উভয়ে গমনে ক্ষান্ত দিয়া মনঃসংযোগে বিশেষ লক্ষ্যে চারিদিকে দেখিতে লাগিল। দেখিল, কোন দিকে কিছুই নাই, চারিদিকে অন্ধকার, উপরে তারকারাজি।
উভয়ে আবার যাইতে লাগিল। অনুমান দশ পদ ভূমি অতিক্রম করিয়া যাইলেই, মানব মুখোচ্চারিত অর্থসংযুক্ত কথার ঈষৎ ভাব স্পষ্ট শুনিতে লাগিল। সে কথার প্রতি গ্রাহ্য না করিয়া যাইতে লাগিল। কিন্তু আর বেশিদূর যাইতে হইল না। আনুমানিক পঞ্চ হস্ত পরিমাণ ভূমি পশ্চাৎ করিতেই তাহাদের বাম পার্শ্ব হইতে শব্দ হইল-“আর নয়, অনেক আসিয়াছ।”
মারওয়ান চমকিয়া উঠিল।
আবার শব্দ হইল, “কী অভিসন্ধি?”
মারওয়ান ও অলীদ উভয়েই চমকিয়া উঠিল, অঙ্গ শিহরিয়া উঠিল,-স্থির ভাবে দাঁড়াইল।
আবার শব্দ হইল, নিশীথ সময়ে রাজশিবিরের দিকে কেন? সাবধান! আর অগ্রসর হইয়ো না। যদি কোন আশা থাকে, সূর্য উদয়ের পর।”
মারওয়ান ও অলীদ উভয়ে ফিরিল, আর সে পথের দিকে ফিরিয়াও চাহিল না। কিছুদূর আসিয়া অন্য পথে অন্য দিকে শিবিরের অন্য দিক লক্ষ্য করিয়া চলিতে লাগিল। মারওয়ান বলিল, “অলীদ! আমাদের ভুল হইয়াছে; এদিকে না আসিয়া অন্য দিকে যাওয়াই ভাল ছিল।”
“অন্য কোন্ দিকে যাওয়া ভাল ছিল বলুন, সেই দিকেই যাই। ভুল সংশোধন করিতে কতক্ষণ? যে দিকে আপনার নিঃসন্দেহ বোধ হয়, সেই দিকেই চলুন।”
মারওয়ান শিবিরের দক্ষিণ পার্শ্বে যাইতে লাগিল, সেই দিকে যাইতে মনে কোন সন্দেহ হইল না। পশ্চাতে, সম্মুখে কি বামে কোন দিকেই আর ভারি বোধ হইল না। নিঃসন্দেহে যাইতে লাগিল।
অলীদ বলিল, “দেখিলে? গাজী রহমানের বন্দোবস্ত দেখিলে?”
“এদিকে কি?”
“বোধ হয়, এদিকের জন্য তত আবশ্যক মনে করেন নাই।”
“সে কী আর ভ্রম নয়?”
“মারওয়ান! এখন ও-কথা মুখে আনিয়ো না। গাজী রহমানের ভ্রম-একথা মুখে আনিয়ো না। কার্য সিদ্ধি করিয়া নির্বিঘ্নে শিবিরে যাইয়া যাহা বলিবার বলিয়ো। কোন দিকে কি কৌশল করিয়াছে, তাহা তাহারাই জানে।”
“তা জানুক, এদিকে কোন বাধা নাই, নিঃসন্দেহে যাইতেছি, মনে কোনরূপ শঙ্কা হইতেছে না।”
“আমি ভাই আমার কথা বলি। আমার মনে অনেক কথা উঠিয়াছে-ভয়েরও সঞ্চার হইয়াছে। আমি তোমার পশ্চাতে থাকিব না। দুই জনে একত্রে সমান ভাবে যাইব। কেহই কাহারো অগ্র-পশ্চাৎ হইব না।”
মারওয়ান হাসিয়া বলিল, “অলীদ! তুমি আজ মহাবীরের নাম হাসাইলে! অল্পমতি বালকগণের মনের গতির সহিত, পরিপক্ব মনের সমান ভাব দেখাইলে! বীরহৃদয়ে, ভয়! দুইজনে সমানভাবে একত্র যাইতে পারিলেই নির্ভয়, এ কি কথা?”
