মারওয়ান বলিল, “কী বিপদ! হানিফার প্রহরীরা কি প্রান্তরের চতুষ্পার্শে ঘিরিয়া রহিয়াছে? এখনো কিছুতেই মন সুস্থির হয় নাই। এখনো হৃদয়ের চঞ্চলতা দূর হয় নাই। এখানে দাঁড়াইব না। এখন সন্দেহ হইতেছে! আমাদের দেশ-আমাদের রাজ্য, সীমা-বৃক্ষ উহাদের-কী আশ্চর্য? সীমা-বৃক্ষ না ছাড়াইয়া আসিলে জীবন যায়। কী ভয়ানক ব্যাপার! চল, শিবিরে যাই।”
উভয়ে নীরবে আপন শিবিরাভিমুখে চলিল! যাইতে যাইতে সম্মুখে একখণ্ড বৃহৎ শিলাখণ্ড দেখিয়া মারওয়ান বলিল, “অলীদ! এই শিলাখণ্ডের উপরে একটু বসিয়া বিশ্রাম করি। নানা কারণে মন অস্থির হইয়াছে। আর কোন গোলযোগ নাই। ক্ষণকাল এই স্থানে বসিয়া মনের অস্থিরতা দূর করি। যেমন কার্যে আসিয়াছিলাম তাহার প্রতিফলও পাইলাম।”
অলীদ মারওয়ানের কথায় আর কোন আপত্তি না করিয়া শিলাখণ্ডের চতুষ্পার্শ একবার বেষ্টন করিয়া আসিল এবং নিঃসন্দেহভাবে উভয়ে বসিয়া অস্ফুট স্বরে দুই-একটি কথা কহিতে লাগিল।
এক কথার ইতি না-হইতেই অন্য কথা তুলিলে কথার বান্ধুনি থাকে না, সমাজ-বিশেষে অসভ্যতাও প্রকাশ পায়। জয়নাল আবেদীন বন্দিগৃহ হইতে চলিয়া যাওয়ার পর এমন সুযোগ পাই নাই যে, তাঁহার বিবরণ পাঠকগণের গোচর করি। মারওয়ান ও ওত্বে অলীদ শিলাখণ্ডের উপর বসিয়া নির্বিঘ্নে মনের কথা ভাঙ্গচুর করুন, এই অবসরে আমরা জয়নালের কথাটা বলিয়া রাখি।
জয়নাল আবেদীন, ওমর আলীর শূলের ঘোষণা শুনিয়া বন্দিগৃহের সম্মুখস্থ প্রাঙ্গণ হইতে প্রহরীদলের অসাবধানতায় নাগরিক দলে মিশিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে আসিয়াছিলেন! তিনি নামে সকলের নিকট পরিচিত কিন্তু অনেকে তাঁহাকে চক্ষে দেখে নাই। মোহাম্মদ হানিফাকে তিনি কখনো দেখেন নাই, ওমর আলীকেও দেখেন নাই,-অথচ ওমর আলীর প্রাণরক্ষার জন্য চেষ্টা করিবেন, এই দুরাশার কুহকে মাতিয়াই দামেস্কপ্রান্তরে আসিয়াছিলেন। এজিদের শিবির, হানিফার শিবির, ওমর আলীর নিষ্কৃতি সমুদয় দেখিয়াছেন, তাঁহার নিজের প্রাণবধ করার ঘোষণাও স্বকর্ণে শুনিয়াছেন। ঐ ঘোষণার পর তিলার্ধকালও দামেস্কপ্রান্তরে অবস্থিত করেন নাই; নিকটস্থ এক পর্বত গুহায় আত্মগোপন করিয়া দিবা অতিবাহিত করিয়াছেন। নিশীথ সময়ে পর্বত গুহা হইতে বহির্গত হইয়া তাঁহার প্রথম চিন্তা-কী উপায়ে মোহাম্মদ হানিফার সহিত একত্রিত হইবেন। সে শিবিরে তাঁহার পরিচিত লোক কেহই নাই! নিজ মুখে নিজ পরিচয় দিয়া খাড়া হইতেও নিতান্ত অনিচ্ছা। ভাবিয়া কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া, দুই-এক পদে হানিফার শিবিরাভিমুখেই যাইতেছেন।
অলীদ বলিলেন, “মারওয়ান! কিছু শুনিতে পাইতেছ?”
