গাজী রহমান পুনরায় বলিলেন, “আপনি আমাদের মাননীয়। আপনার নাম আমরা পূর্বেই শুনিয়াছি। আপনার অনেক বিষয় আমরা জ্ঞাত আছি। আপনি অতি মহৎ! সেই মহৎ নাম যাহাতে রক্ষা পায়, তাহার মত কার্য করিবেন।”
“বলুন! আমি যখন বন্দি, আমার জীবন আপনাদের হস্তে, এ অবস্থায় আমার নিজের কি ক্ষমতা আছে যে তদ্দ্বারা আমি আমার মহত্ত্ব রক্ষা করিব। অলীদ এখন আপনাদের আজ্ঞানুবর্তী, আপনাদের দাস।”
“যেমন শুনিয়াছিলাম, তেমনই দেখিলাম। আপনার জীবন যখন আমাদের হস্তে ন্যস্ত করিলেন, আর কোন চিন্তা নাই। ঈশ্বর আপনার সেই মহত্ত্ব, সেই মান, সম্ভ্রম, জীবন সকলই রক্ষা করিবেন। আপনি আমাদের সকলের পূজনীয়।”
“আমি ভ্রাতৃভাবে পরাভব স্বীকারে এই তরবারি রাখিলাম। এ জীবনে আপনাদের বিনা অনুমতিতে এ হস্তে আর অস্ত্র ধরিব না, এই রাখিলাম!”
অলীদ গাজী রহমানের সম্মুখে অস্ত্র রাখিয়া দিল। গাজী রহমান বিশেষ আগ্রহে ওত্বে অলীদকে আলিঙ্গন করিলেন এবং সমাদরে উপযুক্ত স্থানে বসাইয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনার সঙ্গীদ্বয়ের পরিচয় কি?”
“দুইজনের মধ্যে একজন আমার সঙ্গী, অপর একজনকে আমি চিনি না। যিনি আমার সঙ্গী, তাঁহার পরিচয় তিনিই দিবেন। যদি তাঁহার কোন কথায় সন্দেহ হয়, আমাকে জিজ্ঞাসা করিলে, আমি যাহা জানি অবশ্যই বলিব।”
গাজী রহমানের ইঙ্গিতে দ্বিতীয় বন্দি (মারওয়ান) প্রহরী-বেষ্টিত হইয়া সভামণ্ডপে উপস্থিত হইল। সভাস্থ সকলের চক্ষু দ্বিতীয় বন্দির প্রতি, বন্দির চক্ষুও সকলের প্রতি। বন্দি চতুর্দিকে চাহিয়া দেখিল, শান্তভাব; রোষ, ঘৃণা, অবজ্ঞার চিহ্নের নামমাত্র সভায় নাই। পদমর্যাদার গৌরব, ক্ষমতার ন্যূনাধিক্য পরিচ্ছদের জাঁকজমক, উপবেশনের ভেদাভেদ, কিছুমাত্র সভায় নাই। সকলেই এক, সকলেই সমান, সকলেই ভ্রাতা। ভ্রাতৃভাব মূলমন্ত্রে ইহারাই যেন যথার্থ দীক্ষিত। দেখিল সভাস্থ প্রায়ই তাহার অপরিচিত। ক্রমে সকলের চক্ষুর সহিত তাহার চক্ষুর মিলন হইল। আক্কেল আলীর (বাহরাম) প্রতি চক্ষু পড়িতেই রোষের সহিত ঘৃণা, উভয়ে একত্র মিশিয়া চক্ষুকে অন্যদিকে ফিরাইয়া দিল। সেদিকে চাহিতেই দেখিল, তাঁহারই প্রিয় সহচর অলীদ ছদ্মবেশ পরিত্যাগ করিয়া হানিফার দলে মিশিয়াছেন।
মারওয়ান মনে মনে আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলিল, “এ কী কথা! বেশ পরিত্যাগ-দলে আদৃত-অস্ত্র সভাতলে-এ কী কথা!”
অলীদের প্রতি বারবার চাহিতে লাগিল। কিন্তু বীরবরের বিশাল চক্ষু অন্যদিকে,-সে চক্ষু মারওয়ানের মুখ আর দেখিতে ইচ্ছা করিল না। মারওয়ান কি করিবে, কোন উপায় নাই, যেদিকে দৃষ্টি করে, সেইদিকেই সহস্র প্রহরী। সেইদিকেই সহস্র শাণিত অস্ত্রের চাক্চিক্য!
