সমস্বরে সম্মতিসূচক আনন্দধ্বনির প্রতিধ্বনিতে গগন আচ্ছন্ন করিল! মোহাম্মদ হানিফা ‘বিস্মিল্লাহ্’ বলিয়া রাজমুকুট, মণিমুক্তাখচিত তরবারি জয়নাল আবেদীনের সম্মুখে রাখিয়া দিলেন। ওমর আলী, মস্হাব কাক্কা, গাজী রহমান প্রভৃতি যথারীতি অভিবাদন করিয়া, ঈশ্বরের গুণানুবাদ সহিত জয়নাল আবেদীনের জয় ঘোষণা করিলেন। ভিন্ন ভিন্ন দেশীয় প্রাচীন রাজগণ নতশিরে অভিবাদন করিয়া উপঢৌকনাদি জয়নালের সম্মুখে রাখিয়া অন্তরের সহিত আশীর্বাদ করিলেন। মদিনা এবং নানা দেশ বিদেশীয় সৈন্যগণ অবনতমস্তকে নবীন রাজার সম্মুখে অস্ত্রাদি রাখিয়া সমস্বরে মদিনা-সিংহাসনের জয় ঘোষণা করিলেন।
মোহাম্মদ হানিফা পুনরায় বলিলেন, “ভ্রাতৃগণ! এখন সকলেই স্ব-স্ব অস্ত্র পুনঃ ধারণ করিয়া, প্রথমে ঈশ্বরের নাম, তাহার পর নূরনবী মোহাম্মদ নাম এবং সর্বশেষে নবীন ভূপতির জয় ঘোষণা করিয়া বীরদর্পে দণ্ডায়মান হও।”
হানিফার কথা শেষ না-হইতেই গগনভেদী শব্দ হইল, ঈশ্বরের নামের পর, নূরনবী মোহাম্মদের প্রশংসার পর, “জয় মদিনা সিংহাসনের জয়-জয় নবীন ভূপতির জয়,-জয়নাল আবেদীন মহারাজের জয়” শব্দ হইতে লাগিল।
আবার মোহাম্মদ হানিফা বীরদর্পে বীরভাবে বলিতে লাগিলেন, “ভ্রাতৃগণ! এই অসিধারণ করিলাম, বীর বেশে সজ্জিত হইলাম,-আর ফিরিয়া না তরবারি কোষে আবদ্ধ করিব না। যতদিন এজিদ্ বধ, পরিজনগণের উদ্ধার না হয়, ততদিন এই বেশ-এই বীর বেশ অঙ্গে থাকিবে। আমিও আজ তোমাদের সঙ্গী, আমিও আজ সৈন্য, আমিও আজ জয়নালের আজ্ঞাবহ। সকলেরই আজ এই প্রতিজ্ঞা-ধর্ম প্রতিজ্ঞা। এই যাত্রাতেই হয় এজিদ্-বধ না হয় আমাদের জীবনের শেষ। দিবা হউক, নিশা আগমন করুক; আবার সূর্যের উদয় হউক,-এজিদ্-বধ। এজিদ্-বধ না-হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই বেশ-এই বীর বেশ। বিশ্রামের নাম করিব না, যুদ্ধে ক্ষান্ত দিব না, পশ্চাৎ হটিব না-জীবন পণ,-হানিফার জীবন পণ,-এজিদ্-বধে সকলের জীবন পণ। আজিকার যুদ্ধে বিচার নাই, ব্যূহ নাই, কোন প্রকার বিধি-ব্যবস্থা নাই, মার কাফের, জ্বালাও শিবির।-কাহারো অপেক্ষা কেহ করিবে না, কাহারো উপদেশের প্রতি কেহ লক্ষ্য রাখিবে না, আজ সকলেই সেনাপতি-সকলেই সৈন্য। সকলের মনে যেন এই কথা মুহূর্তে মুহূর্তে জাগিতে থাকে, মহাত্মা হাসান-হোসেনের পরিজনগণের উদ্ধারসাধন করিতে জীবন পণ,-দামেস্করাজ্য সমভূমি করিতে জীবন পণ।”
“ভ্রাতৃগণ! মনে কর, আজ আমাদের জীবনের শেষ দিন এবং শেষ সময়। শত্রুদল চক্ষে দেখা ভিন্ন আপন সহযোগী-সাহায্যকারী সৈন্য-সামন্তের প্রতি-এমন কি, স্ব-স্ব শরীরের প্রতি কেহ লক্ষ্য করিবে না। আজ হাসানের শোক, হোসেনের শোক, এই তরবারিতে নিবারণ করিব। আজ কাফের বধ করিয়া কারবালার প্রতিশোধ দামেস্ক-প্রান্তরে লইব। আজ কাফেরের দেহ-বিনির্গত শোণিতে লহুর নদী বহাইব,-মরুভূমে রক্তের প্রবাহ ছুটাইব। শত্রুর মনোকষ্ট দিতে আজ কাহার বাধা মানিব না-কোন কথা শুনিব না। ঐ জাহান্নামী কাফের মারওয়ানের মস্তক কাটিয়া এক বর্শায় বিদ্ধ কর। পাপীর দেহ শতখণ্ডে খণ্ডিত কর। মস্তক এবং খণ্ডিত দেহ সকল বর্শাগ্রে বিদ্ধ করিয়া ঘোষণা করিতে করিতে অগ্রে অগ্রে যাও এবং মুখে বল, “এই সেই কাফের মারওয়ান, এই সেই মন্ত্রী মারওয়ান, এই সেই এজিদের প্রিয়সখা মারওয়ান।”
