বীরবিক্রমে আজ হানিফাকে আক্রমণ কর। আমি আজ পৃষ্ঠপোষক। এজিদের সৈন্য-বিক্রম, হানিফার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হাসান দেখিয়াছে, কারবালা-প্রান্তরে হোসেন দেখিয়াছে, আর আমি আজ দামেস্ক প্রান্তরে হানিফাকে দেখাইব। মার হানিফা, মার বিধর্মী, তাড়াও মুসলমান। উহারা বিষম বিক্রমে আসিতেছে, আমরাও মহাপরাক্রমে আক্রমণ করিব। হানিফার যুদ্ধের সাধ আজ মিটাইব। সমস্বরে দামেস্ক-সিংহাসনের বিজয়-ঘোষণা করিয়া ক্রমে অগ্রসর হও।”
এজিদ্ মহাবীর। এজিদের সৈন্যগণও অশিক্ষিত নহে-প্রভুর সাহসসূচক বচনে উত্তেজিত হইয়া বীরদর্পে পদনিক্ষেপ করিতে লাগিল। আজিকার যুদ্ধ চমৎকার! কোন দলে ব্যূহ নাই, শ্রেণীভেদ নাই-আত্মরক্ষার ভাবেও কেহ দণ্ডায়মান হয় নাই। উভয় দলই অগ্রসর, উভয় দলেরই সম্মুখে গমনের আশা।
এজিদ্ সৈন্যদলের পশ্চাৎ পশ্চাৎ যাইতেছে এবং সুযোগ মত হানিফার সৈন্যদলের আগমনও দেখিতেছে-অগণিত সৈন্য, সর্বাগ্রে বর্শাধারী। বিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেখিল, মানবশরীরের খণ্ডিত অংশ সকল বর্শায় বিদ্ধ এবং বর্শাধারিগণের মুখে এই কথা,-“এই সেই মারওয়ান, প্রধানমন্ত্রী মারওয়ান, এজিদের প্রিয়সখা মারওয়ান।” এজিদ্ সকলই বুঝিল, মনে মনে দুঃখিতও হইল। কিন্তু প্রকাশ্যে সে দুঃখ-চিহ্ন কেহ দেখিতে পাইল না, হাবভাবেও কেহ বুঝিতে পারিল না। সদর্পে বলিল, “সৈন্যগণ! মারওয়ানের খণ্ডিতদেহ দেখিয়া কেহ ভীত হইও না, হাতে পাইয়া সকলেই সকল কার্য করিতে পারে। শীঘ্র শীঘ্র পদ নিক্ষেপ কর, বজ্রনাদে আক্রমণ কর, অশনিবৎ অস্ত্রের ব্যবহার কর। আমরাও গাজী রহমানের দেহ সহস্র খণ্ডে খণ্ডিত করিয়া শৃগাল-কুক্কুর দ্বারা ভক্ষণ করাইব। কর আঘাত, কর আঘাত।”
যেমন সম্মিলন, অমনি অস্ত্রের বর্ষণ। কী ভয়ানক যুদ্ধ! কী ভীষণ কাণ্ড! প্রান্তরময় সৈন্য, প্রান্তরময় অস্ত্র, প্রান্তরময় সমর। উভয় দলেই আঘাত-প্রতিঘাত আরম্ভ হইল। অসি, বর্শা, খ র, তরবারি সকলই চলিল। কী ভয়ানক ব্যাপার! যে যাহাকে সম্মুখে পাইতেছে, সে তাহার প্রতি অস্ত্র নিক্ষেপ করিতেছে। পরিচয় নাই, পাত্রাপাত্র প্রভেদ নাই! সম্মিলনস্থলে উভয় দলে যে বাধা জন্মিয়াছে, তাহাতে কোন পক্ষেরই আর অগ্রসর হইবার ক্ষমতা হইতেছে না। কেবল সৈন্যক্ষয়-বলক্ষয় হইতেছে মাত্র। ওমর আলী মস্হাব কাক্কা প্রভৃতি দুই-এক পদ অগ্রসর হইতেছেন, কিন্তু টিকিতে পারিতেছেন না। মোহাম্মদ হানিফা এখনো তরবারি ধরেন নাই, কেবল সৈন্যদিগকে উৎসাহ দিতেছেন, মুহূর্তে মুহূর্তে ভৈরব নিনাদে দামেস্ক-প্রান্তর কাঁপাইয়া তুলিতেছেন। সৈন্যগণ সময় সময় “আল্লাহু আক্বার” শব্দ করিয়া গগন পর্যন্ত কাঁপাইয়া তুলিতেছেন।
এখনো মোহাম্মদ হানিফা তরবারি ধরেন নাই। দুল্দুলে কশাঘাত করিবার সৈন্য শ্রেণীর এক সীমা হইতে অন্য সীমা পর্যন্ত মুহূর্তে মুহূর্তে ঘুরিয়া দেখিতেছেন। যেখানে একটু মন্দভাবে তরবারি চলিতেছে, সেই খানেই সেই হইয়া দুই-চারিটি কথা কহিয়া কাফের বধে উৎসাহ দিতেছেন। কী লোমহর্ষণ সমর! কী ভয়ানক সমর! বিনা মেঘে বিজলী খেলিতেছে (অস্ত্রের চাক্চিক্য), হুহুঙ্কারে গর্জন হইতেছে (উভয় দলের সৈন্যগণের বিকট শব্দ)। অজস্র শিলার ঘর্ষণ হইতেছে (খণ্ডিত দেহ)! মুষলধারে বৃষ্টি হইতেছে (দেহ নির্গত রুধির)! কী দুর্ধর্ষ সমর!
