জয়নালের চক্ষু জলে পরিপূর্ণ হইল। পুনরায় করুণস্বরে বলিলেন, “আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর কাসেমের জীবনলীলা শেষ করিয়াছে। এই পাপাত্মাই পতিপরায়ণা সখিনা দেবীর আত্মহত্যার কারণ। আর কত বলিব। এই জাহান্নামী কাফের মারওয়ানই পুণ্যাত্মা পিতা প্রভু হোসেনের জীবন-”
জয়নালের মুখে আর কথা সরিল না,-চক্ষুদ্বয় জলে ভাসিতে লাগিল। মোহাম্মদ হানিফা হৃদয়-বেগ সম্বরণে অধীর হইয়া-“হা ভ্রাতঃ হোসেন! হা ভ্রাতঃ হোসেন! বাবা জয়নাল! হানিফার অন্তরাত্মা শীতল কর বাপ!” এই কথা বলিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে জয়নালকে বক্ষে ধারণ করিলেন। শোকাবেগ ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতে লাগিল।
সভাস্থ আর আর সকলে-ক্রোধে, রোষে, দুঃখে, শোকে, একপ্রকার জ্ঞানহারা উন্মত্তের ন্যায় হইয়া, সমস্বরে বলিয়া উঠিলেন, “এ কি সেই মারওয়ান? এ কি সেই মারওয়ান? মার শয়তানকে। ভাই সকল, আর দেখ কী?”
গাজী রহমান বহুবিধ চেষ্টা করিয়াও সভাস্থ সকলের সে উগ্রমূর্তি, সে বিকট ভাব পরিবর্তন করিতে পারিলেন না, কেহই তাঁহার কথা শুনিল না। শেষে মোহাম্মদ হানিফার কথা পর্যন্ত কেহ গ্রাহ্য করিল না। “মার শয়তানকে” বলিতে বলিতে পাদুকাঘাত, মুষ্ট্যাঘাত, অস্ত্রাঘাত, যত প্রকার আঘাত প্রচলিত আছে, বজ্রাঘাতের ন্যায় মারওয়ানের শরীরে পড়িতে লাগিল। চক্ষের পলকে মারওয়ান-দেহ ধুলায় লুটাইয়া শোণিত-ধারে সভাতল রঞ্জিত করিল।
মারওয়ান অস্ফুটস্বরে বলিল, “জয়নাল আবেদীন! আমি তোমার ভালও করিয়াছি, মন্দও করিয়াছি। আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত হইল। কিন্তু সম্মুখে মহা ভীষণ রূপ। এমন ভয়ঙ্কর মূর্তি আমি কখনো দেখি নাই। আমাকে রক্ষা কর।”
জয়নাল আবেদীন বলিলেন, “মারওয়ান, ঈশ্বরের নাম কর। এ সময়ে তিনি ভিন্ন রক্ষার ক্ষমতা আর কাহারো নাই। জ্বলন্ত বিশ্বাসের সহিত সেই দয়াময়ের নাম মুখে উচ্চারণ কর। তাঁহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর।”
মারওয়ান আর্তনাদসহকারে বিকৃতস্বরে বলিল, “আমি মারওয়ান, আমি মারওয়ান-দামেস্ক-রাজমন্ত্রী মারওয়ান। আমাকে মারিয়ো না। দোহাই তোমার, আমাকে মারিও না। অগ্নিময় লৌহদণ্ডে আমাকে আঘাত করিয়ো না। আমি ও অগ্নি-সমুদ্রে প্রবেশ করিতে পারিব না। আমি মিনতি করিয়া দু’খানি পায়ে ধরিয়া বলিতেছি ও অগ্নি-সমুদ্রে আমাকে নিক্ষেপ করিয়ো না। দোহাই তোমার, রক্ষা কর। দোহাই তোমাদের, আমায় রক্ষা কর। আমি এজিদের প্রধানমন্ত্রী-আমাকে আর মারিও না। প্রাণ গেল-আমি যাইতেছি। ঐ আগুনে প্রবেশ করিতেছি-রক্ষা কর।”
বিকট চিৎকার করিতে করিতে মারওয়ানের প্রাণপাখি দেহপিঞ্জর হইতে অদৃশ্যভাবে উড়িয়া গেল। রক্তমাখা দেহ সভাতলে পড়িয়া রহিল।
মোহাম্মদ হানিফা, গাজী রহমান, ওমর আলী, মস্হাব কাক্কা প্রভৃতিকে বলিতে লাগিলেন, “ভ্রাতৃগণ! এখন আর চিন্তা কি? এখন প্রস্তুত হও, যাহার জন্য এতদিন সঙ্কুচিত ছিলাম, যাহার জীবনের আশঙ্কা করিয়া এতদিন নানা সন্দেহে সন্দিহান হইয়াছিলাম, আজ সে জীবনের জীবন-নয়নের পুত্তলি,-হৃদয়ের ধন,-অমূল্যনিধি হস্তে আসিয়াছে। ঈশ্বর আজ তাহাকে আমাদের হস্তগত করাইয়াছেন, আর ভাবনা কি? এখনই প্রস্তুত হও। এখনই সজ্জিত হও। এখনই এজিদ্বধে যাত্রা করিব। শুন, ঐ শুন, এজিদ্-শিবিরে যুদ্ধের বাজনা বাজিতেছে। রহমানের স্বীকৃত বাক্য রক্ষা হইল। ঈশ্বরই চারিদিক পরিষ্কার করিয়া দিলেন। ক্ষণকাল বিলম্বও আর সহ্য হইতেছে না। শীঘ্র প্রস্তুত হও। অদ্যই দুরাত্মার জীবন শেষ করিয়া পরিজনদিগকে বন্দিগৃহ হইতে উদ্ধার করিব।”
সকলে মনের আনন্দে যুদ্ধসাজে ব্যাপৃত হইলেন। মোহাম্মদ হানিফা জয়নালকে ওত্বে অলীদের পরিচয় দিয়া বলিলেন, “এই অলীদ কোন সময় বলিয়াছিলেন যে, এজিদের জন্য অনেক করিয়াছি! হাসান-হোসেনের প্রতি অনেক অত্যাচার করিয়াছি। আমি উহা পারিব না। সেই কথা কয়েকটা আমার হৃদয়ে গাঁথা রহিয়াছে। আমি সেই কারণেই ইহাকে মস্হাব কাক্কার হস্ত হইতে রক্ষা করিয়াছি। এই অলীদ যদি এ প্রকারে আমাদের হস্তগত না হইতেন, তাহা হইলেও আমি কখনোই ইহার প্রাণের প্রতি হস্তক্ষেপ করিতে সম্মত হইতাম না। জানিত পক্ষে কাহাকেও আক্রমণ করিতে দিতাম না। এই মহাত্মা প্রকাশ্যে পৌত্তলিক, অন্তরে মুসলমান!”