হানিফার মুখের কথা থাকিতে থাকিতে, মদিনাবাসীর কয়েকজন নবীন যোধ, অসি ঘুরাইতে ঘুরাইতে ছুটিয়া আসিয়া, “এই সেই মারওয়ান, এই সেই মন্ত্রী মারওয়ান, এই সেই এজিদের প্রিয়সখা মারওয়ান, এই সেই নরাধম পিশাচ” ইত্যাদি শত শত প্রকার সম্বোধন করিয়া চক্ষের নিমিষে মারওয়ানের দেহ-এক, দুই, তিন ইত্যাদি ক্রমে গণিয়া শত খণ্ডে খণ্ডিত করিলেন। বর্শার অগ্রে বিদ্ধ করিতে ক্ষণকাল বিলম্ব হইল না।
মোহাম্মদ হানিফা বলিলেন, “ভ্রাতৃগণ! আজ হানিফা এই অস্ত্র ধরিল, পুনরায় বলিতেছি, ধর্মতঃ প্রতিজ্ঞা করিতেছি, এজিদ্-বধ না করিয়া এই অস্ত্র আর কোষে রাখিব না। ভ্রাতৃগণ! আমার অসহায় পরিজনদিগের কথা মনে রাখিয়ো, এই আমার প্রার্থনা। গাজী রহমান উপযুক্ত সৈন্য লইয়া জয়নাল আবেদীনসহ আমাদের পশ্চাৎ আসিতে থাকুন। যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছি, আর ফিরিব না। আর শিবিরের আবশ্যক নাই। বিশ্রাম-উপযোগী দ্রব্যের প্রয়োজন নাই। জীবনরক্ষা হইলে আজই সুবিস্তৃত দামেস্করাজ্য লাভ হইবে। জয়নালকে সিংহাসনে বসাইতে পারিলে বিশ্রামবিলাস সকলই পাইব। আর যদি জীবন শেষ হয়, তবে কোন দ্রব্যে আবশ্যক হইবে না। ভাঙ্গ শিবির, লুটাও জিনিস।”
এই কথা বলিয়া মোহাম্মদ হানিফা অশ্বারোহণ করিলেন। সকলে সমস্বরে ঈশ্বরের নাম সপ্তবার উচ্চারণ করিয়া ঘোরনাদে মহারাজ জয়নালের জয়-ঘোষণা করিয়া দুই-এক পদ অগ্রসর হইতে লাগিলেন। মারওয়ানের খণ্ডিত দেহ একশত বর্শায় বিদ্ধ হইয়া অগ্রে অগ্রে চলিল। শিবিরের বাহির হইয়া পুনরায় ভীমনাদে ঈশ্বরের নাম করিয়া এজিদ-বধে যাত্রা করিলেন। সম্মুখে শত শত বর্শাধারী সমস্বরে বলিতে লাগিল, “এই সেই কাফের মারওয়ান, এই সেই মন্ত্রী মারওয়ান, এই সেই এজিদের প্রিয়সখা মারওয়ান।” আর মুহূর্তে মুহূর্তে ঈশ্বরের নাম এবং নবীন রাজার জয়ধ্বনিতে দামেস্ক-প্রান্তর কম্পিত হইতে লাগিল।
এজিদের মোহনিদ্রা ভাঙ্গিয়া গেল। মস্তক ঘুরিতেছে, সঙ্গে সঙ্গে মনের বেদনাও আছে। শরীর অলস, স্ফূর্তিবিহীন, দুর্বল। নিদ্রাভঙ্গ হইয়াছে, শয্যা হইতে উঠিয়া বসিতে পারে না। কিন্তু উপস্থিত ভীষণ শব্দ কর্ণকুহরে প্রবেশ করিতেই এজিদ্ সেই আরক্তিম নয়নে পরিশুষ্ক মুখে বিকৃত মস্তকে শয্যা হইতে চমকিয়া উঠিলেন। অন্তর কাঁপিতে লাগিল। মহা অস্থির হইয়া শিবিরদ্বার পর্যন্ত আসিয়া দেখিলেন যে, মহা সঙ্কটকাল উপস্থিত। কোথায় মারওয়ান? কোথায় অলীদ? এ দুঃসময়ে কাহারো সন্ধান নাই। ওমর এবং অন্যান্য সেনাপতিগণ আসিয়া অভিবাদনপূর্বক দণ্ডায়মান হইল। রাত্রের ঘটনার আভাস বলিতে সমুদয় কথা এজিদের মনে হইল। বীরদর্পে বলিতে লাগিল-“ওমর! তুমিই আজ প্রধান সেনাপতি। চিন্তা কী? মারওয়ান গিয়াছে, অলীদ গিয়াছে এজিদ্ আছে। চিন্তা কী? যাও যুদ্ধে। দাও বাধা-মার হানিফা। তাড়াও মুসলমান। ধর তরবারি! আমি এখনই আসিতেছি, আজ হানিফার যুদ্ধ-সাধ, জীবনের সাধ এখনই মিটাইতেছি।”