বেতনভোগী সৈন্যগণ-ইহারা হানিফার কে, এজিদেরই-বা কে? হায় রে অর্থ! হায় রে হিংসা! হায় রে ক্রোধ! হানিফার সৈন্যগণ আজ অজ্ঞান; মদিনাবাসীরা বিহ্বল; পদতলে, অশ্ব পদতলে-নরদেহ, নরশোণিত। ক্রমেই খণ্ডিত দেহ, খণ্ডিত অশ্ব,-বিষম সমর।
দৈবাধীন ওত্বে অলীদ আর ওমরের যুদ্ধ কী চমৎকার দৃশ্য। এ দৃশ্য কে দেখিবে? ঈশ্বরের মহিমায় যাহার অণুমাত্র সন্দেহ আছে, সেই দেখিবে। কাল ভ্রাতৃভাব, আজ শত্রুভাব,-এ লীলার অন্ত মানুষে কী বুঝিবে? ওমর বলিল, “নিমকহারাম! নিশীথ সময়ে শিবির হইতে বাহির হইয়া শত্রু-দলে মিশিলে? প্রভাত হইতে হইতে আশ্রয়দাতা পালনকর্তা, তোমার চির উপকারকর্তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরিলে? ধিক্ তোমার অস্ত্রে! ধিক্ তোমার মুখে! নিমকহারাম! ধিক তোমার বীরত্বে!”
ওত্বে অলীদ বলিলেন, “ভ্রাতঃ ওমর! ক্রোধে অধীর হইয়া নীচত্ব প্রকাশ করিয়ো না, যথার্থ তত্ত্ব না জানিয়া কটুবাক্য ব্যবহার করিয়ো না। ছি ছি! তুমি প্রবীণ-প্রাচীন। সময়-গুণে তোমারও কী মতিভ্রম ঘটিল? ছি ছি ভ্রাতঃ! স্থিরভাবে কথা বল, কথায় অনিচ্ছা হয়, অস্ত্রের দ্বারা সদালাপ কর।”
“তোমার সঙ্গে কথা কী? তুমি বিশ্বাসঘাতক, তুমি নিমকহারাম, তুমি বীরকুলের কুলাঙ্গার!”
“দেখ ভাই ওমর! আমি বিশ্বাসঘাতক নহি, নিমকহারাম নহি, কুলাঙ্গারও নহি। মারওয়ানের সঙ্গে আমি বন্দি হইয়াছিলাম। পরাভব স্বীকারে আত্মসমর্পণ করিয়া সত্যধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছি। সেই একেশ্বরের জ্বলন্ত ভাব আমার হৃদয়ে নিহিত হইয়াছে, চক্ষের উপর ঘুরিতেছে; তাই বিধর্মীমাত্রই আমার শত্রু, দেখিলেই বধের ইচ্ছা হয়, কারণ সে নরাকার পশু যে নিরাকার ঈশ্বরকে সাকারে পূজা করে। আবার যাহার অধীনতা স্বীকার করিয়াছি, তাহার মিত্র-মিত্র, তাহার শত্রু-পরম শত্রু। আর কী বলিব তোমাকে গালি দিব না। তোমার কার্য তুমি কর, আমার কার্য আমি করি।”