মনে মনে বলিল, “তবে কি আর শিবিরে যাইতে পারিলাম না? তবে কি আর মহারাজের সহিত দেখা হইল না? হায়! হায়! তবে কি দামেস্কের স্বাধীনতা-”
মারওয়ানের মনের কথা শেষ না-হইতেই গাজী রহমান জিজ্ঞাসা করিলেন, “মহাশয়, আপনি কোন্ ধর্মাবলম্বী?”
“ধর্মের পরিচয়ে আপনার প্রয়োজন কি?”
“প্রয়োজন এমন কিছু নহে, তবে মোহাম্মদীয় হইলে আপনি অবধ্য, সহস্র প্রকারে আমাদের অনিষ্ট-চেষ্টা করিলেও আপনি ভ্রাতা-এক প্রাণ,-এক আত্মা, এক হৃদয়।”
“আমি মোহাম্মদের শিষ্য।”
“মিথ্যা কথায় কী পাপ তাহা বোধ হয় আপনার অজানা নাই; ধর্মমাত্রই মিথ্যার বিরোধী।”
“বিরোধী বটে, কিন্তু প্রাণরক্ষার জন্য বিধিও আছে।”
“তবে কি আপনি প্রাণরক্ষার জন্য মিথ্যা বলিবেন?”
“আমি মিথ্যা বলিব না। বিধি আছে, তাহাই বলিলাম।”
“বলুন, আপনি কে? আর কী কারণে রাত্রে শিবিরে আসিতেছিলেন?”
“আমি পথিক, চাকুরির আশায় আপনাদের নিকট আসিতেছিলাম।”
“আপনি কোথা হইতে আসিতেছেন?”
“আমি মস্কাট হইতে আসিতেছি।”
“আপনার সঙ্গে যাঁহারা ধৃত হইয়াছেন, তাঁহারা কি আপনার সঙ্গী?”
“আমার সঙ্গী কেহ নাই, আমি তাহাদিগকে চিনি না।”
“এ কী কথা! অলীদ মহামতি কী মিথ্যা কথা বলিয়াছেন?”
“প্রাণ বাঁচাইতে কে-না মিথ্যা বলিয়া থাকে? আমি অলীদকে চিনি না। আমার পূর্বে যদি কেহ কোন কথা বলিয়া থাকেন, তবে তাহার কথাই যে সম্পূর্ণ সত্য, এ-কথা আপনাকে কে বলিল? এ বিশ্বাস আপনার কিসে জন্মিল?”
“কিসে যে তাঁহার কথায় বিশ্বাস জন্মিল, সে-কথা শুনিয়া আপনার প্রয়োজন নাই; কিন্তু আপনার কথায় আমি নিতান্ত দুঃখিত হইলাম। এখনই আপনাকে সত্য-মিথ্যার প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখাইতে পারি। কিন্তু তৃতীয় বন্দির কথা না শুনিয়া কিছু বলিব না। অনর্থক আমাদের অস্থির মনকে ভ্রমপথে লইয়া যাইবেন না।”
“আমি ভ্রমপথে লইতেছি না। আপনারা নিজে ভ্রম-কূপে পড়িয়াছেন।”
“সে সত্য, কিন্তু একটি মিথ্যাকে সত্য করিয়া পরিচয় দিতে সাতটি মিথ্যার প্রয়োজন। তাহাতেও শ্রোতার মনের সন্দেহ দূর হয় কি-না সন্দেহ। আপনার পরিচয় জানিতে আমাদের বেশি আয়াস আবশ্যক করিবে না, তবে তৃতীয় বন্দির কথা না শুনিয়া আপনাকে আর কিছুই বলিব না। কিন্তু আপনার প্রতি আমার বিশেষ সন্দেহ হইয়াছে।”
এই কথা বলিয়া ইঙ্গিত করিতেই প্রহরিগণ কঠিন বন্ধনে মারওয়ানের হস্তদ্বয় তখনই বন্ধন করিল। গাজী রহমান পুনরায় বলিলেন, “তৃতীয় বন্দিকে বিশেষ সাবধান ও সতর্ক হইয়া আনিবে, ক্রমেই সন্দেহের কারণ হইতেছে।”
সভামধ্য হইতে ওমর আলী বলিতে লাগিলেন, “মন্ত্রিবর! বন্দির আকার-প্রকার কথার স্বরে আমি চিনিতে পারিয়াছি। কিন্তু বেশের পরিবর্তে একটু সন্দেহ হইয়াছে মাত্র। বন্দির গাত্রের বসন উন্মোচন করিতে আজ্ঞা করুন। আমার নিশ্চয় বোধ হইতেছে, এই বন্দি এজিদের প্রধানমন্ত্রী মারওয়ান। কাল অনেকক্ষণ পর্যন্ত ইহার সহিত আমার অনেক কথা হইয়াছে, হাসি-তামাশা করিতে বাকি রাখি নাই।”