“স্পষ্ট বুঝিতে পারিতেছি না, কিন্তু মানুষের গতিবিধির ভাব বেশ বুঝা যাইতেছে। একজন দুইজন নহে, বহুলোকের সাবধানে পদবিক্ষেপ ভাব অনুভব হইতেছে। আর এখানে থাকা উচিত নহে। বোধ হয় বিপক্ষেরা আমাদের পরিচয় পাইয়াছে, এখনো আমাদিগকে ছাড়ে নাই। ঐ দেখ সম্মুখে চাহিয়া দেখ। আমরা ছদ্মবেশে আসিয়াছি, কেবল তোমার নিকটে একখানি তরবারি আর আমার নিকট সামান্য একখানি ছুরি ভিন্ন অন্য কোন অস্ত্র আমাদের সঙ্গে নাই। আর থাকিলেই বা কি হইত? তাহাদের তীরের মুখ হইতে দিনে রক্ষা পাওয়াই দায়, তায় আবার ঘোর নিশা। মনঃসংযোগে কান পাতিয়া শোন, যেন চতুর্দিকেই লোকের গতিবিধি, চলাফেরা, সাড়া পাওয়া যাইতেছে। চল, আর এখানে থাকা নহে।” এই বলিয়া শিলাখণ্ড হইতে উভয়ে গাত্রোত্থান করিয়া সমতল ক্ষেত্রে দণ্ডায়মান হইলেন।
জয়নাল আবেদীনও নিকটবর্তী হইয়া গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমরা কে?”
মারওয়ান থতমত খাইয়া সভয় হৃদয়ে উত্তর করিল, “আমরা পথিক, পথহারা হইয়া এখানে আসিয়াছি।”
“নিশীথ সময়ে পথিক পথহারা হইয়া যুদ্ধক্ষেত্রে! এ কী কথা?”
পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “ওহে পথিক! তোমরা কি বিদেশী?”
“হাঁ, আমরা বিদেশী।”
“কী আশ্চর্য! তোমরা বিদেশী হইয়া এই মহা সংগ্রামস্থলে কি উদ্দেশ্যে আসিয়াছ? সত্য বল, কোন চিন্তা নাই।”
মারওয়ান বলিল, “যথার্থ বলিতেছি-আমরা বিদেশী, অজানা দেশ, পথঘাটের ভাল পরিচয় নাই-চিনি না। দামেস্ক নগরে চাকরির আশায় যাইতেছি। দিবসে সৈন্যসামন্তের ভয়; রাত্রেই নগরে প্রবেশ করিব আশা এবং অন্তরে নিগূঢ় তত্ত্ব।”
“তোমরা কোথা হইতে আসিতেছ? তোমাদের বসতি কোথায়?”
“আমরা মদিনা হইতে আসিতেছি। মদিনায় আমাদের বাসস্থান।”
ভীমনাদে শিলারাশির পার্শ্ব হইতে শব্দ হইল-“ওরে ছদ্মবেশী নিশাচর! মদিনাবাসীরা দামেস্কে চাকরির আশায় আসিয়াছে? আর কোথায় যাইবি? এই স্থানেই নিশা যাপন কর। প্রভাতে পরীক্ষার পর মুক্তি। এক পদও আর অগ্রসর হইতে পারিবি না। যদি চক্ষের জ্যোতি থাকে, দৃষ্টির ক্ষমতা থাকে, তবে যেদিকে ইচ্ছা চাহিয়া দেখ, পঞ্চবিংশতি বর্শার ফলক তোমাদের বক্ষঃ, পৃষ্ঠ, বাহু ও পার্শ্ব লক্ষ্য করিয়া স্থিরভাবে রহিয়াছে। সাবধান, কোন কথার প্রসঙ্গ করিয়ো না,-নীরবে তিন মূর্তি প্রভাত পর্যন্ত এই স্থানে দণ্ডায়মান থাক। আর যাইবার সাধ্য নাই। মোহাম্মদ হানিফার গুপ্ত সৈন্য দ্বারা তোমরা তিনজন সূর্যোদয় পর্যন্ত বন্দি।”
উদ্ধার পর্ব ২৮ প্রবাহ
রাজার দক্ষিণহস্ত মন্ত্রী, বুদ্ধি মন্ত্রী-বল মন্ত্রী! মন্ত্রীপ্রবর গাজী রহমানের চক্ষেও আজ নিদ্রা নাই, এ কথা সপ্তবিংশতি প্রবাহের আরম্ভেই প্রকাশ করা হইয়াছে। গাজী রহমান এক্ষণে মহাব্যস্ত। নিশা প্রায় শেষ হইয়া আসিল, গুপ্তচরেরা এ পর্যন্ত ফিরিয়া আসে নাই। আজিকার সংবাদ, দামেস্ক নগরের সংবাদ-এজিদ্ শিবিরের নূতন সংবাদ এ পর্যন্ত কোন সংবাদই প্রাপ্ত হইতে পারেন নাই। দ্বিতীয় দিনে শিবির আক্রমণের উদ্যোগে জয়নাল আবেদীনের প্রাণ বধ হইতে বিরত হইল। ইহাতে কী কোন নিগূঢ় তত্ত্ব আছে? আজ হউক, কাল হউক, শিবির আক্রমণ হইবেই হইবে,-সে ভয়ে জয়নালের প্রাণবধে ক্ষান্ত হইবে কেন?
