গাজী রহমানের ইঙ্গিতে প্রহরিগণ মারওয়ানের সেই ছদ্মবেশ উন্মোচন করিতেই মহামূল্য মণিমুক্তাখচিত বেশের প্রতি সকলের দৃষ্টি পড়িল। ওমর আলী, আক্কেল আলী (বাহরাম) প্রভৃতি যাঁহারা বিশেষরূপে মারওয়ানকে চিনিতেন, তাঁহারা সমস্বরে বলিয়া উঠিলেন-“মারওয়ান!-এই সেই মারওয়ান!”
গাজী রহমান বলিলেন, “কী ঘৃণার কথা! সর্বশ্রেষ্ঠ সচিবের এই দশা! মারওয়ানের মন এত নীচ, বড়ই দুঃখের বিষয়। ইহার সম্বন্ধে আর কেহ কোন কথা বলিলেন না। দেখি, তৃতীয় বন্দির সত্যবাদিতা এবং এই মারওয়ান সম্বন্ধে তিনিই-বা কি জানেন। এইক্ষণে ইহাকে সভার এক প্রান্তে বিশেষ সতর্কভাবে রাখিতে হইবে।”
মন্ত্রীবরের আদেশে মারওয়ান বন্ধনদশায় প্রহরী-বেষ্টিত হইয়া, সভার এক প্রান্তে রহিল।
এদিকে তৃতীয় বন্দি সভায় উপস্থিত হইল। সে কাহারো প্রতি দৃষ্টি করিল না। প্রহরিগণ যেদিকে লইয়া চলিল, সে সেইদিকে ঈশ্বরের নাম লইয়া চলিল। প্রহরিগণ গাজী রহমানের সম্মুখে লইয়া উপস্থিত করিল।
জয়নাল আবেদীনকে দেখিয়া দরবারের যাবতীয় লোকের মনে যে এক অনির্বচনীয় ভাবের উদয় হইল, সে ভাবের কথা কে বলিবে? সে কথা কে মুখে আনিবে? শত্রুর জন্য মন আকুল, একথা কে বলিবে? সকলের মনে ঐ ভাব-ঐ স্নেহপূর্ণ পবিত্র ভাব-কিন্তু মনের কথা মন খুলিয়া মুখে বলিতে কেহই সাহসী হইলেন না। মোহাম্মদ হানিফা জয়নালের মুখাকৃতি স্থিরনয়নে দেখিতে লাগিলেন। কত কথা তাঁহার মনে উদয় হইল। বন্দির মুখাকৃতি, শরীরের গঠন দেখিয়া ভ্রাতৃবর হোসেনের কথা মনে পড়িল। জয়নালের নাম হৃদয়ে জ্বলন্তভাবে জাগিতে লাগিল।
গাজী রহমান বিশেষ ভদ্রতার সহিত বলিলেন, “আপনার পরিচয় দিয়া আমাদের মনের ভ্রান্তি দূর করুন।”
জয়নাল আবেদীন সভাস্থ সকলকে অভিবাদন করিয়া বিনয় বচনে বলিতে লাগিলেন, “আমার পরিচয়ের জন্য আপনারা ব্যস্ত হইবেন না। আমার প্রার্থনা যে, আর দুইজন যাঁহারা আমার সঙ্গে ধৃত হইয়াছেন, তাঁহাদিগকে এই স্থানে আনিতে অনুমতি করুন।”
গাজী রহমান একটু চিন্তা করিয়া বলিলেন, “বন্দিদ্বয় এই সভা মধ্যেই আছেন। তাঁহাদিগকে আপনার কি প্রয়োজন, তাহা স্পষ্টভাবে বলিতে হইবে।”
“আমার প্রয়োজন অনেক। তবে গত রাত্রে আমার সহিত যখন তাঁহাদের দেখা হয়, তখন একজনকে আমি বিশেষরূপে চিনিয়াছি। কিন্তু রাত্রের দেখা, তাহাতেই কিছু সন্দেহ আছে।”
“তবে কি আপনি তাঁহাদের সঙ্গী নহেন?”
“আমি কাহারো সঙ্গী নহি, আমি নিরাশ্রয়।”
গাজী রহমান অঙ্গুলি দ্বারা অলীদকে নির্দেশ করিয়া বলিলেন, “দেখুন ঐ এক বন্দি।”
জয়নাল আবেদীন ওত্বে অলীদকে কার্বালার প্রান্তরে দেখিয়াছিলেন মাত্র; তাহাকে বিশেষরূপে চিনিতে না পারিয়া বলিলেন, “আমি ইহাকে ভালরূপে চিনিতে পারিলাম না। আমি যে পাপাত্মা জাহান্নামীর কথা বলিয়াছি, নিশীথ সময়ে সেই প্রস্তর-খণ্ডের নিকট যাহাকে দেখিয়াছি-চাকুরি করিতে যে মদিনা হইতে দামেস্কে আসিতেছে, তাহাও শুনিয়াছি-তাহাকেই আমার বেশি প্রয়োজন।”
গাজী রহমানের আদেশে প্রহরিগণ বন্ধন অবস্থায় মারওয়ানকে সকলের সম্মুখে উপস্থিত করিল।
জয়নাল আবেদীন বলিলেন, “রে পামর! তোকে গত নিশীথেই চিনিয়াছিলাম। চিনিয়া কি করিব, আমি নিরস্ত্র!”
