এই বলিয়া মারওয়ান আসন ছাড়িল! দাঁড়াইয়া একটু চিন্তা করিয়া বলিল, “একা যাইব না, অলীদকে সঙ্গে করিয়া ছদ্মবেশে-পথিক-সাজে-সামান্য পথিক-সাজে বাহির হইব!”
মারওয়ান বেশ-পরিবর্তন জন্য বস্ত্রাবাস মধ্যে প্রবেশ করিল।
অলীদের চক্ষেও আজ নিদ্রা নাই। মহাবীর হৃদয় আজ মহাচিন্তায় অস্থির। এ যুদ্ধের পরিণামের ফল কি? সময়ের যে প্রকার গতি দেখিতেছি, শেষ ঘটনার নিয়তি-দেবী যে কোন দৃশ্য দেখাইয়া এ অভিনয়নের যবনিকা পতন করিবেন তাহা তিনিই জানেন।
অলীদ শিবিরের বাহিরে পদচারণা করিয়া বেড়াইতেছে, আর ভাবিতেছে-মাঝে মাঝে বিমানে পরিশোভিত তারাদলের মিটি মিটি ভাব দেখিয়া মনে মনে আর একটি মহাভাবের ভাবনা ভাবিতেছে। কিন্তু সে ভাব ক্ষণকাল-সে জ্বলন্ত দৃঢ় ভাব হৃদয়ে স্থান পাইতেছে না। মায়াময় সংসারের স্বার্থপূর্ণ ভাবই প্রবলবেগে তাহার হৃদয় অধিকার করিতেছে। নিশির শেষের সহিত কি আবার রণভেরী বাজিয়া উঠিবে? কার ভাগ্যে কি আছে, কে বলিবে? আবার তারাদলে নয়ন পড়িল,-সেই মধুমাখা মিটি মিটি হাসি ভাব,-এ তারা ও তারা, কত তারা দেখিল, কিন্তু অরুন্ধতী নক্ষত্র তাহার নয়নে পড়িল না। তারাদল হইতে নয়ন ফিরাইয়া আনিতেই হানিফার শিবিরে প্রদীপ্ত দীপালোকের প্রতি চক্ষু পড়িল। অলীদ সে দিকে মনঃসংযোগ না করিয়া অন্যদিকে দৃষ্টি করিতেই তীর ধনু হস্তে লইল। ছদ্মবেশী মারওয়ান কথা না কহিলে অলীদ-বাণে তখনই তাহার জীবন শেষ হইত।
অলীদ বলিল, “নিশীথ সময়ে এ বেশে কোথায়? ভাগ্যে কথা বলিয়াছিলেন।”
“তাহাতেও দুঃখ ছিল না। যে গতিক দেখিতেছি তাহাতে দুই-এক দিনের অগ্র-পশ্চাৎ মাত্র। ভাল তোমার চক্ষে যে আজি নিদ্রা নাই?”
“আপনার চক্ষেই-বা কী আছে?”
“অনেক চেষ্টা করিলাম,-কিছুতেই নিদ্রা হইল না। মনে শান্তি নাই?” আত্মার পরিতোষ কিসে হইবে? নানা প্রকার চিন্তায় মন মহা আকুল হইয়া পড়িয়াছে। দেখ দেখি কি ভ্রম! কি করিতে গিয়া কি ঘটিল। জেয়াদের মৃত্যু, জেয়াদ নিজ বুদ্ধিতেই টানিয়া আনিয়াছিল। এমন আশ্চর্য ঘটনা, অভাবনীয় বুদ্ধিকৌশল, হাতে হাতে চাতুরী, কখনোই দেখি নাই, আজ পর্যন্ত কাহারো মুখে শুনিও নাই। ধন্য মোহাম্মদ হানিফা! ধন্য মন্ত্রী গাজী রহমান।”
“গত বিষয়ের চিন্তা বৃথা। আলোচনাতে কেবল আক্ষেপ ও মনের কষ্ট! ও-কথা মনে করিবার প্রয়োজন নাই। এখন রাত্রি প্রভাতের পর উপায় কি? যুদ্ধ আর ক্ষান্ত থাকে না,-সে যুদ্ধই-বা কাহার জন্য, মূলধন তো সরিয়া পড়িয়াছে।”
“সেও কম আশ্চর্য নহে।”
“সময় মন্দ হইলে এই প্রকারই হইয়া থাকে।”
“যাহা হইবার হইয়াছে, এখন চল একবার হানিফার শিবিরের দিকে যাইয়া দেখিয়া আসি, কোন সুযোগে জয়নালের কোন সন্ধান লইতে পারি কি-না, এখন মূল কথা জয়নাল আবেদীন। যুদ্ধ করিতে হইলেও জয়নাল। পরাভব স্বীকার করিয়া প্রাণরক্ষা-রাজ্যরক্ষা করিতে হইলেও জয়নাল! সন্ধির প্রস্তাব করিতে হইলেও সেই জয়নাল। জয়নালের সন্ধান না করিয়া আর কোন কথা উঠিতে পারে না। জীবনে মরণে, রাজ্য রক্ষণে সকল অবস্থাতেই জয়নালের প্রয়োজন।”