“মারওয়ান! আমরা যে কার্যে বাহির হইয়াছি, সে কার্যের কথা মনে আছে? কার্যগতিকে সাহস, রুচিগতিকে বল। এখন তোমার মন্ত্রীত্ব নাই, আমারও বীরত্ব নাই! যেমন কার্য, তেমনই স্বভাব।”
উভয়ে হাসি-রহস্যে একত্রে যাইতেছে, প্রজ্বলিত দীপের প্রদীপ্ত আভায় শিবির-দ্বার, মানুষের গতিবিধি স্পষ্টভাবে দেখা যাইতেছে। গমনের বেগ কিছু বেশি করিল, সঙ্গে সঙ্গে হাসি-রহস্য চলিতেছে। দুর্ভাগ্যক্রমে তাহাদের হাসিমুখ বেশিক্ষণ রহিল না। দৈবাৎ একটি শব্দ তাহাদের কর্ণে প্রবেশ করিল। দক্ষিণে-বামে দৃষ্টি করিল অন্ধকার-সম্মুখে দীপালোক-গমনে ক্ষান্ত হইল। আবার সেই হৃদয়-কম্পনকারী শব্দ-ক্ষিপ্রহস্ত নিক্ষিপ্ত তীরের শন্শন্ শব্দ। অন্তরে জানিয়াছে-তীরের গতি, মুখে বলিতেছে-“কিসের শব্দ? অলীদ! কিসের শব্দ?” কি বিপদ, মুখের কথা মুখে থাকিতেই তিনটি লৌহশর তাহাদের সম্মুখে আসিয়া পড়িল। এখন কি করিবে, অগ্রে পা ফেলিবে, কি পাছে সরিবে, কি স্থিরভাবে এক স্থানে দণ্ডায়মান থাকিবে, কিছুই স্থির করিতে পারিল না। দক্ষিণ পার্শ্ব হইতে গম্ভীর নাদে শব্দ হইল, “শত্রু হও, মিত্র হও, ফিরিয়া যাও,-রাত্রে এ শিবিরে প্রবেশ নিষেধ-রাত্রে আঘাত মহারাজের নিষিদ্ধ, তাহাতেই প্রাণ বাঁচাইয়া গেলে; নতুবা ঐ স্থানেই ইহকালের মত পড়িয়া থাকিতে!”
আর কোন কথা নাই। চতুর্দিকে নিঃশব্দ। কিছুক্ষণ পরে অলীদ বলিল, “মারওয়ান! এখন আর কথা কি? আঙ্গুল পরিমাণ ভূমি আগে যাইতে আর কি সাহস হয়?”
মারওয়ান মৃদুস্বরে বলিল, “ওহে চুপ কর! প্রহরীরা আমাদের নিকটেই আছে।”
“নিকটে থাকিলে তো ধরিয়া ফেলিত।”
“ধরিবার তো কোন কথা নাই। তবে উহারা বিশেষ সতর্কতার সহিত শিবির রক্ষা করিতেছে। যে উদ্দেশ্যে আসিয়াছিলাম, তাহা ঘটিল না। এখন নিরাপদে শিবিরে যাইতে পারিলেই রক্ষা।”
“সে কথা তো আমি আগেই বলিয়াছি। এখন লাভের মধ্যে প্রাণ লইয়া টানাটানি।”
মারওয়ান বলিল, “আর কথা বলিব না, চুপে চুপে নিঃশব্দে চলিয়া যাই।”
উভয়ে কিছুদূর আসিয়া, “রক্ষা পাইলাম” বলিয়া দাঁড়াইল। চুপি চুপি কথা কহিতেও সাহস হইল না-পারিলও না। কণ্ঠ-তালু শুষ্ক, জিহ্বা একেবারে নীরস,-তবু বহুদূরে সরিয়া পড়িয়াছে। ক্ষণকাল পরে একটু স্থির হইয়া মারওয়ান বলিল, “অলীদ! বাঁচিলাম। চল, এখন একটু স্থির হইয়া আমাদের শিবিরে যাই।”
মুখের কথা শেষ হইতেই পশ্চাদ্দিক হইতে বজ্রনাদে শব্দ হইল-“সাবধান, আর কথা বলিয়ো না,-চলিয়া যাও;-ঐ বৃক্ষ-ঐ তোমাদের সম্মুখের ঐ উচ্চ খর্জুর বৃক্ষ সীমা। আমাদের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকিতে পারিবে না। যদি প্রাণ বাঁচাইতে চাও, সীমার বাহিরে যাও।”
কি করে, উভয়ে দ্রুতপদে সীমা-বৃক্ষ ছাড়িয়া রক্ষা পাইল। আর কোন কথা শুনিল না। মারওয়ান বলিল, “জীবনে এমন অপমান কখনোই হই নাই। কী লজ্জা!”