মারওয়ান বন্দি অবস্থাতেই বলিল, “আমি সশস্ত্র থাকিলেই-বা কী করিলাম! কী ভ্রম! কী ভ্রম! সুযোগ-সুবিধা মত তোমাকে পাইয়াও যখন আমার এই দশা, তখন আর আশা কি? কি ভ্রম!!”
“আরে নরাধম! ঈশ্বর কী না করিতে পারেন, তাঁহার ক্ষমতা তুই কি বুঝবি পামর?”
“আমি বুঝি বা না-বুঝি মনের দুঃখ মনেই রহিয়া গেল। যদি চিনিতাম, যে তুমিই-”
সভাস্থ সকলে মহা চঞ্চলচিত্ত হইয়া উঠিতেই, গোলযোগের সম্ভাবনা দেখিয়া জয়নাল আবেদীন বলিতে লাগিলেন, “সভাস্থ মহোদয়গণ! আমার পরিচয়-”
“আমার পরিচয়”-এই দুইটি শব্দ জয়নালের মুখ হইতে বহির্গত হইতেই সকলে নীরব হইলেন। সকলেই সমুৎসুকে জয়নালের মুখপানে চাহিয়া রহিলেন।
জয়নাল বলিলেন, “আমরা এক সময়ে বন্দি-অথচ পরস্পর শত্রুভাব। ইহা কম আশ্চর্যের কথা নহে। অগ্রে এই পাপাত্মার পরিচয় দিয়া শেষে আমার কথা বলিতেছি। ইহার নাম জগৎরাষ্ট্র। এই পাপাত্মার মন্ত্রণাতেই মহাত্মা হাসানবংশ একেবারে বিনাশ। প্রভু হোসেনের বংশও সমূলে ধ্বংস হইবার উপক্রম হইয়াছিল, ঈশ্বর রক্ষা করিয়াছেন। সে কথা এই দুরাচার নিজমুখে স্বীকার করিয়াছে। ‘কী ভ্রম! কী ভ্রম!’ ঐ ভ্রমই মঙ্গলের মূল কারণ। এই নরাধমই সকল ঘটনার মূল। সেই সকল সাংঘাতিক ঘটনার বিষয় যাহা আমি মাতার নিকট শুনিয়াছি, আর যাহা স্বচক্ষে দেখিয়াছি, সংক্ষেপে বলিতেছি। আমি আপনাদের নিকট বিচারপ্রার্থী।”
সভাস্থ সকলে বিশেষ মনোযোগের সহিত শুনিতে লাগিলেন। জয়নাল গম্ভীরস্বরে বলিতে লাগিলেন, “এই নরাধম, এই পাপাত্মাই এজিদ্ পক্ষ হইতে আপনার নাম স্বাক্ষর করিয়া, মহাত্মা হাসানের নিকট মক্কা-মদিনার কর চাহিয়া পাঠাইয়াছিল। এই পামরই হাসান বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে, পবিত্রভূমি মদিনার স্বাধীনতাসূর্য হরণ করিয়া চিরপরাধীনতার অন্ধকার অমানিশায় আবরণ করিতে, সসৈন্যে মদিনায় আসিয়াছিল। যুদ্ধে পরাস্ত হইয়া মায়মুনার যোগে জায়েদার সাহায্যে হীরকচূর্ণ দ্বারা, মহাত্মা হাসানের জীবন অকালে বিনাশ করিয়াছে! এই দুরাচারই কুফা নগরের আবদুল্লাহ্ জেয়াদকে টাকায় বশীভূত করিয়া মহাবীর মোস্লেমের জীবন মিথ্যা ছলনায় কৌশলে শেষ করিয়াছে! এই নারকীই র্কাবালা প্রান্তরে মহা সংগ্রাম ঘটাইয়াছে। কৌশলে ফোরাত কূল বন্ধ করিয়া, শত সহস্র যোধকে শুষ্ককণ্ঠ করিয়া বিনাশ করিয়াছে। কি দুঃখের কথা।-তীক্ষ্ণ তীর দ্বারা দুগ্ধপোষ্য বালকের বক্ষঃভেদ করাইয়া জগৎ কাঁদাইয়াছে। অন্যায় যুদ্ধে মহাবীর আবদুল ওহাবকে বধ করিয়াছে। কত বলিব, এই পাপাত্মাই সর্বশ্রেষ্ঠ বীর-”