“তাহা তো শুনিলাম! কিন্তু একটি কথা-এই নিশীথ সময়ে জয়নালের সন্ধান করিতে কি বিপক্ষ-শিবিরে সন্ধান জানিতে যাইব-তাহাতে কৃতকার্য হইতে পারিব কি-না, সে বিষয়ে একটুকু ভাবা চাই। ছদ্মবেশ ধারণ করিয়া পথিক, পরিব্রাজক, দীন-দুঃখীর পরিচয় দিলেই যে কার্যসিদ্ধি হয় তাহা নহে। এ মদিনার মায়মুনা নহে, দগ্ধহৃদয় জায়েদা নহে। এ বড় কঠিন হৃদয়, বৃহৎ মস্তক। এ মস্তকে মজ্জার ভাগও অতি অধিক, শক্তিও বেশি পরিমাণ, ক্ষমতাও অপরিসীম। প্রত্যক্ষ প্রমাণ তো অনেক দেখিতেছি। আবার এই নিশীথ সময়ে ছদ্মবেশে গোপন ভাবে দেখিয়া অধিক আর লাভ কি হইবে? তাহাদের গুপ্তসন্ধান জানিয়া সাবধান সতর্ক হওয়া, কি কোন কার্যের প্রতিযোগিতা করা, কি নূতন কার্যের অনুষ্ঠান করা বহু দূরের কথা, শিবিরের বহিঃস্থ সীমার নিকট যাইতে পার কি-না সন্দেহ। তোমার ইচ্ছা হইয়াছে-চল দেখিয়া আসি, গাজী রহমানের সতর্কতাও জানিয়া আসি; কিন্তু লাভ কিছু হইবে না, বরং বিপদের আশঙ্কাই অধিক।”
“লাভের আশা যাহা পূর্বেই বলিয়াছি। সে যে ঘটিবে না, তাহাও বুঝিতেছি। তথাচ যদি কিছু পারি।”
“পারিবে তো অনেক। মানে মানে ফিরিয়া আসিতে পারিলেই রক্ষা।”
“আচ্ছা, দেখাই যাউক, আমাদেরই তো রাজ্য।”
“আচ্ছা, আমি সম্মত আছি।”
“তবে আর বিলম্ব কি? পোশাক লও।”
“পোশাক তো লইবই, আরো কিছু লইব।”
“সাবধান! কেহ যেন হঠাৎ না দেখিতে পায়।”
ওত্বে অলীদ ছদ্মবেশে মারওয়ানের সঙ্গে চুপে চুপে বাহির হইল। প্রভাত না-হইতেই ফিরিয়া আসিবে, এই কথা পথে স্থির হইল। কিঞ্চিৎ দূরে আসিয়া মারওয়ান বলল, “একেবারে সোজা পথে যাইব না। শিবিরের পশ্চাৎভাগ সম্মুখে করিয়া যাইতে হইবে। এখন আমাদের বাম পার্শ্ব হইয়া ক্রমে শিবির বেষ্টন করিয়া যাইতে থাকিব।”
এই যুক্তিই স্থির করিয়া বাম দিকেই যাইতে লাগিল। ক্রমে হানিফার শিবিরের পশ্চাৎ দিক তাহাদের চক্ষে পড়িতে লাগিল। সম্মুখে যেরূপ আলোর পরিপাটি, সেইরূপ পশ্চাৎ পার্শ্ব সকল দিকেই সমান। সম্মুখ, পার্শ্ব, পশ্চাতের কিছুই ভেদ নাই। কখনো দ্রুতপদে, কখনো মন্দ মন্দ ভাবে চতুর্দিক লক্ষ্য করিয়া যথাসাধ্য সতর্কিতভাবে যাইতে লাগিল। কিছু দূর গিয়া নিশ্চয় বুঝিতে পারিল যে, তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে আরো লোক আসিতেছে। আরো কিছু দূর অগ্রসর হইলে হাসি, রহস্য, বিদ্রূপসূচক কোন কোন কথার আভাস তাহাদের কানে আসিতে লাগিল। কোন্ দিকে, কত দূর হইতে-এই কথার আভাস আসিতেছে, তাহা স্থির করিতে পারিল না। কারণ কখনো দক্ষিণে, কখনো বামে, কখনো সম্মুখে আবার কখনো পশ্চাতে-অতি মৃদুমৃদু কথার আভাস কানে আসিতে লাগিল।