জয়নাল আবেদীন বলিলেন, “আর প্রকাশ গোপন, দ্বিভাবের প্রয়োজন কি?”
অলীদ গাত্রোত্থান করিয়া বলিলেন, “হজরত! আমি অকপটে বলিতেছি, আপনি আমাকে সত্যধর্মে দীক্ষিত করুন।”
জয়নাল “বিস্মিল্লাহ্” বলিয়া ওত্বে অলীদকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করিলেন। মুহূর্তমধ্যে অলীদের অন্তরে সে সত্যধর্মের জ্বলন্ত বিশ্বাস, “ঈশ্বর এক-সেই এক ভিন্ন আর কেহ উপাস্য নাই”-অক্ষয়রূপে নিহিত হইল।
মোহাম্মদ হানিফা অলীদকে সাদরে আলিঙ্গন করিয়া বলিলেন, “ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন, নূরনবী মোহাম্মদের প্রতি অটল ভক্তি হউক, দয়াময় আপনাকে জান্নাতবাসী করুন-এই আশীর্বাদ করি।”
জয়নাল আবেদীনও অলীদের পরকাল উদ্ধারহেতু অনেক আশীর্বাদ করিলেন।
এদিকে মহাঘোর নিনাদে যুদ্ধ-বাজনা বাজিয়া উঠিল। সৈন্যগণ, সৈন্যাধ্যক্ষগণ, মরার আনন্দে সজ্জিত হইয়া শিবির-বহির্ভাগে দণ্ডায়মান হইলেন। ওমর আলী, মস্হাব কাক্কা প্রভৃতি মনোমত বেশ-ভূষায় ভূষিত ও নানা অস্ত্রে সজ্জিত হইয়া, জয়নাল আবেদীনকে ঘিরিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। তখন মোহাম্মদ হানিফা বলিতে লাগিলেন, “ভ্রাতৃগণ! আজ সকলকেই ভ্রাতৃ সম্বোধনে বলিতেছি, আমাদের বংশের সমুজ্জ্বল রত্ন, ইমাম বংশের মহামূল্য মণি, মদিনার রাজা-প্রাণাধিক জয়নাল আবেদীনকে ঈশ্বর কৃপায় আমরা প্রাপ্ত হইয়াছি। ভবিষ্যৎ ভাবনা জয়নালের জীবনের আশঙ্কা, সদা চিন্তিত অন্তর হইতে প্রশমিত হইয়া বিশেষ আশার সঞ্চার হইয়াছে। এ নিদারুণ দুঃখ-সিন্ধু হইতে শীঘ্রই উদ্ধার পাইবার ভরসাও হৃদয়ে জন্মিয়াছে। আজ হৃদয়ে মহাতেজ প্রবেশ করিয়াছে, আনন্দে বক্ষঃ স্ফীত হইয়া বাহুদ্বয় মহাবলে বলীয়ান বোধ হইতেছে! ভ্রাতৃগণ! আমাদের পরিশ্রম সার্থক হইল। আমি দিব্যচক্ষে দেখিতেছি, প্রকৃতি আজ আমাদের সানুকূলে থাকিয়া অলক্ষিতভাবে নানাবিধ শুভচিহ্ন, শুভযাত্রার শুভলক্ষণ দেখাইতেছেন। নিশ্চয় আশা হইতেছে যে, এই যাত্রায় এজিদ্-বধ করিয়া পরিজনবর্গকে বন্দিগৃহ হইতে উদ্ধার করিতে পারিব। ভ্রাতৃগণ! এই শুভ সময়ে এই আনন্দ উচ্ছ্বাস সময়ে, আমার একটি মনোসাধ পূর্ণ করি, জগৎপূজিত মদিনার সিংহাসন আজ সজীব করি। আমাদের সকলের নয়নের, জগতের যাবতীয় ইসলাম চক্ষের পুত্তলি-হৃদয়ের ধন, অমূল্য মণিকে আমরা ভক্তির সহিত আজই শিরে ধারণ করি। ভ্রাতৃগণ! মনের হর্ষে প্রাণাধিক জয়নাল আবেদীনকে আজই এই স্থানে-এই দামেস্ক-প্রান্তরে মদিনার রাজপথে অভিষেক করি।”
